
সৈয়দ রফিকুল ইসলাম শাওন, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
চলতি বর্ষা মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং বড় ধরনের কোনো রোগবালাই না হওয়ায় সাতক্ষীরায় পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। একই সাথে জেলার বিস্তীর্ণ বিল ও জলাশয়গুলোতে শুরু হয়েছে পাট পঁচানোর কর্মব্যস্ততা। তবে ফলন ভালো হলেও একদিকে চরম জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততার চাপ, অন্যদিকে বাজারদর ও উৎপাদন খরচ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় চাষীরা।
সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া, তালা, সদরের বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা এবং বিলের জমে থাকা পানিতে এখন সারিবদ্ধভাবে পাট পঁচাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। চলতি মৌসুমে সময়মতো বৃষ্টিপাতের ফলে খালের পাশাপাশি বিলের জলাশয়ে পর্যাপ্ত ও কাঙ্ক্ষিত পানি পাওয়ায় পাট পঁচাতে বা ‘জাক দেওয়া’র কাজে বেশ সুবিধা হচ্ছে। বিলের পানিতে সুবিন্যস্তভাবে পাটের আঁটি বেঁধে, তার ওপর মাটির ঢেলা, কলাগাছ কিংবা কচুরিপানা দিয়ে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে, যেন দ্রুত পঁচে সুষম ও উজ্জ্বল মানের আঁশ পাওয়া যায়। খেতের কাছাকাছি বিলে পানি পাওয়ায় দূরে পাট পরিবহনের অতিরিক্ত খরচ বেঁচে যাচ্ছে বলেও জানান স্থানীয়রা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার ৭টি উপজেলায় ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যেখান থেকে আনুমানিক ১ লাখ ৪২ হাজার বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় বাজারে ভালো দর বজায় থাকলে জেলা থেকে উৎপাদিত পাটের মোট বাজারমূল্য ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলাওয়ারী আবাদের তথ্যে দেখা যায়, সাতক্ষীরা সদরে ৫ হাজার ২০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৩ হাজার ২৫৫ হেক্টর, তালায় ৩ হাজার ১১০ হেক্টর, দেবহাটায় ২০ হেক্টর, কালীগঞ্জে ১০১ হেক্টর, আশাশুনিতে ৯৫ হেক্টর এবং শ্যামনগর উপজেলায় ৯ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে।
অন্য বছরগুলোতে এ সময়ে পাটে ছত্রাকজনিত গোড়াপঁচা রোগ, পাতা শুকিয়ে যাওয়া কিংবা বিছা পোকার ব্যাপক উপদ্রব থাকলেও এবার চিত্র ভিন্ন। তালা উপজেলার বাইগুনি গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম জানান, আগে পাটের নানা রুগবালাইয়ের কারণে ওষুধ দিতে দিতেই তাদের নাভিশ্বাস উঠত। তবে এবার আবাদ ভালো হয়েছে। এক বিঘা জমিতে আবাদে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হলেও বাজার ঠিক থাকলে বিঘা প্রতি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার পাট বিক্রির আশা করছেন তিনি। একই উপজেলার বড়বিলা গ্রামের আরেক কৃষক জনাব আলি জানান, শুরু থেকেই কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সরকারের প্রণোদনা বীজ-সার পাওয়ায় রোগবালাই কম হয়েছে এবং গাছও বেশ পুষ্ট হয়েছে।
তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার আড়ালে রয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদি শঙ্কা। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে মাটিতে সাগরের লবণাক্ত পানি অনুপ্রবেশ করায় কৃষি আবাদ ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অধিক তাপমাত্রা, কড়া রোদ এবং লবণাক্ততার জন্য পাট বীজের অঙ্কুরোদ্গম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে কেবল সাতক্ষীরা জেলাতেই পাটের আবাদ হ্রাস পেয়েছে ১ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে।
সদর উপজেলার নারানঝজাল গ্রামের চাষী আবুল কালাম জানান অন্য একটি বাস্তবতার কথা। তার মতে, সারের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় চলতি মৌসুমে উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে বিঘা প্রতি প্রায় ১৯-২০ হাজার টাকায়, যা গত বছর ছিল ১৫-১৬ হাজার টাকা। বিপরীতে সঠিক দাম না পেলে লোকসানের মুখ দেখতে হয়। পাট পঁচানো ও আঁশ ছাড়ানোর পর হাটে নিয়ে ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন সাধারণ চাষীরা।
এই প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন ‘লবণসহিষ্ণু দেশি পাট-৮’। গবেষকদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের পতিত এক-ফসলি জমিতে এই জাতের চাষ ছড়িয়ে দেওয়া গেলে বছরে দুটি ফসল আবাদ সম্ভব এবং এটি উপকূলের শস্যনিবিড়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) উদ্ভাবিত এই নতুন জাতটি চাষে সফলতা পাওয়া গেলেও যথাযথ প্রচারণার অভাবে তা সাধারণ কৃষকদের কাছে এখনো পুরোপুরি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। বিশেষজ্ঞরা জানান, লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধির আগেই শুষ্ক মৌসুমে স্বাদু পানি দিয়ে জমি তৈরি করে আগাম বীজ বপন করলে অঙ্কুরোদ্গম প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা চাষিদের নিরলসভাবে সার্বিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে নতুন জাতের লবণসহিষ্ণু দেশি পাট-৮ চাষকে জনপ্রিয় করতে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, কৃষক প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবসের মতো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে উপকূলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।
সামগ্রিকভাবে উচ্চ ফলনশীল জাতের সরবরাহ, আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তি, সরকারি প্রণোদনা এবং ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করা সম্ভব হলে সাতক্ষীরার এই সোনালী আঁশের গৌরব আবারও পূর্ণতা পাবে বলে বিশ্বাস স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের। বর্তমানে জলাশয়ে জলাশয়ে পাট পঁচানো আর আঁশ শুকানোর প্রস্তুতি ঘিরে সাতক্ষীরার গ্রামগুলোতে মেহনতি মানুষের নতুন আশা ও স্বপ্নের আলো ভাসছে।
টিআর
- ১ইরানের শর্ত পুরোপুরি মানলেই খুলবে হরমুজ প্রণালি: আইআরজিসি
- ২অসহায় মায়ের ৫০০ টাকার ভাড়ার জন্য চুল বিক্রি, তবু জোটেনি ঘর
- ৩দেশে বিনিয়োগ করতে চায় গুগল-মেটা-টিকটক: আইসিটি মন্ত্রী
- ৪শেয়ারবাজারে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৫
- ৫মা মাছ রক্ষায় হাওরে হচ্ছে ‘মিঠা পানির মাছের অভয়াশ্রম’
- ৬চলনবিলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে
- ৭‘লুটপাটের’ নতুন লাইসেন্স জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ : জামায়াত
- ৮সোশ্যাল মিডিয়ায় মেসির বাবার মৃত্যুর সংবাদ, সত্যি নাকি গুজব!
- ৯মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত রাবির ইফাদ বাঁচতে চান
- ১০সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে
- ১সিরাজগঞ্জে অনলাইন জুয়া চক্রের তিন সদস্য গ্রেপ্তার
- ২চাঁদপুরে নারীর পেট থেকে ৪ কেজি ৮ শ গ্রামের টিউমার অপসারণ
- ৩সিন্ডিকেট-মজুদদারির বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগ করবে সরকার
- ৪চাঁদপুরে ১৫০ ঘন্টা বিদ্যুৎবিহীন অর্ধশতাধিক পরিবার
- ৫জামায়াত-এনসিপির মব রাজনীতিই আ’লীগের ফেরার পথ তৈরি করছে
- ৬সাতক্ষীরা-ভেটখালী সড়কে বড় বড় খানাখন্দ, চলাচলে চরম ভোগান্তি
- ৭আখাউড়ায় শাহপীর কল্লা শহীদ’র ওরস সোমবার শুরু
- ৮অসময়ে তরমুজ চাষে কৃষকের দৃষ্টান্ত স্থাপন
- ৯চিকিৎসক সমাজের পেশাগত উৎকর্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ড্যাব
- ১০ভরিতে ফের ৪৩৭৪ টাকা বাড়লো সোনার দাম





পাঠকের মতামত