তিমির বনিক
প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬ ৩:১৪ পিএম , আপডেট: জুলাই ২২, ২০২৬ ৭:০৭ পিএম

সন্তানের কান্নার বদলে ঘরে বাজছে শিকলের ঝনঝনানি। একটি নয়, দুটি জীবনের একই ট্র্যাজেডি। গর্ভের সন্তান হারিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন তারা, এরপর জুটেছে স্বামীর দেয়া তালাক। পর্যাপ্ত চিকিৎসা আর সহায়তার অভাবে গত দেড় দশক ধরে একচালা ঘরের অন্ধকার কোণে শিকলবন্দী অবস্থায় দিন কাটছে মৌলভীবাজারের জুড়ীর দুই বোন আফিয়া ও রোবেনার। পেটের ভাত জোগাতেই যেখানে ধুঁকছেন ভিক্ষুক মা, সেখানে মেয়েদের সুচিকিৎসা এখন কেবলই এক আক্ষেপের নাম।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জুড়ী উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের বাছিরপুর (চাক্কাটিলা) গ্রামের মৃত মরতুজ আলীর স্ত্রী জামিনা খাতুনের দুই মেয়ে আফিয়া খাতুন (৩৫) ও রোবেনা বেগম (২৮)। প্রায় ২৫ বছর আগে দিনমজুর স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন মেয়েকে নিয়ে অসীম কষ্টে সংসার টানতে শুরু করেন জামিনা খাতুন। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হয়নি।

বড় মেয়ে আফিয়া খাতুনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল পার্শ্ববর্তী বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ এলাকায়। বিয়ের বছরখানেক পর প্রথম মৃত সন্তান জন্ম দেওয়ায় গভীর মানসিক আঘাতে ভোগেন আফিয়া। কিছুদিনের মধ্যে মানসিক সমস্যা দেখা দিলে তার স্বামী কোনো চিকিৎসা না করিয়েই তাকে মায়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় এবং তালাক দেয়। চিকিৎসাহীনতায় দিন দিন আফিয়ার অবস্থার অবনতি হতে থাকলে বাধ্য হয়ে মা তাকে শিকলবন্দী করেন। প্রায় ১৪-১৫ বছর ধরে এভাবেই দিন কাটছে তার।

একই নির্মমতার শিকার হন দ্বিতীয় মেয়ে রোবেনাও। তাকে একই ইউনিয়নের পশ্চিম হরিরামপুর গ্রামে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সন্তান প্রসবের সময় স্থানীয় একটি বেসরকারী হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মৃত সন্তান প্রসব করেন তিনি। এ খবর শুনে স্বামী ও শাশুড়ির লোকজন তাকে হাসপাতালেই ফেলে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ভিটেমাটি বিক্রি ও ভিক্ষা করে হাসপাতালের বিল মিটিয়ে মেয়েকে বাড়ি নিয়ে আসেন অসহায় মা। কিন্তু মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে রোবেনাও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। একটু সুযোগ পেলেই স্বামীর বাড়ির দিকে ছুটতেন বলে তাকেও শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে বাধ্য হন মা। এরই মধ্যে রোবেনাকেও তালাক দেন তার স্বামী। গত ৭-৮ বছর ধরে রোবেনার ঠিকানাও এখন শিকল বাঁধা একই ঘর।

তথ্য সূত্রে দেখা যায়, মূল ঘরের পাশে একটি অন্ধকার ও অস্বাস্থ্যকর একচালা কক্ষে মাটির মেঝেই শেষ সম্বল এই দুই বোনের। কখনো শিকল খুলে দরজায় তালা দিয়ে রাখা হয়, যেন তারা হারিয়ে না যান। বৃদ্ধা মা সাধ্যমতো তাদের পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করলেও অর্থাভাব ও একা হওয়ার কারণে উন্নত কোনো চিকিৎসকের কাছে নিতে পারছেন না।

অশ্রুসজল চোখে অসহায় মা জামিনা খাতুন বলেন, “ভিক্ষা করে পেটের ভাত জোগাতেই কষ্ট হয়, চিকিৎসা কী দিয়ে করব? কোথায় ভালো ডাক্তার আছেন তা-ও তো জানি না। আমি একা মানুষ, এই মেয়েদের নিয়ে কীভাবে যাব? আপনারা একটু হাত বাড়িয়ে দিলে হয়তো আমার মেয়েগুলো আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারত।”

সামাজিক সচেতনতা ও সুচিকিৎসার অভাবে দুটি তাজা প্রাণ আজ বন্দীদশায় দিন কাটাচ্ছে। সমাজের বিত্তবান, মানবিক সংগঠন ও প্রশাসনের সদিচ্ছাই পারে আফিয়া ও রোবেনাকে এই অন্ধকার থেকে বের করে আনব।

সহযোগিতা পাঠানোর ঠিকানা:

জামিনা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ও দুই বোনের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা পাঠাতে পারেন সরাসরি এই নম্বরে: বিকাশ (পার্সোনাল): 01785-666010 (জামিনা খাতুন) প্রয়োজনে সত্যতা যাচাই করে আপনারা দান করতে পারেন।

এনজে

শেয়ার

পাঠকের মতামত

পিকআপ সিএনজিচালিত অটোরিকশা মুখোমুখি সংঘর্ষে যুবক নিহত

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ ইউনিয়নের হাতলিয়া এলাকায় পিকআপ ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে জুড়ীর এক ...

কুড়িগ্রামে শিশু সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতকরণে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

কুড়িগ্রামে শিশু সুরক্ষা ও শিশুদের অধিকার নিশ্চিতকরণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় জোরদারে একটি সমন্বয় ও পরামর্শ ...

খানজাহান আলী বিমানবন্দর চালু হলে বদলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন খানজাহান আলী (রহ.) বিমানবন্দর প্রকল্প আবারও আলোচনায় এসেছে। প্রায় তিন দশক ...