জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬ ৬:২০ পিএম , আপডেট: জুন ২০, ২০২৬ ৬:২২ পিএম

উচ্চ তাপমাত্রায় বেড়ে ওঠা নতুন জাতের কাঁচা মরিচ উদ্ভাবন করা গেলে ভবিষ্যতে দেশে মরিচের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং বাজারমূল্যের অস্থিরতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করছেন মরিচ চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

কাঁচা মরিচের উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান করে উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা ভবিষ্যতে মরিচের মৌসুম নির্ধারণ ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারকে সহায়তা করতে পারে। মানিকগঞ্জের হরিরামপুর ও শিবালয় উপজেলার মরিচ খেত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে জলবায়ুগত কারণে মরিচের উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং তখনই বাজারে দাম বেড়ে যায়।

বছরের শুরুতেই শীত, কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের কারণে মরিচ খেতে ‘থুবড়া’ বা মাইট আক্রান্ত রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে সরাসরি ভোক্তাদের ওপর। চড়া দামে মরিচ কিনতে হয় সাধারণ মানুষকে। অনেক সময় মরিচ আমদানির এলসি খোলার দিকেও তাকিয়ে থাকতে হয়।

শুধু শীতই নয়, বছরের মাঝামাঝি সময়ে তীব্র খরা এবং শেষের দিকে অতিবৃষ্টিও মরিচের বাজারকে অস্থির করে তোলে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মরিচের চারায় থুবড়া রোগ দেখা দিলে তারা বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব প্রতিকার কার্যকর হয় না। ফলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হন কৃষকরা। উৎপাদন কমে গেলে বা সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে বাজারে কাঁচা মরিচের দাম বেড়ে যায়। এতে কৃষক কিছুটা লাভবান হলেও ভোক্তাদের দুর্ভোগ বাড়ে।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত খড়ায় জমির আর্দ্রতা নষ্ট হয়ে যায়। পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হয়ে মরিচ গাছ উৎপাদন সক্ষমতা হারায়। ফলে আবারও দেখা দেয় মরিচের স্বল্পতা এবং দাম বৃদ্ধি।

বছরজুড়ে সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শনে দেখা গেছে, প্রচণ্ড খড়ায় মরিচের চারা বা গাছ খুব দ্রুত শুকিয়ে যায়। অনেক সময় গাছে মরিচ আসার পর পরিপক্ব হওয়ার আগেই গাছ মারা যায়। এতে মরিচও অপরিপক্ব অবস্থায় শুকিয়ে যায়। ফলে মাঠে উৎপাদিত সীমিত পরিমাণ মরিচ কৃষক তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন।

অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে মরিচ খেতের আইল ও ড্রেনে পানি জমে থাকে। এতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দীর্ঘ সময় পানির মধ্যে থাকায় গাছ পরবর্তী সময়ে ভালো ফলন দেওয়ার সক্ষমতা হারায়। এছাড়া অতিবৃষ্টিতে গাছের ফুল ঝরে যায়। ফলে কয়েকদিন ফলন না হওয়ায় বাজারে আবারও দাম বাড়তে থাকে।

সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, দেশে বছরে অন্তত তিনবার মরিচের উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং একই সঙ্গে তিন দফা বাজারে দাম বেড়ে যায়।

তাহলে কি এভাবেই চলবে মরিচের বাজার? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলবায়ু সহনশীল নতুন জাতের মরিচ উদ্ভাবনই হতে পারে এ সমস্যার অন্যতম সমাধান।

হরিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. তৌহিদুজ্জামান বলেন, “মানিকগঞ্জের হরিরামপুর ও শিবালয় উপজেলার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে মরিচের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে এ বছর এ অঞ্চলে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় এক হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ হেক্টর বেশি। বৈরী আবহাওয়া মোকাবিলায় উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল নতুন জাতের চারা উদ্ভাবনের বিকল্প নেই।”

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে কিং, বারি-১১০৫, বারি মরিচ-১, বারি মরিচ-২ ও বারি মরিচ-৩ জাতের মরিচের বীজ উদ্ভাবন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত এবং উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল জাত উদ্ভাবন সম্ভব হলে সারা বছর স্বল্প মূল্যে মরিচ পাওয়া যাবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।

সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দেশে মরিচ চাষ ভালো হয়। তবে বর্তমানে রাজবাড়ীর মধুখালী এলাকায় বারি মরিচ-২ জাতের উৎপাদন বেশ আশাব্যঞ্জক। এ জাতের মরিচ ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পর্যন্ত সহ্য করতে পারে। শীত শেষে এ মরিচের মৌসুম শুরু হয়ে জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত ভালো ফলন পাওয়া যায়। যেসব অঞ্চলে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা থাকে, সেখানে বারি মরিচ-২ চাষে ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া বারি মরিচ-১ থেকে ৬ পর্যন্ত (বারি-২ ব্যতীত) অন্যান্য জাত শীত মৌসুমে চাষের জন্য উপযোগী বলে জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

মানিকগঞ্জ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “অতিরিক্ত বৃষ্টি ও উচ্চ তাপমাত্রায় সাধারণত মরিচের চারা নষ্ট হয়ে যায়। তাই বগুড়াস্থ গবেষণাগারে আমরা আরও উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল নতুন জাতের মরিচ উদ্ভাবনে কাজ করছি। যাতে যেকোনো বৈরী আবহাওয়াতেও মরিচের উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়।”

তিনি আশা প্রকাশ করেন, জলবায়ু সহনশীল নতুন জাতের মরিচ উদ্ভাবন করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে মরিচের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, বাজার স্থিতিশীল হবে এবং ভোক্তারাও সাশ্রয়ী মূল্যে মরিচ কিনতে পারবেন।

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

পিকআপ সিএনজিচালিত অটোরিকশা মুখোমুখি সংঘর্ষে যুবক নিহত

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ ইউনিয়নের হাতলিয়া এলাকায় পিকআপ ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে জুড়ীর এক ...

কুড়িগ্রামে শিশু সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতকরণে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

কুড়িগ্রামে শিশু সুরক্ষা ও শিশুদের অধিকার নিশ্চিতকরণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় জোরদারে একটি সমন্বয় ও পরামর্শ ...

খানজাহান আলী বিমানবন্দর চালু হলে বদলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন খানজাহান আলী (রহ.) বিমানবন্দর প্রকল্প আবারও আলোচনায় এসেছে। প্রায় তিন দশক ...