জাহাঙ্গীর আলম আনসারী, সিনিয়র রিপোর্টার
প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬ ৭:৫৩ এএম , আপডেট: জুলাই ২২, ২০২৬ ৪:৪২ পিএম

ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ আবার বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ধারাবাহিক বাড়ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ। তবে এপ্রিলে এসে মানুষের হাতে থাকা টাকা আবার ব্যাংকে ফিরতে শুরু করেছিল। কিন্তু মে মাসে এসে মানুষের হাতে নগদ টাকা আবার বেড়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংকের বাইরে থাকা মুদ্রার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। আর পরের মে মাসে সেটা বেড়ে দাড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। একই সঙ্গে বেড়েছে ছাপানো টাকাও (রিজার্ভ মানি) বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে কথা বললে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, দুইটি কারণে মে মাসে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বাড়তে পারে। প্রথমত, মে মাসের শেষের দিকে কুরবাণীর ঈদ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কুরবাণী দেয়ার জন্য মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করেছে। গরুর ব্যাপারীরা হয়তো বেচাকেনা শেষে ঈদের পর জুন মাসে টাকা আবার ব্যাংকে জমা করেছে। দ্বিতীয়ত, কিছু ব্যাংকের উপর মানুষের আস্থার সংকট থাকার কারণেও টাকা উত্তোলন করতে পারে।

তিনি বলেন, এখন দেখতে হবে উত্তোলনকৃত এই বিশাল অংকের টাকা মানুষের হাতে কতদিন থাকে। যদি এই টাকা পরবর্তীতে মানুষ ব্যাংকে জমা না রাখে তাহলে অর্থনীতির জন্য খারাপ। কারণ ব্যাংকে টাকা না আসলে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারবে না। ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটবে না। উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, এক মাসে মানুষের হাতে নগদ এই বিশাল অংকের টাকা কেন বেড়েছে এটা বিশ্লেষণের বিষয়। তবে ধারণা করা যাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ আরও দুয়েকটি ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনের প্রবণতা অন্য সময়ের চেয়ে একটু বেশি ছিল। হয়তো এটার কারণে মে মাসে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছিল। জানুয়ারিতে এটি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে হয় ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা এবং মার্চে তা আরও বেড়ে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকায় পৌঁছায়। আর এপ্রিলে এসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ কমেছিল ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি ১ লাখ টাকা। কিন্তু মে মাসে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা।

মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুুলে নেওয়ার পর যা আর ব্যাংকে ফেরত আসে না, তা-ই ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকা হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকে ফিরতে শুরু করে মানুষের হাতে রাখা টাকা। যেটার ধারাবাহিকতা চলে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। পরের মাস মার্চে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ আবার বেড়ে যায়। এরপর এপ্রিলে এসে সেটা আবার কমে। এরপর মে মাস থেকে জুন পর্যন্ত আবার বাড়ে। জুলাই থেকে সেটা আবার ধারাবাহিক নভেম্বর পর্যন্ত কমছিল।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনিয়ম-দুর্নীতি আর লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতের উপর মানুষের আস্থার সংকট চরম আকার ধারণ করেছিল। আতঙ্কিত হয়ে মানুষ ব্যাংকে রাখা টাকা তুলে নিয়ে বাসায় রাখতেন। এতে করে ব্যাংকগুলোতে দেখা দিয়েছিল চরম তারল্য সংকট। এমন অবস্থায় ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ শুরু করে। কিন্তু এতেও কাজে আসেনি। প্রতি মাসেই বাড়ছিল মানুষের হাতে নগদ টাকা তথা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ। ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত মানুষের হাতে নগদ টাকা বা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। তবে ওই বছর ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর ব্যাংক খাতের উপর মানুষের আস্থা পুনরায় ফিরে আসতে শুরু করে।

সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে মানুষের হাতে নগদ টাকা বেড়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এপ্রিলে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। আর পরের মে মাসে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে দাড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই মানুষের হাতে নগদ বা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ কমতে থাকে। ওই বছরের আগস্টে মানুষের হাতে বা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। আর পরের মাস সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪ লাখ, পরের মাস অক্টোবরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি ৭ লাখ, পরের মাস নভেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫৬ কোটি ৭ লাখ, পরের মাস ডিসেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭১ কোটি ৫ লাখ, গত বছরের জানুয়ারিতে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ২৩০ কোটি ৯ লাখ এবং ফেব্রুয়ারিতে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি ৬ লাখ টাকা।

আর ২০২৪ সালের মার্চে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৩১ কোটি ৬ লাখ টাকা, এপ্রিলে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। আর মে মাসে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৮ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ জুন মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি ৯ লাখ টাকা, পরের মাস জুলাইয়ে আবার কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি ১ লাখ টাকা, আগস্টে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৪ কোটি ৬ লাখ টাকা, সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ কোটি ২ লাখ টাকা, অক্টোবরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি ৭ লাখ টাকা, নভেম্বরে কমে দাড়ায় ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি ২ লাখ টাকা এবং ডিসেম্বরে বেড়ে দাড়ায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি ৪ লাখ টাকা, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেটা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি ৮ লাখ টাকা, ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে দাড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি ১ লাখ টাকা, মার্চে বেড়ে দাড়ায় ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং এপ্রিলে কমে দাড়ায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা এবং মে মাসে বেড়ে দাড়ায় ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।

তথ্য মতে, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ধারাবাহিক কমছিল ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ। কিন্তু নভেম্বর থেকে আবার বাড়তে শুরু করে। যেটা ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। পরের মাস নভেম্বরে সেটা বেড়ে দাড়ায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা, ডিসেম্বরে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৮৬০ কোটি, জানুয়ারিতে ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৯৫ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৪ কোটি, মার্চে ২ লাখ ৬১ হাজার ১৯৫ কোটি, এপ্রিলে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ কোটি, মে মাসে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ কোটি, জুনে ২ লাখ ৯০ হাজার ৪৩৬ কোটি, জুলাইয়ে ২ লাখ ৯১ হাজার ৬৩০ কোটি ও আগস্টে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ দশ মাসে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকা বেড়েছিল ৪৬ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।

এদিকে, মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে ছাপানো টাকাও (রিজার্ভ মানি) বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের এপ্রিলে ব্যাংক খাতে ছাপানো টাকার স্থিতি (রিজার্ভ মানি) ছিল ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। আর পরের মে মাসে ছাপানো টাকা বেড়ে দাড়ায় ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪২ কোটি ১০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে ছাপানো টাকা বেড়েছে ৫০ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

ব্যাংকারদের শৃঙ্খলাভঙ্গের মামলা দুই মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ

ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজের অভিযোগ ও শৃঙ্খলামূলক মামলা দুই মাসের মধ্যে ...

খেলাপি হলে মিলবে না ইডিএফ ঋণের নতুন সুবিধা

রপ্তানিমুখী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার অর্থায়ন আরও সুশৃঙ্খল করতে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) ...