নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬ ৭:৪৩ এএম , আপডেট: জুন ১৭, ২০২৬ ৯:৪৬ পিএম
  • টানা দুই প্রান্তিক ধরে কমছে তৈরি পোশাকের আয়
  • নিটওয়্যারে বড় ধস
  • ওভেনেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি

বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার ক্রমাগত অনিশ্চয়তার জেরে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক মোড় দেখা দিয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৯,১৯৭.৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৯২০ কোটি ডলারের কিছু বেশি), যা এর আগের প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ৯,৭৪৮.৪৫ মিলিয়ন ডলারের আয়ের চেয়ে দৃশ্যমানভাবে কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পতন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বার্ষিক বা ‘ইয়ার-অন-ইয়ার’ তুলনায়। গত অর্থবছরের ঠিক একই সময়ে (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৫) যেখানে এই খাত থেকে আয় হয়েছিল ১০,৩৪৯.২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (১,০৩৫ কোটি ডলার), সেই তুলনায় এবার দেশের পোশাক রপ্তানি এক ধাক্কায় ১১.১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি একক প্রান্তিকটিতেই প্রায় ১,১৫১.৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (১১৫ কোটি ডলারের বেশি) হারিয়েছে।

টানা দুই প্রান্তিক ধরে পতন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিগত প্রান্তিকগুলোর অফিশিয়াল ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) থেকেই পোশাক খাতের এই ধীরগতি শুরু হয়েছিল। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৯,৯২৫.১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানির ৮০.৮৮ শতাংশ ছিল। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কিছুটা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৯,৭৪৮.৪৫ মিলিয়ন ডলারে। তবে সদ্য সমাপ্ত জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ প্রান্তিকে এসে এই পতন আরও তীব্র রূপ ধারণ করে ৯,১৯৭.৮০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ফলে টানা দুই প্রান্তিক জুড়েই প্রান্তিকভিত্তিক নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় এই রপ্তানি খাত।

নিট ও ওভেনের চিত্র

চলতি জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ প্রান্তিকে পোশাক খাতের প্রধান দুই উপ-খাত—নিটওয়্যার এবং ওভেন গার্মেন্টস, উভয় জায়গাতেই গত বছরের তুলনায় বড় ধাক্কা লেগেছে।

নিটওয়্যার: ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নিটওয়্যার খাত থেকে আয় এসেছিল ৫,৩০৮.৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বড় পতনের মুখে পড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,৬১৩.৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে নিটওয়্যার খাতে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে, যেখানে ১৩.১০ শতাংশ বার্ষিক পতন রেকর্ড করা হয়েছে।

ওভেন গার্মেন্টস

২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ কোয়ার্টারে ওভেন খাত থেকে আয় হয়েছিল ৫,০৪০.৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪,৫৮৪.৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। নিটওয়্যারের তুলনায় তীব্রতা কিছুটা কম হলেও ওভেনেও এবার ৯.০৫ শতাংশ বার্ষিক নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক বাজারে সুতা-কাপড়ের বাড়তি দাম, আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রেতাদের সতর্ক ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা, উচ্চ জাহাজ ভাড়া এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণেই এই দুই প্রধান খাতে এই বিপর্যয় নেমে এসেছে। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেওয়াও অন্যতম কারণ।

প্রকৃত ডলার সাশ্রয় কমেছে

রপ্তানি আদেশের মন্দার কারণে এই প্রান্তিকে পোশাক খাতের কাঁচামাল (তুলা, সুতা, কাপড় ও আনুষঙ্গিক এক্সেসরিজ) আমদানি খরচ গত বছরের তুলনায় বেশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩,৫৫৫.১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা মোট আয়ের ৩৮.৬৫ শতাংশ। (উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে কাঁচামাল আমদানিতে খরচ হয়েছিল ৪,২৫৩.৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।

কাঁচামাল আমদানির এই খরচটি বাদ দেওয়ার পর চলতি কোয়ার্টারে দেশে প্রকৃত বা নিট বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে ৫,৬৪২.৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। শতকরা হিসেবে এটি মোট আয়ের ৬১.৩৫ শতাংশ, যা গত ২০২৫ সালের একই প্রান্তিকের (৫৮.৯০%) চেয়ে ভ্যালু এডিশনের হার কিছুটা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। তবে শতাংশের হিসেবে ভ্যালু এডিশন বেশি মনে হলেও, সামগ্রিক রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে গত ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চের প্রকৃত নিট ডলার সাশ্রয়ের (৬,০৯৫.৪৪ মিলিয়ন ডলার) তুলনায় এবার দেশ প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা কম হারিয়েছে ৭.৪৩ শতাংশ।

শীর্ষ বাজারে উচ্চ নির্ভরতা

বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা ও মূল্যস্ফীতির মধ্যেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের শীর্ষ বাজারগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক নির্ভরতা কাটেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা চিত্র বলছে, আলোচ্য তিন মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, কানাডা এবং বেলজিয়ামে দেশের পোশাক খাতের মোট রপ্তানির সিংহভাগ অর্জিত হয়েছে। এই তিন মাসে ৯টি দেশ থেকে রপ্তানি আয় এসেছে মোট ৬,৫১৩.৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা পুরো তৈরি পোশাক খাতের মোট রপ্তানি আয়ের ৭০.৮১ শতাংশ শেয়ার বা অংশ দখল করে রেখেছে, যা গত বছরের (৭০.৫৬%) প্রায় কাছাকাছি।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাণিজ্যমন্ত্রী নতুন বিনিয়োগ সৃষ্টি ও ব্যবসার সম্প্রসারণে কাজ করছে সরকার

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী ...

এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে ৫ বছর মেয়াদি নতুন কর্মপরিকল্পনা

বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেছেন, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশের বাণিজ্য সক্ষমতা ...

জিডিপির বাইরে থাকা পাঁচ খাতে বাড়ছে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও মূল্য সংযোজন

কুরিয়ার সেবা খাতে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন মানি এক্সচেঞ্জ খাতে বেড়েছে ট্রেড মার্জিন ও ...