প্রকাশিত: এপ্রিল ২, ২০২৪ ৪:২৮ পিএম , আপডেট: জুন ৪, ২০২৪ ১১:৩৮ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বিশ্বের অন্যান্য দেশে প্রাক বাজেট আলোচনা এত হয় না। তবে আমাদের দেশে যে হারে প্রাক বাজেট আলোচনা হয়, সে হারে বাস্তবায়ন হয় না। আলোচনায় বিভিন্ন সুপারিশ করা হলেও তা আমলে নেয়া হয় না বলেও মন্তব্য করেছেন বক্তারা।

মঙ্গলবার (২ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টাগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড) আয়োজিত ‘বাজেট ফর ২০২৪-২৫: কি-চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড ’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

আলোচনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য এবং র‍্যাডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান নাসের শাহরিয়ার জাহেদী বলেন, আমাদের দেশে প্রাক বাজেট সুপারিশ বা আলোচনা করা হয় কিন্তু আমলে নেয়া হয় না। কর আহরণ ব্যবস্থায় আমাদের অফিস জেলা পর্যায়ে গিয়েই শেষ। তাই বলা যায় প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে আমরা কর আহরণ করতে যেতে পারছি না। প্রতিটা মানুষ জানতে চায় তারা কেন কর দিচ্ছে। কর দিলে সে কী পাচ্ছে আর যে দিচ্ছে না সে কী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, সবাইকে পরিষ্কার করতে হবে তার করের টাকা কী করা হচ্ছে। দিনের পর দিন নেতিবাচক খবর আসছে। জনগনকে বুঝাতে হবে করের টাকা ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আগামী বাজেটে কী হবে বা না হবে আমি জানিনা। তবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করার যা যা দরকার তা করতে হবে। মানুষের যেন ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এটা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা হচ্ছে না। রাবির একজন অধ্যাপক তার নিবন্ধে লিখেছেন, একজন উপ সচিব গাড়ির বা ফুয়েলের জন্য যে খরচ পান সেই খরচ রাবির গবেষণা বিভাগও পায় না। দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে দেখা যায় যে সেখানের টপ ১০ জনই থাকেন অন্য দেশের।

তিনি আরও বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সিইও খোঁজা হয় অন্যান্য দেশ থেকে। এটা সত্যিই লজ্জাজনক। আজ দেশের ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী দেশের বাইরে পড়াশোনা করতে গিয়ে থেকে যাচ্ছে। আমরা তাদের জন্য কর্মসংস্থান করতে পারিনি বলেই তারা আর দেশে ফিরছে না।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শহিদুজ্জামান সরকার বলেন, বাজেটে সরকারের প্রথম যে বিষয়টি থাকে তা হচ্ছে রাজনৈতিক এজেন্ডা। আমাদের সরকারেরও রাজনৈতিক দর্শন আছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা রয়েছে, পাশাপাশি ১০০ বছরের ডেল্টা প্ল্যান রয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের দেশের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের অর্থনীতি। আমরা কিন্তু স্যাচুরেটেড একটা জায়গায় এসে গেছি তা বলতে পারব না। আমরা যেখানে যেতে চাই সেখানে পৌঁছাতে পারিনি। তাই আমাদের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থনীতির উন্নয়নে যেসব দাবি রয়েছে সেগুলো এক্ষুনি হয়ে গেছে এই দাবি করছি না।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটা সময়ে মানুষ দাবি করত ভাত দাও কাপড় দাও। এখন আর কেউ ভাত কাপড়ের দাবি করে না। এখন মানুষ সুন্দর জীবন যাপনের দাবিদার। এগুলো আমাদের অর্জন। এগুলো এই সরকারের অর্জন।

শহিদুজ্জামান বলেন, দেশ চালাতে গেলে সরকারকে অনুমান নির্ভর অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমাদের যে, কোনো সমস্যা নেই সেটা বলব না। নীতি সুদহার বৃদ্ধির মাধ্যমে এই মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্যোগ নেয়া। জাপান ৭০-৭৫ বছর পর নীতি সুদহার বৃদ্ধি করেছে। আমরা ১ লাখ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে শুরু করেছিলাম এবার আমরা ৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট করব।

আমরা রাষ্ট্রকে ওন করতে এখনো যথাযথ ভাবে তৈরি নয়। জনগণ যে রাষ্ট্রের মালিক এটা বুঝতে আমাদের অনেক সময় লেগেছে। আমরা যারা তথাকথিত রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, তারা প্রতিনিধি হিসেবে প্রান্তিক পর্যায়ের লোকগুলোকে বুকে টেনে নিতে পারিনি বলে আজকের এই অবস্থা। আমাদের সরকার জিডিপি রেশিও বাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

ডিসিসিআই সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, ট্যাক্স রেট বাড়ানো উচিত হবে না। ট্যাক্স রেট না বাড়িয়ে ট্যাক্স দেয়ার হার বাড়াতে হবে। এখন যদি ৪০ লাখ লোক ট্যাক্স দেয় এটাকে ৮০ লাখে উন্নীত করতে হবে। বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ বাড়ানো, ট্যাক্স রেট সম্প্রসারণ, ট্যাক্স রেট সহজীকরণ।

র‍্যাপিড চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, সরকার যদি বাজেট ডেফিসিয়েট কমাতে চায় তাহলে তাকে ভাবতে হবে কোন কোন খাতে বাজেট হবে। মূল্যস্ফীতি কমানোর পরও যেন যে খাতগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোতে খরচ কমাতে না হয়।

তিনি বলেন, নির্বাচন হয়ে গেছে। এখন বিভিন্ন আশঙ্কার কথা ভাবা হয়েছিল সেগুলো নেই। বাজেট শুধু আয় ব্যয়ের হিসাব না। এ বছর বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিয়ে আসা।

র‍্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম আবু ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে অন্যতম একটা ইউনিক কান্ট্রি। কারণ বাংলাদেশে যেভাবে বাজেটের আগে এত আলোচনা হয় বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এত আলোচনা হয় না। এই যে প্রি বাজেট আলোচনাগুলো হচ্ছে সেগুলো যদি নির্দিষ্ট কোনো এজেন্ডাভিত্তিক হয় তাহলে এই বাজেট আলোচনাগুলো খুব মিনিংফুল হয়।

তিনি বলেন, আমরা গ্রোথ থেকে একটু বেরিয়ে আসতে পারি কি না এটা ভাবার সময় এসেছে। ২০০৯ সালে বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ কোটি টাকা। সেটি এবার হচ্ছে প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা। এই সময়ে বাজেট প্রায় ৮ গুণ বেড়েছে। তাই আমাদের বাজেটের মবিলাইজেশনটাও সেভাবে করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টা ইকোনমিক জোন করার কথা। কন্তু সেগুলো সেভাবে তরান্বিত হয়নি।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, বাজেট যেভাবে বানানো হয় কিন্তু সেটা বাস্তবায়নের বেলায়  হচ্ছেনা। ভারতে মাত্র কয়েক পৃষ্ঠার বাজেট দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা বাজেট বানাই অনেক পৃষ্ঠার। আগে অনেক পত্রিকা বাজেট ছাপতে পারত যেটা এখন পারে না।

তিনি বলেন, আমাদের কেবলা পরিবর্তন করতে হবে। রাজস্ব আহরণের যে পর্যায়ে আমরা আছি এই মুহুর্তে করদাতার বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের কর নিশ্চিত করার সময় নেই। আমাদের অর্থনীতি বড় হয়েছে। তাই এটা নিশ্চিত করতে হবে৷ আমরা বিভিন্ন সময় কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে থাকি, তখন সাধারণ করদাতারা মনে করে তারাও ২ বছর পর দিলেও সমস্যা হবে না। তাই সকলের প্রতি সমান আচরণ করতে হবে। যেসব বড় বড় লোকেরা বিদেশে টাকা নিয়ে গেছে তাদের প্রতি জামাই আদর করলে চলবে না। তাই এনফোর্সমেন্ট বাড়াতে হবে৷ সকলকে একটি সামাজিক আন্দোলনের মধ্যে থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দায়িত্বে রয়েছে তারা দেখবে কে কে কর দিচ্ছে। আপনি একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করতে গেলে যেন দেখা হয় আপনি কর দিচ্ছেন কি না। ব্যাংকগুলো অ্যাকাউন্ট খোলার সময় যেন দেখে তারা কর দাতা কি না। তারা তাদের ব্যবসা বাড়ানোর জন্য কর দাতা নিয়ে মাথা ঘামায় না। সিটি করপোরেশনে ৩ লাখ বাড়ির মালিক তালিকা রয়েছে, তাহলে তো এখানেই ৩ লাখ কর দাতা পাওয়ার কথা। এটাও হচ্ছে না।

প্রথম আলোর অনলাইন বিভাগের প্রধান শওকত হোসেন মাসুম বলেন, ব্যাংকিং খাত আজ কোন পর্যায়ে গেছে। ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপির পরিমাণ বাড়ছে। ন্যাশনালিজম ব্যাংকে যে দুর্নীতি হয়েছে এগুলো নিয়ে আমরা বেশ কিছু স্টোরি করেছি। এরপর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অনেক চাপ আমাদের সহ্য করতে হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে এখনো অনেক সুশাসন দরকার।

ইআরএফ সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ মিরধা বলেন, সরকারের উচিত হবে কীভাবে কৃষি পণ্য উৎপাদন বাড়ানো যায়। সবকিছুর উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু দাম কমছে না। এর কারণ কী তা খুঁজে বের করতে হবে। ব্যাংক সেক্টরকে যদি পারফেক্ট ভাবে এড্রেস করা যায় তাহলে আমি বলব যে ইকোনমির বড় একটা সংস্কার হবে।

শেয়ার

পাঠকের মতামত

সংসদের গণপূর্ত প্রকৌশলীর কার্যালয়ে আগুন, তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ

জাতীয় সংসদ ভবনের মূল ভবনে অবস্থিত গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে ...

প্রথমবারের মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী

দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ...

গৃহায়ন প্রতিমন্ত্রী উন্নয়ন কাজে অনিয়ম হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকলিস্টেড করা হবে

গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেছেন, উন্নয়ন কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি ...

বাংলাদেশকে কম দামে ইউরিয়া সার দিতে চায় রাশিয়া

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে রাশিয়া। ...

গ্যাস সংকট নিরসনে মালয়েশিয়ার সহায়তা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

চলমান গ্যাস সংকট নিরসনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ...