‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে

”টেকসই উত্তরণে সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য”

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬ ৪:১৯ পিএম

বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণে সুশাসন, রাজস্ব সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় কার্যকর ব্যয়, নারী-কেন্দ্রিক সহায়তা, দেশীয় শিল্পে লোকাল কন্টেন্টভিত্তিক পাবলিক প্রকিউরমেন্ট এবং সবুজ বাজেটায়নের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ঝুঁকিমুক্ত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। আজ (২৫ জুন ২০২৬ বৃহস্পতিবার) বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তরা এ কথা বলেন| ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য সচিব এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্বাহী প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমাদের সরকার সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার’ ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা জোরদার করছে। প্রবৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে কুমার, তাঁতী, কারুশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কর্মসূচির আওতায় দক্ষতা উন্নয়ন, ঋণ, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বাজার সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের মাধ্যমে সকল মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।” তিনি কলেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে নিয়ন্ত্রণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার জন্যে ডিরেগুলেশনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে ড্যাশবোর্ড চালু করা হচ্ছে, যাতে করে প্রতিটি প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা দেখে প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিএসইসি পুনর্গঠন করা হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়িয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে, যাতে করে একটি টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি লুটতরাজ-ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কাঠামোতে রূপান্তরিত হবে, তততিন পর্যন্ত যত সুন্দর বাজেট ও পলিসি গ্রহণ করি না কেন আমরা খুব সফল হতে পারব না।’ তিনি বলেন, স্বাধীনতাপরবর্তী গত ৫৪ বছরে দুভার্গ্যজনকভাবে বাংলাদেশের জন্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে লুটপাট, দুর্নীতি ও রেন্ট-সিকিং নির্ভর অর্থনীতি। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটি উৎপাদনশীল বা প্রোডাকটিভ অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ, লুটপাটের অর্থনীতিতে সম্পদ সৃষ্টি হয় না; বরং অল্প কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয় এবং বৈষম্য বাড়ে। অন্যদিকে প্রোডাকটিভ অর্থনীতি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ বাড়ায়, উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং জনগণের জীবনমান উন্নত করে। আমরা যদি কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব না দিই, তাহলে টেকসই উন্নয়ন কখনোই অর্জন সম্ভব হবে না। শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বাড়লেই হবে না; সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।

র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক তাঁর ‘সামষ্টিক অর্থনীতি ও বাজেটের সামগ্রিক চিত্র’ শীর্ষক প্রবন্ধে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, পুনরুদ্ধার এবং রূপান্তরের ওপর জোর দিয়ে বলেন, আগামী বাজেটের ৬.৫ শতাংশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঘরোয়া চাহিদার শক্তিশালী পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। কারণ রাজস্ব আহরণই এখন ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক কাঠামোর সবচেয়ে দুর্বল ভিত্তি। এক বছরে ৪৭ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ক্রমবর্ধমান সুদ পরিশোধ নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাজস্ব স্থান সংকুচিত করছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক সহায়তা হ্রাসের এই সময়ে বাহ্যিক অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অত্যান্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই দীর্ঘমেয়াদে ৮.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বদলে ম্যাক্রো-স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণের মূল চাবিকাঠি হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ তাঁর ‘উন্নয়ন কৌশল ও বিনিয়োগ পরিবেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে আনতে হলে কেবল কর ছাড় বা ভর্তুকি দিয়ে হবে না, বরং একটি সুস্থ ও স্বচ্ছ বিনিয়োগ পরিবেশ ˆতরি করতে হবে। গত কয়েক দশকের উন্নয়ন মডেল অনেকটা প্রতিক্রিয়াশীল ছিল, এখন আমাদের পরিকল্পিত ও কৌশলগত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার দিকে নজর দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল করা না গেলে বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়বে না। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া বাজেটের কোনো ঘোষণাই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রমাণভিত্তিক গবেষণার আলোকে কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই।

বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস তার ‘কর্মসংস্থান ও অসমতা হ্রাস’ শীর্ষক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আয়-ˆবষম্য হ্রাসের ওপর তাঁর বক্তব্য রাখেন। তিনি উল্লেখ করেন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা অর্থনীতিতে ˆবষম্যের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধিই লক্ষ্য নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে তা দেখা জরুরি। তিনি যুক্তি দেন, কৃষি খাতের আধুনিকায়ন এবং কৃষি-ভিত্তিক শিল্পের প্রসার ঘটানো গেলে গ্রামীণ কর্মসংস্থনের বড় সংকট নিরসন সম্ভব। পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বলয় বা পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনার দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, শহরের দরিদ্র, প্রতিবন্ধী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা ও লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি না থাকলে সামাজিক বৈষম্য কখনোই কমবে না।

বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক ড. অতনু রব্বানী ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এর স্বাস্থ্য খাত: প্রতিশ্রুতি, চ্যালেঞ্জ ও সামনের পথ’ প্রবন্ধে বলেন, এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করে জিডিপির ১.০২ শতাংশে উন্নীত করা একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, যা চিকিৎসাকে ব্যয় নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে দেখার দর্শন ˆতরি করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ১ বছরে বাজেট দ্বিগুণ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা একই থাকায় তা ব্যয়যোগ্য হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা থেকে প্রতিরোধমূলক সেবার দিকে নজর দেওয়া ইতিবাচক, কিন্তু আউট-অফ-পকেট খরচ কমাতে হলে জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে হবে। ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামো বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা ‘শিক্ষা ও শ্রমবাজার: জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭’ প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির টেকসই অগ্রগতির জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন অপরিহার্য। এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল শিক্ষা, বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, সৃজনশীল অর্থনীতি ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে যুব বেকারত্ব, দক্ষতার অমিল এবং নারীদের কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা দূর করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, গ্রামীণ যুবসমাজ ও উচ্চশিক্ষিত বেকারদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি। কেবল শিক্ষা ও শ্রমবাজারের সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশ একটি উৎপাদনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শারমিন্দ নীলোর্মি তাঁর ‘জেন্ডার বাজেট ২০২৬-২৭: পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, বাজেটে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতা নিশ্চিত করতে ৪৪টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জিডিপির ৪.৮ শতাংশ অর্থাৎ মোট বাজেটের ৩৪ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল যথাক্রমে ৫.২৩ এবং ৩৪.৩৭ শতাংশ। বরাদ্দ কমানো হলেও ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে ৪১ লক্ষ নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা প্রদান এবং কৃষক কার্ডের মাধ্যমে নারী কৃষকদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা সাধুবাদযোগ্য। তবে জেন্ডার বাজেট প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানের যথেষ্ট অভাব, ডে-কেয়ার সেন্টারের অপ্রতুলতা এবং নারীদের আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের অন্তরায় দূরীকরণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র আইন, ২০২১-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব উৎসাহিত করা এবং কর্মজীবী নারীদের জন্য শিশু যত্ন কেন্দ্র স্থাপনে ফেরতযোগ্য ঋণ ও কর-ছাড় চালু করার দাবি করেন।

বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল ‘বাংলাদেশের শিল্পায়ন কৌশলের পুনর্গঠন: শিল্প উন্নয়নে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে সরবরাহভিত্তিক পদক্ষেপ (যেমন কর ছাড়, ভর্তুকি) বেশি থাকলেও চাহিদাভিত্তিক বা বাজার নিশ্চিত করার কোনো কৌশল নেই। তিনি যুক্তি দেন, একটি দেশ তখনই শিল্পায়িত হয় যখন রাষ্ট্র নিজেই তার প্রথম ও বৃহত্তম গ্রাহক হয়। তিনি ভারতের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট নীতির উদাহরণ টেনে বলেন, আমাদেরও নির্দিষ্ট ৩-৫টি খাতে (যেমন- বাস ও ভারী যানবাহন, সৌর প্যানেল, আইটি হার্ডওয়্যার) ‘লোকাল কন্টেন্ট’ ম্যান্ডেট চালু করতে হবে। তিনি প্রস্তাব করেন, সরকারি বাজেটে বাস ক্রয়ে ৪০ শতাংশ দেশীয় উপাদান ব্যবহারের শর্ত আরোপ করলে তা দেশীয় শিল্পের জন্য একটি বিশাল ও নিশ্চিত বাজার তৈরি করবে, যা কর ছাড়ের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যায়ের (বুয়েট) সহযোগী অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম তাঁর ‘সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন: প্রান্তিক, দরিদ্র ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ প্রবন্ধে বলেন, বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ২৫টি মন্ত্রণালয়ের ৯০টি কর্মসূচির এই বিশাল বরাদ্দ খণ্ডিত ব্যবস্থার কারণে সঠিক লক্ষ্যগ্রহণে ব্যর্থ হতে পারে।

সেমিনারে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ টি এম নূরুল আমিন এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)। প্যানেল আলোচনায় তাঁরা বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও পুঁজিবাজারে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে ডিজিটাল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং কৃষক কার্ডের সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন জরুরি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী নির্বাচনে প্রক্সি মিনস টেস্ট এবং ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্টির মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনতে হবে, যাতে তৃণমূল পর্যন্ত সঠিক ব্যক্তির কাছে সহায়তা পৌঁছায়। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। তা ছাড়া দেশীয় শিল্পায়নকে এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রকে কেবল কর ছাড় না দিয়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্টের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদনের জন্য নিশ্চিত বাজার তৈরি করতে হবে এবং ‘লোকাল কন্টেন্ট’ নীতি কৌশলগতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তারা আরো বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, যার প্রভাব সরাসরি আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকার ওপর পড়ছে। অথচ বাজেটে জলবায়ু তহবিলের বরাদ্দ থাকলেও তা প্রকৃত অর্থায়নের চাহিদার তুলনায় নগণ্য। জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই দেশীয় উৎস থেকে জলবায়ু অর্থায়নের কৌশল ˆতরি করতে হবে এবং সবুজ বাজেটায়নকে আরও জোরদার করে জলবায়ু-সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণে পাবলিক প্রকিউরমেন্টে দেশীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, আগামী বাজেট ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কৌশলকে তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড় করানো প্রয়োজন। প্রথমত, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত সংস্কার; দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দকে কেবল ব্যয় নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা এবং এর সুশাসন নিশ্চিত করা; এবং তৃতীয়ত, শিল্পায়নের জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্টকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রমুখ অংশ নেন।

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এআইর ব্যবহার সম্ভাবনাময়

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ব্লকচেইনের ব্যবহার সম্ভাবনাময় বলে জানিয়েছেন আলোচকরা। শনিবার (১৯ জুলাই) ...

২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে বেপজার অবদান সাড়ে ১৭ শতাংশ

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও দেশের সামগ্রিক রপ্তানি হ্রাসের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন ...