ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতার প্রভাব

জুনে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় ধস

জাহাঙ্গীর আলম আনসারী, সিনিয়র রিপোর্টার
প্রকাশিত: আগস্ট ১৯, ২০২৬ ৮:১৪ এএম , আপডেট: আগস্ট ১৮, ২০২৬ ৯:২৫ পিএম
  • পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে ১৭,২৬২ কোটি টাকা
  • পুরো ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থায় কমেছে ১২,৮৮৮
  • এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত কমেছে ২,০৮৮ কোটি টাকা
  • প্রবাসী আয় কমেছে ২১ কোটি ডলার
  • বিনিয়োগ বেড়েছে ১২,৩৩৭ কোটি টাকা

>> ইসলামী ব্যাংকে গ্রহণযোগ্য পর্ষদ দিতে না পারলে আবার সংকট সৃষ্টি হতে পারে: মাজেদুল হক, অর্থনীতিবিদ
>> ইসলামী ব্যাংকের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, গ্রহণযোগ্য পর্ষদ দেয়ার চেষ্টা চলছে: মুখপাত্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক
>> আশা করছি ভবিষ্যতে এমন সংকট আর হবে না: আলতাফ হুসাইন, এমডি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ

চলতি বছরের জুন মাসে বড় ধাক্কা লেগেছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর আমানতে। এক মাসে পূর্ণাঙ্গ ১০টি ইসলামি ব্যাংকের আমানত কমেছে ১৭ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। আর পুরো ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত করেছে ১২ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতার ফলে গ্রাহকরা তাদের টাকা উত্তোলন শুরু করে। এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর আমানতেও। তাদের মতে, এটা ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি ভুল সিদ্ধান্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করার সময় অনিয়মে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিকে কোনোভাবেই ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা ঠিক হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের কারণেই গ্রাহকরা আতঙ্কিত হয়ে টাকা উত্তোলন করেছিল। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া। আবারও যদি কোনো বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয় তাহলে আবারও সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য মতে, ২০২৬ সালের জুন শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ দাড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। আর এর আগের মে মাস শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের আমানতের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৬ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যধানে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে ১৭ হাজার ২৬২ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে কথা বললে অর্থনীতিবিদ ও পিটিইআরসি’র চেয়ারম্যান মাজেদুল হক বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, বিগত সরকারের আমলে দেশের ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোকে একজনের হাতে তুলে দিয়েছিল। ওই সময় নামে-বেনামে ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে। এসব কারণে ব্যাংকগুলো থেকে মানুষের আস্থা উঠে গিয়েছিল। অন্তর্ববর্তী সরকারের সময়ে সংস্কার শুরু হলে মানুষের আস্থা আবার ফিরে আসতে শুরু করে। কিন্তু নতুন সরকার এসে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে একটি সমালোচিত পর্ষদ দেয়ার পরই আবার মানুষের আস্থার সংকট শুরু হয়। মানুষ টাকা তুলতে শুরু করে। এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে ইসলামি ধারার সবগুলো ব্যাংকের উপর। এজন্যই গত জুন মাসে এত বিপুল পরিমাণ আমানত কমেছে।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রেখে আসছে। বিশেষ করে শিল্পখাতে অর্থায়ন করে। প্রবাসী আয় আহরণেও ব্যাংকটি শীর্ষে রয়েছে। আমরা শুনছি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এর নতুন পর্ষদ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য পর্ষদ যদি দিতে না পারে তাহলে পুরো অর্থনীতিতে আবার এটির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকরে প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানেও পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে। তথ্য মতে, ২০২৫ সালের জুন শেষে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত ছিল ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকগুলোর আমানত দাড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে ৪ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

এ ছাড়া, চলতি বছরের জুন মাস শেষে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায়ও মোট আমানত কমেছে। তথ্য মতে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। আর এর আগের মে মাস শেষে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার ৪১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক মাসে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত কমেছে ১২ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা।

বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ রয়েছে ইসলামি ব্যাংকগুলোর হাতে। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের স্থিতি রয়েছে ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর আমানতের পরিমাণ হল ৭৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।

ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত কমার বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আলতাফ হুসাইন বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, কিছুদিন আগে একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পর ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অনেক লেখালিখি হয়েছে। এতে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে কিছু টাকা তুলে নিয়েছে। এটার প্রভাব পড়েছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর আমানতে।

তিনি বলেন, এখন আর সমস্যা নেই। আমরা নিয়মিত স্বাভাবিক লেনদেন করতে পারছি। আমরা আশা করছি এ ধরণের সংকট আর ভবিষ্যতে হবে না।

এদিকে, আমানত কমলেও ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বা ঋণ বিতরণ বেড়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে ইসলামি ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১১ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। আর মে মাস শেষে ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বা ঋণ ছিল ৫ লাখ ৯৯ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক মাসে ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থায় ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট বিনিয়োগের ২৪ দশমিক ১১ শতাংশ ইসলামি ব্যাংকগুলোর।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামিক শাখা ও উইন্ডোগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে ৪৪ কোটি ৮ লাখ ডলার। আর আগের মে মাসে এগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে ৬৫ কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় কম এসেছে ২১ কোটি ডলার।
তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসে ইসলামি ব্যাংক, শাখা ও উইন্ডোগুলোর মাধ্যমে আমদানি বিল পরিশোধ হয়েছে ৯৯ কোটি ডলার। আর আগের মে মাসে এগুলোর মাধ্যমে আমদানি বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৮৯ কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর আমদানি বিল পরিশোধ বেড়েছে ১০ কোটি ডলার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে আসা রপ্তানি আয় বেড়েছে। চলতি বছরের জুন মাসে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছে ৭১ কোটি ডলার। আর আগের মে মাসে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছে ৫৭ কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৭ কোটি ডলার।

এদিকে ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থার এজেন্ট ব্যাংকিং শাখাগুলোতেও কমেছে আমানত। তথ্য মতে, চলতি বছরের জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানতের পরিমাণ দাড়িয়েছে ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। আর আগের মে মাস শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানতের পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক মাসে ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত কমেছে ২ হাজার ৮৮ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে কথা বললে বাংলাদেশ নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, সম্প্রতি একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির গ্রাহকদের মধ্যে একটা অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। তারা কিছু টাকা তুলে নিয়েছিল। তবে লেনদেন স্বাভাবিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদেরকে তাৎক্ষণিক সাপোর্ট দিয়েছে। এমনকি প্রবাসী আয়ও কমে গিয়েছিল। এটার একটা প্রভাব ইসলামি ধারার অন্য ব্যাংকগুলোতেও পড়েছিল। যার ফলে জুন মাসে আমানত কমেছে। তবে এখন সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

নতুন পর্ষদ দেয়াকে কেন্দ্র করে আবার কোনো সংকট সৃষ্টি হতে পারে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র বলেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে ভাল একটা পর্ষদ দেয়ার চেষ্টা চলছে। আশা করি সেটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার না করলে নীতি সহায়তা নয়

সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়ের করা রিটসহ অন্যান্য মামলা প্রত্যাহার না ...

বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইসলামী ব্যাংকের এমডি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গতিশীল করতে কর্মসংস্থান ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরিই প্রধান লক্ষ্য

দেশের বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক হল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি ...

ইনস্যুরেন্স ইনোভেশন চ্যালেঞ্জে চ্যাম্পিয়ন পাইওনিয়ার

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠান পাইওনিয়ার ইনস্যুরেন্স পিএলসি ‘ইনস্যুরেন্স ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ (আইআইসি) ২০২৬’-এ চ্যাম্পিয়ন ...