রায়হানুল ইসলাম আকন্দ
প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬ ২:২৭ পিএম

গাজীপুরের কালিয়াকৈর কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) আব্দুস সবুরকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে হাত-মুখ বেঁধে পিটিয়ে মুক্তিপণ আদায় করেছে অপহরণকারীরা। পরে তার কাছ থেকে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে। তারা তাকে ব্যাকের ভোল্ট খুলে দেওয়ার জন্য মারধর করলেও তিনি তাতে রাজি হননি। পরে রাত ১০ টার দিকে চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কের কবিরপুর এলাকায় সড়কের পাশে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় মাইক্রোবাস থেকে ফেলে চলে যায়।

শুক্রবার (১৫ মে) বেলা ১১ টা পর্যন্ত কালিয়াকৈর কৃষি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অথবা ব্যবস্থাপকের (ম্যানেজার) পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানান কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম।

এর আগে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কালিয়াকৈর বাইপাস থেকে ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) আব্দুস সবুরকে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে অপহরণ করে। আহত বআব্দুস সবুর কৃষি ব্যাংক কালিয়াকৈর শাখার ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) হিসাবে কর্মরত আছেন। তিনি বগুড়া জেলা সদর এলাকার বাসিন্দা এবং শহরেই তার বাসা। রাতেই তিনি কালিয়াকৈরের ট্রাক স্ট্যান্ড এলাকার রুমাইসা ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর কালিয়াকৈর উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন আছেন। অপহরণের পর মাইক্রোবাসের ভেতরেই প্রায় ৫ ঘণ্টা তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায় অপহরণকারীরা। মারধর করে তারা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করে নেয়।

কালিয়াকৈর কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) আব্দুস সবুর সাংবাদিকদের বলেন, বৃহস্পতিবার (১৪ মে) তিনি বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে অফিস অফিস শেষ করে বের হয়ে কালিয়াকৈর বাইপাস এলাকায় বগুড়ায় যাওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষা করছিলেন। সাধারণত অন্যান্য দিন এখানে অনেক লোক দাঁড়িয়ে থাকে। ওইদিন সাড়ে ৫টা অথবা ৬টা বেজে যাওয়ার কারণে তেমন লোক ছিল না। আমি দাঁড়িয়ে বাসের দিকে লক্ষ্য রাতেখছিলাম বাস আসে কিনা। বাসের জন্য অপেক্ষা করার ৫ মিনিটের মধ্যে একটি সাদা রংয়ের মাইক্রো আমার কাছে এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ করে মাইক্রো থেকে তিনজন লোক নেমে আমাকে ধাক্কা দিয়ে তাদের মাইক্রোর ভিতর তুলে নেয়। তারাও দ্রুত মাইক্রোতে উঠে টান দিয়ে দরজা লাগিয়ে দ্রুত সামনের দিকে চলে যায়। মাইক্রোতে উঠিয়েই তারা আমাকে বেদম মারধর শুরু করে। তারপর জিজ্ঞাসা করে তুই কি করিস বল? আমি বললাম আমি ব্যাংকের ম্যানেজার। তখন আমাকে বলে তোর কাছে কি কি আছে বের কর। তখন আমার কাছে যা কিছু ছিল টাকা-পয়সাসহ সব তাদের কাছে দিয়ে দেই। আমার কাছে হয়তোবা মানিব্যাগে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা ছিল। এত অল্প টাকায় আমাদের হবে না, তুই তো ব্যাংকের ম্যানেজার তোকে নিয়ে আমাদের অন্য চিন্তাভাবনা আছে। পরে তারা আমার হাত-পা ও চোখ-মুখ বেঁধে মারধর করে এবং তাদের মাইক্রোতে করে ঘুরায়। এসময় বলতে থাকে আরও টাকা লাগবে, কোথায় থেকে নিয়ে আসবে, টাকা নিয়ে আসার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা কর (ওরা খুব সেনসিটিভ ভাবে আমাকে কথা বলাচ্ছিল)। তাদের ভয়ে তিনি ব্যাংকের একটা সিসি পার্টি আছে মায়ের দোয়ার জহুরুল ভাইকে ফোন দিয়ে বলেন জরুরীভাবে আমার পঞ্চাশ হাজার টাকা দরকার ছিল, আমাকে দেন। জহুরুল ভাই টাকা দিতে দেরি করতেছিল, তখন তারা মাইক্রোর ভিতর আমাকে বেদম মারপিট করতেছিল। পরে জহুরুল ভাই নগদের মাধ্যমে আমাকে ৫০ হাজার টাকা দিল। এরপরে আরেকজন হাবিব সাহেবকে ফোন দিয়ে বললাম ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আয়। হাবিব সাহেব টাকা দিতে পারতেছিল না, তখন তারা আমাকে অনেক মারধর করে।

তিনি আরো বলেন, পরবর্তীতে অপহরণকারীরা আমাকে বললো এতক্ষন তোর সাথে যেগুলো হলো সেগুলো প্রাথমিক খেলা। এরপর বলে তুই ব্যাংকের ম্যানেজার, তুই রাতে আমাদের সাথে যাবি ব্যাংকে, সিকিউরিটিকে বলে ব্যাংকের তালা খুলে দিবে, তোর ব্যাংকের ভোল্টের মধ্য থেকে সব টাকা আমরা নিব। তখন তাদেরকে বলি ভাই ভোল্টের চাবি আমার কাছে নাই। তারা বলে ম্যানেজারের কাছে চাবি থাকে না, তুই উল্টাপাল্টা বললে আমরা বিশ্বাস করবো? আমি বলি ভাই এগুলো সবকিছু জমা দিয়ে আসছি। কার কাছে জমা দিয়ে আসছোস? তার কাছ থেকে নে। বললাম ভাই চাবি তিনজনের কাছে থাকে, ইচ্ছে করলেই ভোল্ট খোলা যাবে না। ভোল্ট কেমনে খুলতে হয় আমাদের জানা আছে। তুই খালি সিকিউরিটিকে বলে মূলগেট (প্রধান ফটক) খুলে দিবে। তুই ম্যানেজার তুই বললে সিকিউরিটি ঠিকই খুলে দিবে। আমি তাদের এসব কথায় রাজি হচ্ছিলাম না। রাজি না হওয়াই প্রত্যেকটা লোক প্লাস দিয়ে নখ উঠিয়ে ফেলার চেষ্টা করতেছিল। একজন আমার বাম হাতের একটি আঙ্গুলের নখ উঠিয়ে ফেলে। তখন আমি জোরে জোরে চিৎকার করতেছিলাম। রক্তে আমার শার্ট লাল হয়ে গিয়েছিল। আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না। প্রত্যেকটা আঙ্গুলের নখ উঠাতে চাচ্ছে তারা। আমাদের কথা শুনবে কিনা, রাজি হবে কিনা বল স্বীকার করাতে চাচ্ছে আমাকে। আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছি না। এসময় তারা আমার বুকে পিঠে বেদম মারধর করে এবং দুই হাঁটুতে (সম্ভবত হাতুড়ি ছিল আমার তো চোখ বাঁধা) সমানে আঘাত করতেছিল, আর বলছিল রাজি হবে কিনা সেটা বল, আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না। একপর্যায়ে আমার গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল। তখন আমি বলছি, আমি রাজি আমাকে একটু স্বস্তি দেন। তারপর যখন তারা বলল ব্যাংকে চল, তখন আবার বলি আমি যাব না, আমার কাছে চাবি নাই। একপর্যায়ে তারা মাইক্রো নিয়ে ঘুরতে থাকে এবং আমাকে মারতে মারতে রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টা বা ১০ টার মতো বাজে হয়তো। তখন তাদের একজন আমার গলায় গামছা দিয়ে জুড়ে ফাঁসি দেয়। এই ফাঁসি দেওয়ার সময় কালিমা পড়ার সুযোগ হয়তোবা আমি পেয়েছিলাম। তখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে আমার কি হয়েছে আর কিছু বলতে পারি না। তারা আমার মোবাইলসহ সবকিছু নিয়ে নিয়েছিল কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে আমি অনেক কষ্ট করে চোখের বাঁধন খুলে দেখি মনে হয় চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কের পাশে কবিরপুরে আমি পড়ে আছি। তখন আস্তে আস্তে জ্ঞান ফেরার পর দেখি একটা অটো চালক ভাই যাচ্ছিল, তাকে বললাম ভাই আমাকে একটু হেল্প করেন। তখন অটো চালক ভাই আমার হাত-পায়ের বাঁধন খোলে। তাকে বললাম দয়া করে আমাকে ব্রাঞ্চে নিয়ে যান, ওখানে গেলেই আমার ব্যবস্থা হবে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক কর্মকর্তাকে অপহরনের ঘটনাটি তিনি শুনেছেন। আহত ব্যাংক কর্মকর্তা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সাথে পরামর্শ করে অভিযোগ দিতে পারে। অপহরণকারীদের ধরতে পুলিশ কাজ করছে।

এনজে

শেয়ার

পাঠকের মতামত

আলমডাঙ্গায় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের অভিযান

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার আসমানখালী এলাকায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চুয়াডাঙ্গা জেলা কার্যালয়ের অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ...

নড়িয়ায় স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ৩

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়নের আচুরা গ্রামে স্বামীকে কৌশলে ডেকে এনে বেঁধে রেখে তার স্ত্রীকে ...

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সানুর গ্রেপ্তার দাবি সাংবাদিক ইন্না’র পরিবারের

সিরাজগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছানোয়ার হোসেন সানুকে গ্রেপ্তার ও দল থেকে বহিষ্কারের দাবিতে ...