
গাঙ পারের মানুষ আমি। শৈশব-কৈশরের দুরন্তপনা কেটেছে বুড়িগঙ্গার তীর বাদামতলী। ঘাটে নোঙ্গর ফেলা নানান নামের লঞ্চ ,স্টীমার ও কার্গো জাহাজেই দিনের অর্ধেকটা সময় কাটত। কিন্তু নদী পথেই আমার খুব একটা ভ্রমণের সুযোগ হয়নি। যে কারণে মনের মাঝে দুর্বলতা সবসময়ই বিরাজ করে। তাই নৌ পথে ভ্রমণের সুযোগ পেলে আর মিছ করি না।
তারিখটি ছিলো ১৪ আগস্ট। রাত ১০টায় লালকুঠি নৌ টার্মিনালে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘর ভ্রমণ সঙ্গীরা হাজির। কিন্তু গাবতলীর সাকিব বেঁড়িবাঁধের সিকশনে জ্যামে আটকা। কি আর করা। ওর জন্য অপেক্ষা করতে করতে ১৫ আগস্ট রাত ১২টা ১৫ মিনিটের শেষ জাহাজে চড়ে চাঁদপুর ছুটলাম। আবহাওয়া বার্তা ছিলো ৩ নাম্বার সতর্ক সংকেত। সে সব বার্তা থোরাই কেয়ার করে জাহাজের ডেকে ছিলাম বেশ আয়েশী ভঙ্গীতে। ডেকের চেয়ারে বসে নানান রঙের মানুষ দেখি। মানুষের জীবন নানান বৈচিত্রপূর্ণে ভরপুর। ভ্রমণকালীন যা অন্যতম শিক্ষণীয় বিষয়। জাহাজের ভিতরটাতে হেঁটে বেড়াই। নদীর পানিতে চোখ রাখতেই দেখি ইলিশ শিকারিদের ডিঙ্গী নৌকায় লন্ঠন (কুপি) বাতি। সঙ্গীদের সঙ্গে আলাপ করতে করতে কখন যে রাত সাড়ে তিনটা বেজে গেছে টেরই পায়নি। চারটার আগেই চাঁদপুর ঘাটে ভিড়বে। শেষবারের মত সঙ্গে থাকা হালকাপাতলা ঝোলাটাও [ট্র্র্যাভেল ব্যাগ] আবার ঠিকঠাক করে নিই। যথারিতী জাহাজ ভিড়ল ঘাটে। এত রাতেও যাত্রিরা ধুপধাপ যাত্রা শুরু করল নিজনিজ গন্তবে। কিন্তু আমরা যাব কই। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেলো সকাল ৭টা পর্যন্ত জাহাজ ঘাটেই থাকবে। ব্যাস ওমনেই পলেথিন বিছিয়ে চিৎপটাং। ফজরের আজানের ধ্বনী শুনে নেমে পড়ি।
কিছুদূর হেঁটে গিয়ে দারুল উলুম ইসলামীয়া মাদ্রাসা মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করি। এখানে একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়,মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে থাকা মনোরম নারকেল বাগানের দৃশ্য অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। এক কথায় আবারো চাঁদপুর যাওয়া হলে সেখানে একরাত ক্যাম্পিং করার চেষ্টা করব। নামাজ শেষে চলে যাই বঙ্গবন্ধু পার্ক। গেট দিয়ে প্রবেশ করেই ইলিশ মাছের প্রতিকৃতির সামনে ছবি তুলি। ২০০৯-২০২২ একযুগ পর চাঁদপুর। অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। ভোরের হাওয়া গায়ে মেখে আরেকটু আগাই। চোখে পড়ে চাঁদপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে ২০১১ সালে নির্মীত স্মৃতিসৌধ রক্তধারা। এর নির্মাণশৈলী খুবই আকর্ষণীয়। আরেকটু এগিয়ে প্রকৃতির নিবীড় ছায়ায় নদীর তীরে গিয়ে বসি। জায়গাটা পদ্মা,মেঘনা ও ডাকাতিয়া এই তিন নদীর মোহনা। স্থানীয়রা জায়গাটাকে ঠোডা নামে ডাকে। আ লিক নাম ঠোডা। এর মূল নাম মোলহেড। এখানকার প্রকৃতি যেমনি খুব সুন্দর তেমনি আবার ভয়ঙ্কর। কারণ তিন নদীর মিলনে এখানকার একটি অংশে চরমভাবে পানির ঘূর্ণায়ন সৃষ্টি হয়।স্থানীয় সুত্রে জানা যায় একবার ঈগল নামক একটি যাত্রিবাহী জাহাজ এই ঘূর্ণীতে পড়ে ডুবে গিয়েছিলো। সেটার হদিস আজো মিলেনি। তাই সাবধান ভ্রমণকালীন মাত্রাতীরিক্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে ট্রলার/নৌকা নিয়ে নদীতে ভাসার আগে ভাবতে হবে কয়েকবার।

যাই এবার ফরিদগঞ্জর রুপসা জমিদারবাড়ি। বড় স্টেশন হতে আধাবেলার জন্য অটো রিজার্ভ করে নিলাম। যেতেযেতে পথের মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। সড়কের দুপাশে আবহমান বাংলার চিরায়ত রূপ ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করে। কখনো কখনো ডাকাতিয়া নদী পারের সারিসারি তাল গাছের নান্দনিক সৌন্দযর্, আমাদেরকে থামতে বাধ্য করে। থেমেথেমে যেতেযেতে প্রায় দুই ঘন্টায় গিয়ে পৌঁছলাম রুপসা জমিদার বাড়ির প্রধান ফটকে। ঢুকতেই প্রথমে পড়বে জমিদার বংশের লোকজনের সমাধীস্থল। এরপর শান বাঁধানো বিশাল পুকুর। আরেকটু সামনে আগানোর পরেই বিশাল উঠোন। সেখানেই কালের সাক্ষী হয়ে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার আহম্মদ রাজার দ্বীতল ভবনের বাড়িটি। তিনিই রূপসা জমিদারবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। তার মৃত্যুর পর ছেলে মুহাম্মদ গাজী জমিদারীত্ব গ্রহণ করেন। বাড়িটির বয়স প্রায় ২৫০ বছর। তৎকালীন সময়ের অত্যাচারী জমিদারদের মত এই বাড়ির জমিদাররা ছিলেন না। বরং তারা অর্থাভাবে খাজনা দিতে না পারা প্রজাদের উল্টো সাহায্যসহযোগিতা করে থাকতেন। ঘুরেঘুরে বাড়ির ভিতর বাহির দেখতে থাকি। এখনো বসবাস যোগ্য বাড়িটিতে জমিদার বংশের বর্তমান প্রজন্মর অনেকেই থাকেন। মোট তিনটি পাকা ভবন রয়েছে। টিনের ঘরও রয়েছে। বাড়িটির স্থাপত্যশৈলী চমৎকার। মুক্তিযুদ্ধে রূপসা জমিদারবাড়ির জমিদার বংশধরদের বেশ অবদান রয়েছে।
সাতসকাল হওয়ায় কথা বলার মত জমিদার বংশের নির্ভরযোগ্য তেমন কাউকে না পেয়ে ছুটলাম এবার হরিণা ঘাটের দিকে। জানিনা চক্করে চক্করে চাঁদপুরের আরো কত জায়গায় যাওয়া হবে। দুপুর ১২টার মধ্যেই পৌঁছে যাই। ঘাটে গিয়ে ইলিশের দাম জিজ্ঞাসা করতেই তিন হাজার টাকা কেজি চাইল। ততোক্ষণে চোখ দুটো আমাদের কপালে। যা বুঝার বুঝে মাছ না কিনেই লক্ষীপুর গ্রামের পথে আগাই। সেখানে রয়েছে পুরো চাঁদপুর জেলার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর অবকাঠামোর তৈরী শাহাবুদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজ। স্কুলটি ২০১৫ সালে ১১৬ শতাংশ জমির উপর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর নির্মাণশৈলী ইউরোপীয়ান নকশার আদলে করা হয়েছে। যার দরুণ স্কুলটি দিনেদিনে পর্যটকদের বিনোদন কেন্দ্রেও পরিণত হয়ে উঠছে । পাশে থাকা মসজিদটির স্থাপত্যও বেশ নজরকাড়া সৌন্দর্যের। স্কুল ছুটি থাকার সুযোগে আমরাও বেশ কিছুক্ষণ আয়েশি মুডে ফটোশ্যুট করে আবারো হরিণার পথে যাই। চাঁদপুর আসছি আর ইলিশ মাছ খাবোনা তা কি করে হয়।

এবার আমি সঙ্গে না গিয়ে নাজমুল,দুর্জয় ও আনিস ভাইকে পাঠাই। ওরা তিনজন ঘাটে গিয়ে মৎস্য ব্যাপারীদের হাক ডাক তোলা সহনীয় মূল্যে দুটো ইলিশ কিনে নেয়। এরপর স্থানীয় এক রেস্টুরেন্ট হতে মচমচা করে ভাজিয়া, সাথে কয়েক পদের ভর্তা-বেগুন ভাজা দিয়ে চেটেপুটে থালার ভাত সাবাড় করি। গরম গরম খানা খেয়ে মাথাটাও হলো বেশ গরম। তাই আর দেরি না করে শহরের কালীবাড়ির দিকে ছুটলাম, চাঁদপুরের বিখ্যাত ওয়ান টাইম আইসক্রিম খেতে। আলহামদুলিল্লাহ আইসক্রিমের দারুণ স্বাদ আমাকে শৈশবে মেশিনে দেয়া মজাদার কোনে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। ভ্রমণকালীন সেসব অ লের নানান বিখ্যাত খাবার খাওয়ার মাঝেও অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ করা যায়। সারাদিন ঘুরতে ঘুরতে শরীরে ঘামের একটা দুর্গন্ধ। তাই যাই মোহনপুর। সিএনজি’তে বসেই উত্তর ও দক্ষিণ মতলবের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পড়ন্ত বিকেলে মেঘনা তীরে পৌঁছি। আসর নামাজ পড়েই ঝাপ দিই প্রমত্তা মেঘনা নদীর পানিতে। আহ্ কি শান্তি। ইচ্ছেমত ডুবাডুবি করে বেলতলী বেঁড়িবাঁধ দিয়ে দাউদকান্দি হয়ে ঢাকার পথ ধরি।
যাতায়াতঃ সড়ক ও নৌ পথে চাঁদপুর যাওয়া যায়। চাঁদপুর যাওয়ার পরে সারাদিন/অর্ধবেলার জন্য অটো কিংবা সিএনজি রিজার্ভ করে নিন।
খরচঃ ৫/৬ জনের টিম হলে একরাত একদিনের জন্য জনপ্রতি দুই হাজার টাকা হলেই যথেষ্ট।
ছবির ছৈয়ালঃ দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
- ১রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেলেন ড. সোবহান
- ২জাপানে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্পে শপিংমল ধস, বহু হতাহতের শঙ্কা
- ৩মানিকগঞ্জে সোহান হত্যা মামলায় দুই জনের মৃত্যুদণ্ড
- ৪উন্নয়ন কাজে অনিয়ম হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকলিস্টেড করা হবে
- ৫রংপুরে ডিএক্সএন মেগা সিজলার প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত
- ৬কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সঙ্গে ইউসিবি ইনভেস্টমেন্টের চুক্তি
- ৭জুলাইয়ে অপেক্ষা করতাম, কখন জবির মিছিল আসবে: নাহিদ ইসলাম
- ৮সাতক্ষীরায় ৩১ কোটি ৯৪ লাখ টাকার মাদক ধ্বংস করল ১৭ বিজিবি
- ৯বাংলাদেশকে কম দামে ইউরিয়া সার দিতে চায় রাশিয়া
- ১০হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু
- ১১৩ দিনে সরকারের ব্যাংক ঋণ ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা
- ২নড়িয়ায় স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ৩
- ৩চরফ্যাসনে পানিতে ডুবে স্কুল ছাত্রের মৃত্যু
- ৪জাতীয় অধ্যাপক হলেন অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল্লাহ
- ৫স্পিকারের দিকনির্দেশনা পেলেই গাজী নজরুলের এমপি পদের সিদ্ধান্ত নেবে ইসি
- ৬রপ্তানি খাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অপরিসীম: বাণিজ্যমন্ত্রী
- ৭চাঁদপুরে অনুমতি ছাড়া নদী দখল করে হোটেল নির্মাণ
- ৮দক্ষিণ আফ্রিকায় আগুনে পুড়ে ৬ বাংলাদেশির মৃত্যু
- ৯‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডব্লিউএফপির সহযোগিতা চাইলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
- ১০খুকৃবির নতুন উপাচার্য বাকৃবির অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামান সরকার





পাঠকের মতামত