গিয়াস উদ্দিন, সম্পাদক
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬ ৭:১০ এএম , আপডেট: জুলাই ১৫, ২০২৬ ৯:১৭ এএম
  • প্রতি দুই সাইবার অপরাধের একটিই এখন আর্থিক জালিয়াতি
  • ৫ বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে সাইবারভিত্তিক আর্থিক জালিয়াতি
  • গ্রাহকের অসচেতনতায় হারানো টাকা ফেরতের হার ৫ শতাংশেরও কম
  • এআই, ডিপফেক ও স্ক্রিন-শেয়ারিং অ্যাপে বদলে যাচ্ছে প্রতারণার কৌশল

দেশ যত দ্রুত ক্যাশলেস ও ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে, ততই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক জালিয়াতি। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড, কিউআর (কিউআর) পেমেন্ট ও অনলাইন আর্থিক সেবার বিস্তারের ফলে মানুষের লেনদেন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি সাইবার অপরাধীদের জন্যও তৈরি হয়েছে নতুন সুযোগ। গত পাঁচ বছরে দেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়েছে। একই সময়ে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে সাইবারভিত্তিক আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির ঘটনা। প্রতারকরা এখন শুধু ওটিপি বা পিন নম্বর হাতিয়ে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ভুয়া কাস্টমার কেয়ার, স্ক্রিন-শেয়ারিং অ্যাপ, কিউআর কোড, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং পরিচয় চুরির মতো আধুনিক কৌশল ব্যবহার করে মুহূর্তেই গ্রাহকের হিসাব খালি করে দিচ্ছে। বাণিজ্য প্রতিদিন–এর ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ইউনিট, ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে সংঘটিত সাইবার অপরাধের বড় একটি অংশই আর্থিক প্রতারণাকেন্দ্রিক। প্রতারক চক্রগুলো সংগঠিতভাবে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ই-কমার্স গ্রাহকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণার অর্থ কয়েক মিনিটের মধ্যে একাধিক হিসাব ও ডিজিটাল ওয়ালেট ঘুরিয়ে সরিয়ে ফেলায় তা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের বড় অংশই তাদের অর্থ ফেরত পান না।

ডিজিটাল অর্থনীতির এই অন্ধকার দিক এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক, এমএফএস প্রতিষ্ঠান এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং গ্রাহক সচেতনতা একসঙ্গে নিশ্চিত করা না গেলে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লেনদেনের গ্রাফের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জালিয়াতি

গত ৫ বছরে দেশে ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা এবং এর আর্থিক মূল্য দুটোই জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক ডিজিটাল লেনদেন এখন ১ কোটি কোটি টাকার মাইলফলক স্পর্শ করেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ইউনিটের পরিসংখ্যান বলছে, লেনদেন বৃদ্ধির সাথে সাথে সাইবার জালিয়াতির ঘটনাও দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে সাইবার জালিয়াতি-সংক্রান্ত বার্ষিক অভিযোগের সংখ্যা ছিল সাড়ে আট হাজারের কাছাকাছি, তা বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছর নাগাদ ১৯ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে দেশের মোট সাইবার অপরাধের ৫৫ শতাংশেরও বেশি সরাসরি ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতির সাথে সম্পর্কিত।

পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন, সিআইডি এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন’ (সিসিএএফ)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও অভিযোগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।

৫ বছরের পরিসংখ্যান: লাফিয়ে বাড়ছে আর্থিক জালিয়াতি

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ার সাথে সাথে প্রতারকদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে প্রতিদিন সর্বস্ব হারাচ্ছেন সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী। গত পাঁচ বছরের প্রাক্কলিত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়-

২০২১-২২ অর্থবছর: করোনা-পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল লেনদেনের আকস্মিক উত্থানের এই বছরে দেশে প্রায় ৮ হাজার ৫০০টি সাইবার অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়ে। যার মধ্যে ৩৮ শতাংশ ছিল মোবাইল ব্যাংকিং (এমএফএস) জালিয়াতি ও ফেসবুক আইডি হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আদায়।

২০২২-২৩ অর্থবছর: এই বছর অভিযোগের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১১ হাজার ২০০টিতে। জালিয়াতির নতুন ট্রেন্ড হিসেবে যুক্ত হয় ব্যাংকিং অ্যাপের ক্লোনিং এবং ওটিপি (ওটিপি) জালিয়াতি। মোট অপরাধের ৪২ শতাংশই ছিল সরাসরি আর্থিক ক্ষতি-সংক্রান্ত।

২০২৩-২৪ অর্থবছর: সাইবার অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার ৫০০টিতে। এ বছর অবৈধ অনলাইন জুয়া, বেটিং অ্যাপ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির নামে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা সামনে আসে। আর্থিক জালিয়াতির হার বেড়ে হয় ৪৭ শতাংশ।

২০২৪-২৫ অর্থবছর: এই সময়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়ে যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে কণ্ঠস্বর বা ছবি নকল করে (ডিপফেক) স্বজনদের কাছ থেকে জরুরি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার নতুন প্রবণতা শুরু হয়। আর্থিক অপরাধের হার পৌঁছায় ৫১ শতাংশে।

২০২৫-২৬ অর্থবছর: চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সাইবার সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১৯ হাজার ২০০টি অতিক্রম করেছে। যার মধ্যে ৫৫ শতাংশের বেশি সরাসরি ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতির সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, বর্তমানে সংঘটিত প্রতি দুটি সাইবার অপরাধের একটিই আর্থিক জালিয়াতি।

কারা বেশি আক্রান্ত?

গবেষণায় দেখা গেছে, সাইবার জালিয়াতির শিকার হওয়া মানুষের মধ্যে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৪৫ শতাংশ)। তারা মূলত অনলাইন কেনাকাটা, চাকরি ও গ্যাম্বলিং স্ক্যামের শিকার হন। তবে প্রযুক্তিতে কিছুটা পিছিয়ে থাকায় এবং আর্থিক সক্ষমতা বেশি হওয়ার কারণে বড় অঙ্কের অর্থ খোয়াচ্ছেন ৪০ ঊর্ধ্ব কর্মজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। জালিয়াতির শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি পুরুষ এবং ৪০ শতাংশ নারী।

প্রতারণার শীর্ষ মাধ্যম: এমএফএস বনাম কার্ড ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং

তদন্তকারী সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দেশের সাধারণ ও প্রান্তিক গ্রাহকেরা সবচেয়ে বেশি প্রতারণার শিকার হচ্ছেন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।

শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে,বিকাশ, নগদ, রকেট। দেশের প্রায় ৪ কোটিরও বেশি মানুষ নিয়মিত এমএফএস ব্যবহার করেন। এই মাধ্যমের গ্রাহকদের একটি বড় অংশ প্রযুক্তিগতভাবে ততটা সচেতন নন। ফলে লোভ বা ভয় দেখিয়ে তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া প্রতারকদের জন্য সবচেয়ে সহজ।

এর পর রয়েছে ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। ক্লোনিং এবং ভুয়া ই-কমার্স সাইটে কার্ডের তথ্য (সিভিভি নম্বর) ইনপুট দেওয়ার মাধ্যমে গ্রাহকেরা এখানে প্রতারিত হচ্ছেন। এর বাহিরেও ইন্টারনেট ব্যাংকিং। অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত ও সচেতন শ্রেণী এই মাধ্যমটি ব্যবহার করায় এখানে জালিয়াতির সংখ্যা কম হলেও, ম্যালওয়্যার বা ভুয়া অ্যাপের মাধ্যমে বড় অংকের কর্পোরেট ও ব্যক্তিগত তহবিল চুরির ঘটনা এখানেই সবচেয়ে বেশি ঘটে।

প্রতারকদের নিত্যনতুন ও ভয়ংকর কৌশল

প্রথাগত পিন বা পাসওয়ার্ড চুরির বাইরে গিয়ে অপরাধীরা এখন প্রযুক্তি এবং মনস্তত্ত্বকে মিলিয়ে অত্যন্ত জটিল সব কৌশল ব্যবহার করছে। অন্যদিকে ভুয়া কাস্টমার কেয়ার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতারকেরা নিজেদের ব্যাংক বা এমএফএসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে নিখুঁতভাবে কথা বলে। তারা গ্রাহকের মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলে (ভয় দেখানো যে অ্যাকাউন্ট ব্লক হবে, বা লোভ দেখানো যে বোনাস এসেছে) এবং গ্রাহককে নিজের অজান্তেই তথ্য দিতে বাধ্য করে।

একই সাথে জালিয়াতির প্রধান হাতিয়ার হলো ওটিপি। বিভিন্ন নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করে গ্রাহকের ফোনে যাওয়া ওটিপি কোডটি মুখে শুনে নেয় প্রতারকেরা। বর্তমান সময়ের অন্যতম বিপজ্জনক কৌশল হলো স্ক্রিন-শেয়ারিং অ্যাপের ফাঁদ। কারিগরি সহায়তার নাম করে গ্রাহককে ফোনে এনি ডেস্ক বা টাইম ভিউয়ার এর মতো স্ক্রিন-শেয়ারিং অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হয়। গ্রাহক অ্যাপটি চালু করলেই প্রতারকেরা দূর থেকে তার পুরো ফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং ব্যাংক অ্যাপের পাসওয়ার্ড দেখে ফেলে। অন্যদিকে আকর্ষণীয় অফার বা বিল পেমেন্টের নামে ভুয়া কিউআর কোড ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি স্ক্যান করলেই গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয় বা ফোনে ম্যালওয়্যার ঢুকে পড়ে।

টাকা ফেরত পাওয়ার বাস্তব চিত্র এবং ব্যাংক-এমএফএসের দায়বদ্ধতা

ডিজিটাল জালিয়াতির শিকার হওয়া একজন সাধারণ গ্রাহক তার খোয়ানো টাকা ফেরত পাবেন কি না তা এখনো একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন। দেশের প্রচলিত নিয়মে গ্রাহক যদি নিজের ভুল বা অসচেতনতার কারণে (যেমন: নিজেই ওটিপি বা পিন দিয়ে দিলে) টাকা হারান, তবে ব্যাংক বা এমএফএস কর্তৃপক্ষ সেই টাকা ফেরত দিতে আইনত বাধ্য নয়। তবে যদি ব্যাংকিং সিস্টেমের কোনো ত্রুটি বা নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে হ্যাকাররা টাকা নিয়ে যায়, তার সম্পূর্ণ দায় ব্যাংকের ওপর বর্তায়। বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রতারণাই গ্রাহকের অসচেতনতাকে পুঁজি করে হয় বলে টাকা ফেরতের হার ৫ শতাংশেরও কম। অপরাধীরা টাকা তুলেই তা দ্রুত অন্য অ্যাকাউন্টে বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে ফেলায় ব্যাংকগুলোর পক্ষেও তা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

নিয়ন্ত্রক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়: কতটুকু কার্যকর?

ডিজিটাল অপরাধ দমনে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), সাইবার পুলিশ এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এই সমন্বয় এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক হয়ে ওঠেনি।

কোনো গ্রাহক প্রতারিত হওয়ার পর যখন ব্যাংকে জানান, ব্যাংক তখন বিএফআইইউ এবং সিআইডিকে অবহিত করে। এরপর বিটিআরসির মাধ্যমে ভুয়া সিমটি ট্র্যাক করা হয়। এই দীর্ঘ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাঝের সময়টুকুর সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা টাকা ক্যাশ-আউট করে কেটে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চার সংস্থার মধ্যে একটি ‘অটোমেটেড ওয়ান-স্টপ রিয়েল-টাইম ডেটাবেজ’ না থাকায় অপরাধ ঘটার সাথে সাথে তাৎক্ষণিকভাবে সব অ্যাকাউন্ট ও সিম ব্লক করা সম্ভব হচ্ছে না, যা সমন্বয়ের কার্যকারিতাকে ধীর করে দিচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই): প্রতারণা প্রতিরোধে নতুন আলো

ভবিষ্যতের ডিজিটাল আর্থিক খাতকে নিরাপদ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ই হতে পারে প্রধান হাতিয়ার। এআই দিয়ে জালিয়াতি ঠেকানো সম্ভব। এআই মাধ্যমের অন্যতম হলো- অ্যানোমালি ডিটেকশন। এআই অ্যালগরিদম একজন গ্রাহকের নিয়মিত লেনদেনের ধরন (বিহেভিওরাল প্যাটার্ন) পর্যবেক্ষণ করে। যদি কোনো গ্রাহক হঠাৎ মাঝরাতে তার সাধারণ সীমার বাইরে বড় কোনো লেনদেন করতে যান, তবে এআই একে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেনদেনটি সাময়িক আটকে দেবে এবং গ্রাহককে যাচাই করবে।

অন্যদিকে ভয়েস বায়োমেট্রিক ও ডিপফেক সনাক্তকরণের মাধ্যমেও এটি করা যায়। যদি কাস্টমার কেয়ারে কথা বলার সময় কলারের কণ্ঠ আসল নাকি এআই দিয়ে ক্লোন করা, তা মুহূর্তের মধ্যে এআই প্রযুক্তি ধরে ফেলতে পারে।

এদিকে রিয়েল-টাইম ফ্রড স্কোরিং এর মাধ্যমেও প্রতারকদের ধরা সম্ভব। যেকোনো নতুন অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরের সময় ওই অ্যাকাউন্টের অতীত ট্র্যাকিং হিস্ট্রি বিশ্লেষণ করে এআই সেকেন্ডের মধ্যে একটি ‘রিস্ক স্কোর’ তৈরি করতে পারে, যা জালিয়াতি চক্রের এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা ঘোরানোর প্রক্রিয়া রুখে দেবে।

সাইবার নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতারণার কৌশলও বদলে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রযুক্তিগত দুর্বলতার চেয়ে অপরাধীরা মানুষের অসচেতনতা ও মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বেশি প্রতারণা করছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৌশল ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছ থেকে গোপন তথ্য হাতিয়ে নিয়ে আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এসব অপরাধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সাইবার অপরাধ দমনে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে সাইবার জালিয়াতি প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি সতর্কতা অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের ভাষ্য, কোনো ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনোই ফোনে গ্রাহকের পিন, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি জানতে চায় না। তাই এসব গোপন তথ্য কোনো অবস্থাতেই অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়।

এ ছাড়া অপরিচিত নম্বর থেকে পাঠানো আকর্ষণীয় অফার, লটারি বা পুরস্কারের লিংকে ক্লিক না করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত কারও নামে অর্থ সহায়তার অনুরোধ এলে সরাসরি ফোন করে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এবং প্রতারণার শিকার হলে বিলম্ব না করে নিকটস্থ থানা, সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার বা সরকারের জাতীয় সাইবার হেল্পডেস্ক (১৬১২১)-এ অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতিকে নিরাপদ ও টেকসই রাখতে প্রযুক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্র, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং গ্রাহকদের সম্মিলিত সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

সংশ্লিষ্টদের মতামত

বিকাশের হেড অব কর্পোরেট কমিউনিকেশনস শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, প্রতারক চক্র বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে গ্রাহকদের কথার ফাঁদে ফেলে, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার চেষ্টা করে। তাই গ্রাহকদের সবসময় সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো পরিস্থিতিতেই লোভ, ভয়ভীতি বা প্রলোভনের ফাঁদে পা দেওয়া উচিত নয় এবং ওটিপি বা পিন কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।

তিনি জানান, গ্রাহক সচেতনতা বাড়াতে বিকাশ সারা বছর টেলিভিশন, পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান পরিচালনা করে। পাশাপাশি, প্রতারণা প্রতিরোধে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে সন্দেহজনক লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করে। এ ছাড়া প্রতারণার অভিযোগ তদন্তে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয় করে থাকে বিকাশ।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) ও চিফ রিস্ক অফিসার ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদার বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলো সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। ফলে শুধু সিস্টেম হ্যাক করে আর্থিক ক্ষতি করা এখন আগের তুলনায় অনেক কঠিন। তবে প্রতারক চক্র এখন প্রযুক্তিগত দুর্বলতার চেয়ে গ্রাহকদের অসচেতনতা ও সামাজিক প্রকৌশল (সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) কৌশল কাজে লাগিয়ে প্রতারণা করছে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে গ্রাহক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরীর মতে, প্রযুক্তির বিস্তার যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি অপরাধীদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে সাইবার প্রতারণা শুধু প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে নয়, বরং মানুষের অসচেতনতা ও ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতিকে কাজে লাগিয়েই বেশি ঘটছে। তাই এই ঝুঁকি মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সাইবার সচেতনতা, নিরাপদ ডিজিটাল আচরণ এবং আর্থিক লেনদেনে সতর্কতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

ডিজিটাল মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতারণার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, আমরা প্রতিদিন যে কাজ করি তার একটা অংশ হল এসব প্রতারণা ঠেকানোর কাজ। প্রতিদিন আমাদের কাছে অভিযোগ আসছে। আমরা এসব চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিচ্ছি। তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে। বিএফআইইউ এটা নিয়ে নিয়মিত কাজ করছে। শত শত অ্যাকাউন্ট বন্ধ করেছি।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ যাতে নিরাপদে ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে লেনদেন করতে পারে সেইজন্য আমরা কাজ করছি। যখন অভিযোগ আসছে তখনই ব্যবস্থা নিচ্ছি। অ্যাকাউন্ট বন্ধ করছি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ খাতে তদারকি আরও জোরদার করছে। আমাদের পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন বিভাগ খাতটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিয়মিত নমুনাভিত্তিক পরিদর্শন পরিচালনা করছে।

তিনি বলেন, এমএফএস অপারেটররা যদি প্রতারণার ঘটনা কমাতে না পারে, তাহলে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ এতে তাদের সুনাম ও গ্রাহকের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে।

আরিফ হোসেন খান জানান, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)-সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আর্থিক অপরাধ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, কিন্তু কিছু অপরাধী এখনও সক্রিয় রয়েছে। তবে ডিজিটাল লেনদেনের সামগ্রিক পরিমাণের তুলনায় প্রতারণার ঘটনা এখনও তুলনামূলকভাবে কম।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

ডেস্কটপে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম বিভ্রাট, ভোগান্তিতে ব্যবহারকারীরা

বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে সাময়িক বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে মেটার মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ...

খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকের পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও ‘এক্সিট’ সুবিধা

ব্যাংকের পর এবার আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও (ফাইন্যান্স কোম্পানি) খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ...

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দিলেন আবেদুর রহমান

নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আবেদুর রহমান ...