
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলো বীমা শিল্প। তবে এই খাতের অগ্রগতি ও জনগণের আস্থা অর্জনে তিন সমস্যা ব্যাধির আকার ধারণ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বীমা খাতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সুশাসন, দক্ষ বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকবান্ধব বীমা প্রোডাক্ট। তাদের মতে, বীমা খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে নীতিবান মানবসম্পদ, আইডিআরএর সঠিক নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
বীমা কোম্পানিগুলোর আয় মূলত গ্রাহকদের প্রদত্ত প্রিমিয়াম থেকে আসে। ঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভবিষ্যতে গ্রাহকের দাবি পরিশোধের জন্য এই তহবিলই মূল ভিত্তি। এখানে ঘাটতি হলে সব জায়গায় ঘাটতি দেখা দেয়। বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ বীমা কোম্পানি তাদের তহবিল ব্যাংক ডিপোজিট, সরকারি বন্ড ও কিছু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগ এর গুরুত্ব দেয়া উচিত প্রতিটি কোম্পানির।
২০২৪ সালের জীবন বীমা খাত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, লাইফ ও নন-লাইফ মিলে মোট বীমা খাতে প্রিমিয়াম সংগ্রহের পরিমান ১৮ হাজার ৭৬৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে তা ছিল ১৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। তবে ২০২৫ সালের জুন প্রর্যন্ত জমা লাইফ বীমাতে মাত্র ২,৮৬১ কোটি টাকা। অপরদিকে, ২০২৪ সালে লাইফ ইন্সুরেন্স খাতের কোম্পানিগুলো ১১ হাজার ৮৫০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা খরচ করে ফেলেছে। গ্রাহকের দায় পরিশোধে লাইফ ফান্ডে যুক্ত হয়েছে মাত্র ৪১৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ফলে কোম্পানিগুলোর সংগৃহীত গ্রস প্রিমিয়ামের ৩.৩৯ শতাংশ গ্রাহকের তহবিলে জমা করতে পারলেও বাকী ৯৬.৬১ শতাংশ খরচ করে ফেলেছে। একই বছরে নন-লাইফ খাতে প্রিমিয়াম সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫০২ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে ছিল ৫ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা।
এদিকে সুশাসনের অভাবেই পিছিয়ে আছে বাংলাদেশের বীমা খাত। অনেক কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে অনিয়ম, প্রিমিয়াম ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্বসহ একাধিক কারণে জনগণের আস্থা কমছে। বাংলাদেশ বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু বীমা কোম্পানি সঠিকভাবে গ্রাহকের প্রিমিয়াম বিনিয়োগ না করে অনৈতিক পথে পরিচালনা করছে। এর জন্য জরিমানা করা হয়েছে। তবে কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া বাকিগুলো নিজেদের লুটপাটের অংশ হিসেবে বীমা কোম্পানিকে বেছে নিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকে দুদকের ও কোর্টের মামলায় জেলে রয়েছে এবং অনেকে পালাতক রয়েছেন।
চলতি বছরের তিন মাসে জীবনবিমা খাতের সম্পদ বাড়ছে মাত্র ৪৮৫ কোটি টাকা। আইডিআরএর তথ্য মতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের জীবন বিমা খাতের ৩৫ টি কোম্পানির সম্পদ ছিলো ৪৮ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের জুন প্রর্যন্ত ৩৫টি কোম্পানির সম্পদের পরিমান দারিয়েছে ৪৯ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। যা ২০২৩ সালে মোট সম্পদ ছিল ৪৭,০৫৫ হাজার কোটি টাকা।
তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোম্পানিগুলোর সম্পদ বেড়েছে মাত্র ১,৫০৫ কোটি টাকা। আর সাধারন বিমা কোম্পানিগুলোর সম্পদের পরিমান ২০২১ সালে ১০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা এবং ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। তবে ২০২৪ সালে সপদরে দিক দিয়ে জীবন বীমা খাতের ৩৫ টি কোম্পানির মধ্যে ১৩ টি কোম্পানির সম্পদ কমেছে, বেড়েছে ২১ টির।
আর সম্পদের বিপরীতে ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিনিয়োগ হয়েছে ৪১ হাজার ১১২ কোটি টাকা। মুনাফা হয়েছে ৮৮৪ কোটি টাকা। কিন্তু মুনাফার অপ্রতুলতার পাশাপাশি বীমা খাতে তামাদি পলিসির সংখ্যা বাড়ছে দিরেন পর দিন। ২০২৪ সালে ৭০ লাখ ৮৬ হাজার পলিসির মধ্যে ১২ লাখ ৫০ হাজার তামাদি পলিসি হয়েছে। চলতি বছরেরও ৩ লাখ ২৫ হাজার তামাদি পলিসি হয়েছে।
বীমা খাতে তিন সমস্যা নিয়ে ’ অর্থনীতিবীদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বানিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশের ইন্সুরেন্স কোম্পাগিুলোর প্রধান সমস্যা তিনটি। তার মধ্যে একটি হলো কোম্পানিগুলো বীমা খাতের সম্পদগুলো ভালো জায়গায় বিনিয়োগ করেন না। সবাই লুটপাটের চিন্তা নিয়েই বিনিয়োগ করেন নিজের পছন্দের জায়গায়, প্রতিষ্ঠানের লাভের বিষয়টা উপেক্ষিত থাকে। প্রতিষ্ঠানে সুশাসন না থাকা এবং নতুন বীমা প্রোডাক্ট সংযোজন না করা। এসবসহ প্রতিষ্ঠানের পরিবারতন্ত্র রোধ করতে হবে এবং দুষ্কৃতিকারীদের হাতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া যাবে না।
তিনি আরো বলেন, বীমা কোম্পানিগুলোর বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এই খাতে স্থিতিশীলতা আসবে না। সুশাসন মানে শুধু নিয়ম মানা নয়, বরং গ্রাহকের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
আইডিআরএ বর্তমানে ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে প্রতিটি কোম্পানির প্রিমিয়াম সংগ্রহ, দাবি নিষ্পত্তি ও বিনিয়োগ কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করা যায়। এতে অনিয়ম কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে তাদের কথায় এসব সমস্যা সমাধান হয়নি এতোদিন, আগামীতে তাদের কথায় কাজে কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা এখন দেখার বিষয়।
এদিকে ২০২৪ সালে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো প্রায় ৩৪ শতাংশ ক্লেইম পরিশোধ করতে পারেনি, ফলে বীমাকারীর প্রায় ৪ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা বকেয়া পরে গেছে। অন্যদিকে, নন-লাইফ বিমা খাতে ৬৮ শতাংশ ক্লেইম এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, যার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। লাখ লাখ গ্রাহক বীমা দাবি নিষ্পত্তির জন্য কোম্পানিগুলোর দরজায় ঘুরছে।
বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করে। সরকার যদি বীমা তহবিলকে উন্নয়ন প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়, তবে জাতীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের যুগ্ন সম্পাদক এস এম নুরুজ্জামান বলেন, আইডিআরএ ২০১০ বীমা আইন সংশোধন করছে। ফলে এর সংশোধনের মাধ্যমে বীমা খাতে আস্থা ফিরে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যাক্ত করেন।
ভালো বীমা প্রোডাক্ট নিশ্চিত করা বীমা খাতের অন্যতম দাবি রয়েছে। বাংলাদেশে এখনো বীমা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা কম। অনেকেই মনে করেন বীমা মানেই ঝামেলা বা অর্থের অপচয়। কিন্তু বাস্তবে একটি ভালো বীমা প্রোডাক্ট জনগণের আর্থিক সুরক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হতে পারে।
বর্তমানে বাজারে জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও গাড়ি বীমা পলিসি থাকলেও, অনেক পলিসি জটিল শর্তে ভরপুর ও প্রযুক্তি-সুবিধাহীন। ফলে গ্রাহকরা আকৃষ্ট হচ্ছেন না। সময় এসেছে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী প্রোডাক্ট তৈরি করার। বিশেষত নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য মাইক্রো ইন্স্যুরেন্স, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য কৃষি বীমা এবং ডিজিটাল ব্যবসার জন্য সাইবার বীমা চালুর প্রয়োজন রয়েছে। এসব সেবায় সাশ্রয়ী প্রিমিয়াম, দ্রুত ও ডিজিটাল দাবি নিষ্পত্তি সম্পূর্ন, গ্রাহক সেবা হেল্পলাইন এবং অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
বীমা খাতে লাইফ ফান্ড বিবেচনা করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর লাইফ ফান্ডে জমা পড়েছিল ৯০৩ কোটি টাকা যা ২০২৪ সালের অর্ধেকে নেমে ৪১৫ কোটি টাকা। হিসেবে করলে লাইফ ফান্ডে জমা পড়ার হার ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৩৯ শতাংশে। এভাবে যদি লাইফ ফান্ডে জমার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে তাহলে বীমা খাত ও গ্রাহকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। কারন কোম্পানিগুলো ৯৬.৬১ শতাংশই খরচ করে ফেলেছে।
তবে, বীমা খাতে ডিজিটাল রূপান্তর ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ব্যাংকাসুরেন্স চালু হয়েছে। এখন অনলাইনে প্রিমিয়াম পরিশোধ, পলিসি নবায়ন ও ক্লেইম ট্র্যাকিংয়ের সুবিধা চালু হচ্ছে। এতে গ্রাহকের সময় ও খরচ দুটোই কমছে। আইডিআরএ র পরিকল্পনায় আছে, ২০২৬ সালের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় “ইন্স্যুরেন্স ডেটা হাব” চালু করার। যা বীমা কোম্পানি, গ্রাহক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় সহজ করবে।
তবে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের বীমা খাতের সামনে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা, তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল বিনিয়োগ কৌশল এবং সীমিত প্রোডাক্ট বৈচিত্র্য এই খাতকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সুশাসন নিশ্চিত করা যায়, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা পেশাদারভাবে পরিচালিত হয় এবং গ্রাহককেন্দ্রিক বীমা প্রোডাক্ট বাজারে আনা যায় তবে বীমা খাত শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নয়, জাতীয় উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
এএ
- ১ভারতের নতুন শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী
- ২তৃণমূল সংগঠনের খোঁজ-খবর ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী
- ৩‘তেলাপোকাদের’ চিহ্নিত করে গুন্ডা দমন আইনে মামলার ঘোষণা শুভেন্দুর
- ৪মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ
- ৫পল্টনে আল ওয়াহদাহ ফাউন্ডেশনের ফ্রি কুরআন বিতরণ
- ৬খেলাধুলা যুবসমাজকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পারে : আইজিপি
- ৭চকরিয়ায় বন্যার্ত ৫০ পরিবারকে ধরা’র ত্রাণ বিতরণ
- ৮সৌদিতে ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের হামলা, তেল পরিশোধনাগার থেকে বের হচ্ছে ধোঁয়া
- ৯ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেলেঙ্কারিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জড়িত
- ১০রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রজ্ঞাপন জারি
- ১চা শ্রমিককে মারধরের অভিযোগে দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি ও মানববন্ধন
- ২চকরিয়ায় বন্যার্ত ৫০ পরিবারকে ধরা’র ত্রাণ বিতরণ
- ৩বীরগঞ্জে সাজাপ্রাপ্ত ওয়ারেন্টভুক্ত আসামী গ্রেফতার
- ৪রংপুর বিভাগের নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় তারেক রহমান
- ৫কুলাউড়ায় তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু
- ৬হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু
- ৭হাইটেক পার্ক আধুনিকায়ন, বায়োটেক পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
- ৮সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই হতে পারে দেশের নতুন চালিকাশক্তি: প্রধানমন্ত্রী
- ৯চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যায় ভেসে গেল ফসল, কৃষকের মাথায় হাত
- ১০কুড়িগ্রামে রয়েল হাসপাতালকে জরিমানা ও কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ





পাঠকের মতামত