ইউনুস সুজন
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ ৪:২৪ পিএম
Oplus_16909312

দীর্ঘ সময় পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে নোয়াখালী-২ আসনে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণদের মধ্যে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রত্যাশা।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ভোটগ্রহণ হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬। যেটি সারা দেশে প্রায় ১৩ কোটি নাগরিকের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচনে মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ হচ্ছে; একটি আসনে প্রার্থী মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত রয়েছে। মোট প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ মানুষ ভোটারের তালিকায় রয়েছেন, যার মধ্যে পুরুষ, নারী এবং তৃতীয় লিঙ্গসহ সবাই ভোট দিচ্ছেন।

এই নির্বাচনকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর, যখন আদর্শ পরিবর্তন ও স্বচ্ছ নির্বাচনের আশায় ভোটাররা কেন্দ্রে এসেছেন।

সারাদেশে ভোট শুরু হয় সকাল ৭:৩০টায় এবং স্থগিত ছাড়া কেন্দ্রে বিকেল ৪টা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলে। ভোটকেন্দ্রগুলোর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে লাখাধিক নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন রয়েছে এবং প্রায় ৮১টি স্বীকৃত সংগঠনের ৫৫ হাজারেরও বেশি পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন।

নির্বাচনী প্রস্তুতি বেশ আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল গত বছর ডিসেম্বর মাসে এবং নির্বাচন কমিশন তার রোডম্যাপ অনুযায়ী পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করেছে।

ভোটারদের প্রত্যাশা ও তরুণ প্রজন্ম

নোয়াখালী-২ আসনের বিভিন্ন কেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। হোসেনপুর দারুসসালাম সুন্নাহ ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রসহ একাধিক কেন্দ্রে দেখা গেছে, তরুণ-তরুণীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট প্রদান করছেন। অনেকেই জানান, নানা কারণে গত দীর্ঘ সময় তারা ভোট দিতে পারেননি; এবারের সুযোগ তাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

ভোটকেন্দ্র ঘিরে ছিল উৎসবের আবহ। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে এসে ছবি তুলছিলেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভোট দিতে এসেছেন। অনেকের চোখেমুখে দেখা গেছে দায়িত্ববোধের ছাপ। তাদের ভাষায়, “ভোট শুধু একটি প্রক্রিয়া নয়, এটি ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অংশ।”

ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী জান্নাতুল আদন ডালিয়া এবারই প্রথম ভোট দিয়েছেন। ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে তিনি বলেন,

“দীর্ঘ সময় পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। একজন তরুণ নাগরিক হিসেবে আমি চাই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠুক। আমাদের প্রজন্ম দুর্নীতি, অনিয়ম ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান চায়। আজকের ভোট সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন।”

তরুণদের অনেকেই বলেন, তারা এমন নেতৃত্ব চান, যারা তাদের স্বপ্ন ও বাস্তবতার প্রয়োজনগুলো বুঝবে এবং বাস্তব কাজ করবে।

নোয়াখালী-২ আসনে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন – জয়নাল আবেদীন ফারুক (ধানের শীষ), কাজী মফিজ (স্বতন্ত্র, কাপ-পিরিচ), সোলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া (শাপলা কলি) এবং খলিলুর রহমান (হাতপাখা)। নিজ নিজ প্রতীক নিয়ে তারা ভোটারদের সমর্থন অর্জনের লক্ষ্যে মাঠে রয়েছেন।

এদের সকলেই নিরপেক্ষভাবে ভোটারদের সমর্থন পেতে মাঠে আছেন এবং বর্তমান প্রজন্মের আশা–আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাদের নিজ নিজ প্রচার চালাচ্ছেন।

ভোটারদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রশ্নটি এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে। তাদের মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই নির্বাচনকে তারা তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন। শহীদদের আত্মত্যাগ যেন অর্থবহ হয়—এমন প্রত্যাশা থেকেই অনেকে ভোটাধিকার প্রয়োগকে দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে দেখছেন।

নোয়াখালী-২ আসনের ভোটকেন্দ্রে ভোটের উৎসব ও আনন্দ আরও জোরদার করেছে স্থানীয় জনগণ। হাফেজ মাওলানা ওলিউল্লা দেওবন্দী সকাল ফজরের নামাজ পড়ার পর সরাসরি কেন্দ্রে এসে শিপির প্রতীক জাকারিয়াকে ভোট দেওয়ার জন্য নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। দুপুর দুইটার দিকে তিনি পুরো পরিবারকে নিয়ে কেন্দ্রে আসেন এবং জানান, ভোটের আনন্দ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে সবাই অংশগ্রহণ করতে চাই।

তিনি বলেন, “ভোট আমাদের অধিকার, আমাদের দায়িত্ব। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে এই ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই একটি সৎ, ন্যায়সঙ্গত এবং উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ।”

তার মতো আরও অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে এসে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট প্রদান করছেন, যা নির্বাচনের গণতান্ত্রিক গুরুত্বকে আরও দৃঢ় করছে।
বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটি জাতীয় গণভোট (Referendum)ও অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে ভোটারদের কাছে একটিমাত্র প্রশ্ন রাখা হয়েছে — তারা “হ্যাঁ” কি “না” ভোট দেবেন “জুলাই ন্যাশনাল চার্টার” বা সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবগুলো অনুমোদনের জন্য। এই চার্টারটি একটি বিস্তৃত সংস্কার প্যাকেজ, যেখানে রয়েছে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মূল কাঠামো পরিবর্তন, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, নতুন উচ্চকক্ষসহ দ্বিকক্ষীয় সংসদ, পক্ষীয় নেতৃত্বে সীমাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা। ভোটে “হ্যাঁ” ভোট দিলে এসব প্রস্তাব বাস্তবে রূপ পাবে এবং একটি সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল গঠন করতে হবে, যারা ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশোধনগুলোকে শেষ করবে; আর “না” ভোট দিলে এই জটিল প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান হবে এবং এখনকার মতোই সংবিধান বহাল থাকবে। ভোটাররা এই হ্যাঁ/না প্রশ্নের মাধ্যমে সরাসরি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছেন, যা গণতন্ত্রের এমন একটি সরাসরি প্রক্রিয়া যেখানে জনগণের অনুমোদনই মূল সিদ্ধান্তেই প্রাধান্য পায়। গণভোটের ধারণা বাংলাদেশে আগেও তিনবার ব্যবহৃত হয়েছে—১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে, যেখানে সবগুলোতেই জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল—তবে এইবারের প্রশ্নটি হয়তো দেশের রাজনৈতিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদিভাবে প্রভাবিত করবে।

দিনশেষে ফলাফল যাই হোক, নোয়াখালী-২ আসনে তরুণ ভোটারদের এই সক্রিয় উপস্থিতি নির্বাচনী পরিবেশে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে—যা ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিধারায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফেরদৌসি শাহরিয়ার আর নেই

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কৃতী সন্তান ফেরদৌসি শাহরিয়ার রিতা (৫৪) মারা ...

কাপাসিয়ায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়মের অভিযোগ

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় চরদুর্লভ খান আঃ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়মের ...

সরকারি বীজ খোলা বাজারে অবৈধভাবে বিক্রির দায়ে ৭ দিনের কারাদণ্ড

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার চৌধুরী বাজারে সরকারি ট্যাগযুক্ত ২৪ বস্তা বীজ খোলা বাজারে অবৈধভাবে বিক্রির সময় ...