বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ৬, ২০২৬ ৪:৩৭ পিএম , আপডেট: জুলাই ৬, ২০২৬ ৪:৪২ পিএম
  • ১০ হাজার একর শিল্পভূমি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত
  • চিনিকল, পাটকল, টেক্সটাইল, ইস্পাত কারখানা, প্রকৌশল শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রস্তুত
  • যৌথ উদ্যোগ, ইজারা ও অংশীদারত্বে বিনিয়োগের সুযোগ দেবে সরকার

বছরের পর বছর লোকসান, উৎপাদন বন্ধ কিংবা সীমিত কার্যক্রমে আটকে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও অর্থনীতির মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১০ হাজার একরের বেশি কৌশলগত শিল্পভূমি, বিদ্যমান কারখানা, ইউটিলিটি সুবিধা ও অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে এসব বন্ধ বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পনাটি সফল হলে দীর্ঘদিন অচল থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদ নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রস্তুত করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে চিনিকল, কাগজকল, রাসায়নিক শিল্প, টেক্সটাইল মিল, পাটকল, কাচ কারখানা, সার কারখানা, ইস্পাত কারখানা, প্রকৌশল শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) গতকাল (রোববার) রাষ্ট্রায়ত্ত এসব প্রতিষ্ঠানের নাম, এলাকা ও সম্পদের পরিমাণ উন্মুক্ত করে। এর আগে শনিবার (৪ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী এসব প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রস্তুতের নির্দেশ দেন।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) প্রকাশিত তালিকায় প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—

১) সেতাবগঞ্জ চিনিকল, বোচাগঞ্জ, দিনাজপুর। ২) ঠাকুরগাঁও চিনিকল, বালিয়াডাঙ্গী রোড, ঠাকুরগাঁও। ৩) কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড (কেপিএমএল), চন্দ্রঘোনা, রাঙামাটি। ৩) জিল বাংলা চিনিকল, দেওয়ানগঞ্জ, জামালপুর। ৪) রাজশাহী চিনিকল, হারিয়ান, রাজশাহী। ৫) পঞ্চগড় চিনিকল, পঞ্চগড়। ৬) জয়পুরহাট চিনিকল, জয়পুরহাট। ৭) কুষ্টিয়া চিনিকল, জগতি, কুষ্টিয়া। ৮) মোবারকগঞ্জ চিনিকল, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ। ৯) এএফসিসিএল-এর প্রিমিয়াম ফ্লোট গ্লাস, সোলার গ্লাস ও সোলার প্যানেল প্ল্যান্ট, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ১০) ফরিদপুর চিনিকল, মধুখালী, ফরিদপুর। ১১) জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (জেমকো), নর্থ পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম। ১২) লতিফ বাওয়ানী এবং করিম জুট মিলস ক্লাস্টার, ডেমরা, ঢাকা। ১৩) নাটোর চিনিকল, নাটোর। ১৪) চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স (সিসিসি), বারবকুণ্ড, চট্টগ্রাম। ১৫) শ্যামপুর চিনিকল, বদরগঞ্জ, রংপুর। ১৬) পাবনা চিনিকল, দাশুড়িয়া, পাবনা। ১৭) খুলনা নিউজপ্রিন্ট অ্যান্ড হার্ডবোর্ড মিলস, খালিশপুর, খুলনা। ১৮) রেনউইক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, কুষ্টিয়া। ১৯) আমিন জুট মিলস লিমিটেড, ষোলশহর, চট্টগ্রাম।

২০) প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (পিআইএল), বারবকুণ্ড, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম। ২১) দিনাজপুর টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, দিনাজপুর। ২২) বাংলাদেশ ইনসুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারিওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেড (বিআইএসএফএল), মিরপুর-১, ঢাকা। ২৩) সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, সাতক্ষীরা। ২৪) রাঙামাটি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, ঘাগড়া, রাঙামাটি। ২৫) টাঙ্গাইল কটন মিলস লিমিটেড, মির্জাপুর, টাঙ্গাইল। ২৬) দি এশিয়াটিক কটন মিলস লিমিটেড, ষোলশহর, চট্টগ্রাম। ২৭) চিত্তরঞ্জন কটন মিলস লিমিটেড, গোদনাইল, নারায়ণগঞ্জ। ২৮) খুলনা টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, বয়রা, খুলনা। ২৯) ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএলসিএল), নয়ারহাট, সাভার, ঢাকা। ৩০) কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, নজিরা, কুড়িগ্রাম।

৩১) টিএসপিসিএলের নতুন টিএসপি সার কারখানা, নর্থ পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম। ৩২) কোকিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ৩৩) আমিন টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, ষোলশহর, চট্টগ্রাম। ৩৪) জিপিএফপিএলসির ইউএফ-৮৫ প্ল্যান্ট, পলাশ, নরসিংদী। ৩৫) উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেড (ইউজিএসএফএল), কালুরঘাট, চট্টগ্রাম। ৩৬) অ্যাটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড (এবিএল), টঙ্গী শিল্প এলাকা, গাজীপুর। ৩৭) জিপিএফপিএলসির ইনার লাইনারসহ ডব্লিউপিপি ব্যাগ কারখানা, ঘোড়াশাল-পলাশ। ৩৮) ফার্টিলাইজার পিএলসি প্রাঙ্গণ। ৩৯) নো-ভিউ গেস্ট হাউস, চট্টেশ্বরী, চট্টগ্রাম। ৪০) খুলনা জোন অফিস, চরএরহাট, খুলনা। ৪১) বেঙ্গল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, নওয়াপাড়া, যশোর। ৪২) আফসার কটন মিলস, সাভার, ঢাকা এবং ৪৩) পরিবেশবান্ধব আধুনিক স্টিল মিল, ছয়পুকুরিয়া, বগুড়া।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অধীনে ১০ হাজার একরের বেশি কৌশলগত শিল্পভূমি রয়েছে। ইস্পাত ও প্রকৌশল, রাসায়নিক, চিনি ও খাদ্যশিল্প, টেক্সটাইল এবং পাট খাতের এসব সম্পদে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু বা আধুনিকায়ন, পুনঃউন্নয়ন, ইজারাভিত্তিক পরিচালনা, যৌথ উদ্যোগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

বিডা জানায়, এসব প্রতিষ্ঠানে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসহ প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সুবিধা এবং বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত বা স্বল্প ব্যবহৃত রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদকে পুনরায় উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আওতায় আনার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

তালিকাভুক্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অলাভজনক, বন্ধ অথবা সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য-জানায় বিডা।

বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী ইজারা, যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার), পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর অথবা অন্যান্য উপযুক্ত পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

বিনিয়োগকারীরা কী দেখছেন

বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়া ইতিবাচক উদ্যোগ। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই নিজস্ব জমি, কারখানা ভবন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সড়ক যোগাযোগসহ মৌলিক শিল্প অবকাঠামো রয়েছে। ফলে একেবারে নতুন শিল্প স্থাপনের তুলনায় কম সময় ও তুলনামূলক কম ব্যয়ে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হতে পারে।

তবে তাদের মতে, শুধু সম্পদের তালিকা প্রকাশ করলেই বড় বিনিয়োগ আসবে না। বিনিয়োগকারীরা জানতে চাইবেন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা, জমির মালিকানা, বিদ্যমান দেনা-পাওনা, যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা, পরিবেশগত অনুমোদন এবং সম্ভাব্য আইনি জটিলতার পূর্ণাঙ্গ তথ্য। এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা না থাকলে বড় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাতে পারেন।
উদ্যোক্তারা আরও মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা, স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশ, কর-সুবিধা, দ্রুত অনুমোদন এবং চুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে টেক্সটাইল, প্রকৌশল, রাসায়নিক, কাচ, সার ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে উল্লেখযোগ্য বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব। একই সঙ্গে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক মানের উন্মুক্ত দরপত্র ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে।

কী বলছেন অর্থনীতিবিদরা

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পভূমিকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন এবং দক্ষ বিনিয়োগকারী নির্বাচনের ওপর।

তাদের মতে, সরকার যদি শুধু লোকসানি প্রতিষ্ঠান থেকে দায়মুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে সম্পদ ইজারা বা যৌথ উদ্যোগে দেয়, তাহলে প্রত্যাশিত সুফল মিলবে না। বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্যতা যাচাই, আন্তর্জাতিক মানের দরপত্র, প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ প্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগ-পরবর্তী কার্যক্রমের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের অবস্থান শিল্পাঞ্চল বা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মধ্যে। সেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো আগে থেকেই রয়েছে। ফলে নতুন করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার তুলনায় এসব সম্পদ পুনর্ব্যবহার করলে বিনিয়োগ ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ বেসরকারি খাতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতীতে স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তাই সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিনিয়োগকারী নির্বাচন এবং শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা না গেলে এই উদ্যোগও বিতর্কের মুখে পড়তে পারে।

তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা গেলে এ উদ্যোগ নতুন শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানি সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং সরকারের অলস সম্পদের কার্যকর ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে ৫ বছর মেয়াদি নতুন কর্মপরিকল্পনা

বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেছেন, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশের বাণিজ্য সক্ষমতা ...

বিএফআইইউ প্রধান শেখ হাসিনার পরিবার ও ১০ শিল্প গ্রুপের ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১০ শিল্প গ্রুপের দেশে-বিদেশে থাকা ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ...

পরিবহন-লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী সৌদি আরব

পরিবহন, লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সৌদি আরব। একই ...

ডিজিটাল অর্থনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক জালিয়াতি

প্রতি দুই সাইবার অপরাধের একটিই এখন আর্থিক জালিয়াতি ৫ বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে সাইবারভিত্তিক আর্থিক ...