মোঃ জাফর আহমেদ
প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬ ১১:৪৮ এএম

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের খোচাবাড়ী তালেরতল এলাকায় নির্মাণাধীন একটি সেতু এখন ধীরগতির উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ৪২ মিটার দীর্ঘ সেতুটির নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের তিন বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি। ফলে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অস্থায়ী ড্রামের ভেলায় ছড়া পারাপার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ জনজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে বছরের পর বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় অতিরিক্ত স্রোতে তালেরতল এলাকার পুরোনো সেতুটি ভেঙে যায়। একই সঙ্গে দুই পাশের সংযোগ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় কয়েকটি গ্রামের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন এলাকাবাসীর চলাচলের জন্য অস্থায়ীভাবে কাঠ ও দড়ির সাঁকোর ব্যবস্থা করা হলেও ২০১৯ সালের বন্যায় সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২১ সালে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলেও আজও তা শেষ হয়নি।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালের ১৯ এপ্রিল কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের ১৮ এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পার হওয়ার তিন বছরের বেশি সময় পরও প্রকল্পটি অসমাপ্ত রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, তিনটি স্প্যানের মধ্যে মাত্র একটি স্প্যানের ডেক (স্ল্যাব) নির্মাণ শেষ হয়েছে। বাকি দুটি স্প্যানের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও শ্রমিকের উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ না দিয়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। এতে নির্মাণকাজের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর।

সেতু নির্মাণ শেষ না হওয়ায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ, রোগী ও শিক্ষার্থীসহ শত শত মানুষ প্রতিদিন অস্থায়ী ড্রামের ভেলায় ছড়া পার হচ্ছেন। বর্ষা মৌসুমে পানির স্রোত বেড়ে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। প্রায়ই ভেলা উল্টে মানুষ পানিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। অনেক শিক্ষার্থী, নারী ও বৃদ্ধ আতঙ্কে পারাপার করতেই সাহস পান না।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিকল্প কোনো সড়ক না থাকায় বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, ফসলের মাঠ কিংবা উপজেলা সদরে যেতে হলে এই ছড়া পার হওয়া ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই। বিকল্প হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি বাঁধ থাকলেও সেটি অনেক ঘুরপথ এবং চলাচলের জন্য কষ্টকর। বর্তমানে সেই বাঁধেরও সংস্কারকাজ চলায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

এলাকার কৃষকদের ধান, পাট, ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ছোট ছোট ভেলা বা ড্রামের মাধ্যমে পার করতে হচ্ছে। একইভাবে গবাদিপশুও ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করানো হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ছে।

খোচাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছড়া পার হতে হচ্ছে। বন্যা বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় অনেকেই বিদ্যালয়ে যেতে পারে না।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মতিয়ার সরকার বলেন, প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রতিদিন এই ছড়া পারাপারে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা ও কৃষিতে পড়ছে। চার বছর আগে সেতুর কাজ শুরু হলেও অগ্রগতি খুবই ধীর। আমরা দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি জানাই।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মালেক বলেন, সেতুর কাজ শুরু হলেও মানুষের চলাচলের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি ড্রামের ভেলা তৈরি করেছি। কিন্তু এটি দিয়ে এত মানুষের নিরাপদ পারাপার সম্ভব নয়। ঠিকাদারের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাইনি। দ্রুত কাজ শেষ না হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

নদীপাড় এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমিন সর্দার বলেন, প্রায় প্রতিদিনই ভেলা উল্টে মানুষ পানিতে পড়ে যায়। সাইকেল, মোটরসাইকেল, টাকা-পয়সা ভিজে যায়। গবাদিপশুও ভেলায় করে পার করতে হয়। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছি।

এ বিষয়ে ঠিকাদারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

স্থানীয়দের দাবি, প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী বাড়িয়ে দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রতার কারণ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্প দ্রুত শেষ না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই জনদুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

শ্রীমঙ্গলে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের আলিসারকুল (বরপাড়া) এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ...

দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান, স্বস্তি ফিরেছে হাজারো মানুষের চলাচলে

বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ উপজেলার জিউধরা ইউনিয়নের একরামখালী গ্রামের আইয়ুব আলী খানের বাড়ি থেকে পঞ্চগ্রাম সম্মিলিত ...