বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২৬ ১১:২৬ এএম

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) নবীন শিক্ষার্থীদের ‘পরিচয় পর্ব’ ও ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। পরিচয়পর্বের নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা, বারবার পরিচয় দিতে বাধ্য করা, অশালীন ভাষায় গালিগালাজ, জোর করে নাচানো, ময়লা পানি মুখে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, গভীর রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাসে বসিয়ে রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে উঠে ছবি ও ভিডিও ধারণের নির্দেশ দেওয়া সহ নানা অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি ২০২৫-২৬ বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, আইন, আল-ফিকহ অ্যান্ড ল, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, পলিটিক্যাল সায়েন্স, ফার্মেসি ও পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অধিকাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক চাপের কারণে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চাননি। বেশিরভাগই বিভাগের সভাপতির হস্তক্ষেপে সমাধান করে দেয়। এদিকে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রায় ১৬ জন শিক্ষার্থী লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছেন।

‘ম্যানার শেখানোর’ নামে আটকে রাখা

ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওরিয়েন্টেশনের দুই দিন পর থেকেই ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি শুরু হয়। প্রথম ধাপে ক্লাস শেষে ছেলে-মেয়ে সবাইকে কক্ষে বসিয়ে রাখা হতো। পরিচয় দিতে সামান্য ভুল হলেই গালিগালাজ ও অপমান করা হতো। কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে ৭০ থেকে ৮০ বার পর্যন্ত পরিচয় দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

দ্বিতীয় ধাপে প্রতিদিন বিকেল ৫টার মধ্যে সবাইকে ফুটবল মাঠে উপস্থিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্লাস প্রতিনিধিকে (সিআর)। কেউ অনুপস্থিত থাকলে সিআরকে জবাবদিহি করতে হতো। এভাবে প্রায় ১০-১২ দিন চাপ প্রয়োগ করায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে জানান। তৃতীয় ধাপে রাতেও নবীনদের ডাকা হতো। কখনো রাত সাড়ে ৮টা থেকে ১২টা, আবার কখনো রাত ১টা বা দেড়টা পর্যন্ত তাদের বসিয়ে রাখার অভিযোগ রয়েছে।

ল্যাম্পপোস্ট গণনা, হলের সামনে সেলফি

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে রাতের বেলায় জিয়া মোড়ে ডেকে কয়েকজনকে বিভিন্ন ‘শাস্তি’ দেওয়া হয়। দুজনকে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ১০ মিনিটের মধ্যে লাইব্রেরির সামনে গিয়ে ছবি তুলে আসতে বলা হয়। আরও দুজনকে ডায়না চত্বরে গিয়ে ২০ মিনিটের মধ্যে ল্যাম্পপোস্ট গুনে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভুল হওয়ায় তাদের পুনরায় সেখানে পাঠানো হয়। ক্লাস প্রতিনিধিকে মেয়েদের হলের নাম ভুল বলার কারণে প্রতিটি মেয়েদের হলের সামনে গিয়ে সেলফি তুলে আনতে বলা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।পরে ক্লাস প্রতিনিধি ও আরেক শিক্ষার্থীকে জোর করে নাচানো হয়। রাত দেড়টার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।সিনিয়রদের ডাকে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ১৭ জন শিক্ষার্থী টানা দুই দিন ক্লাসে অনুপস্থিত ছিলেন বলে জানান ভুক্তভোগীরা। পরে তাদের মীর মুগ্ধ সরোবরে ডেকে অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাওয়া হয়।

ময়লা পানি, অশ্লীল ভিডিও ও হুমকির অভিযোগ

কুষ্টিয়া শহরে অবস্থানরত নবীন শিক্ষার্থীদেরও ডেকে ‘ম্যানার শেখানোর’ অভিযোগ রয়েছে। এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তাকে পুকুরের ময়লা পানি মুখে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। একই সময় আরেক শিক্ষার্থীকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে ১০ ধরনের হাসি দিতে বলা হয়। তারা একাধিকবার অস্বীকৃতি জানালেও শেষ পর্যন্ত বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। এছাড়া অশ্লীল বাক্য বলে ভিডিও ধারণ এবং সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপে প্রকাশ করতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী শ্রীরামপুরে নিয়ে ছেলে-মেয়ে উভয় শিক্ষার্থীকে আটকে রেখে ‘ম্যানার শেখানো’ ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি, এক নারী শিক্ষার্থীকে এক সিনিয়রের সঙ্গে দেখা করতে বলা হলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। পরে তাকে, ‘সিনিয়ররা ডাকলে দেখা করো না, কথা শোনো না, পরে রেপ হলে কী করবা’—এমন হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

এল আগে ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে বিরোধের পর কয়েকজন নবীনকে ক্লাসে দাঁড় করিয়ে গালিগালাজ ও অপমানের অভিযোগ উঠেছে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী কান্নায় ভেঙে পড়েন বলে জানা গেছে।

আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এক নবীন ছাত্রীকে বারবার পরিচয় দিতে বাধ্য করা ও ভুল হলে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ রয়েছে। পরে বিষয়টি আপসের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়। একই বর্ষের আরও তিন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এক নবীনকে ধূমপানে বাধ্য করা এবং রাত ১টা পর্যন্ত আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের ফোন করে চা খেতে ডাকার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ওরিয়েন্টেশনের পর থেকেই ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে সিনিয়ররা ক্লাসে এসে পরিচয় নিতেন। ভুল হলে গালিগালাজ, রাতে ডেকে নেওয়া এবং মোবাইল ফোন পরীক্ষা করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, পলিটিক্যাল সায়েন্স, আইন ও ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থীরাও ফরমাল পরিচয়পর্বের নামে হয়রানি ও অপমানের অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগ প্রত্যাহারে চাপ:

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিষয়গুলো নিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার আগে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে সহপাঠী জিসানকে দিয়ে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, যাতে সিনিয়রদের নাম উল্লেখ না করা হয়। অভিযোগ না করলে ভবিষ্যতে আর এমন ঘটনা হবে না—এমন আশ্বাসও দেওয়া হয় বলে দাবি তাদের।

অভিযুক্তদের দাবি— তারা একা থাকে না; একই ব্যাচের অনেকেই বিভিন্নভাবে যুক্ত থাকে। নবীনদের বিভিন্ন স্থাপনার নাম জিজ্ঞাসা করা, ভুল হলে সেখানে পাঠানো, ল্যাম্পপোস্ট গণনা করানো, একাধিকবার পরিচয় নেওয়া এবং ভুল হলে কঠোর ভাষায় বকাঝকা করার কথা স্বীকার করেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিচয় করানোটাই মূল লক্ষ্য তাদের।

প্রশাসনের বক্তব্য

ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। বিভাগের সব শিক্ষক মিলে তদন্ত করে একটি রিপোর্ট প্রস্তুতি করেছি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, র‍্যাগিংয়ের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং তারা তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবেন। প্রতিটি বিভাগে একজন শিক্ষককে র‍্যাগিংয়ের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ট্যুরিজম বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদন প্রশাসনের হাতে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে সভা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ছাত্রত্ব বাতিল পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। নবীনদের ‘পরিচয় শেখানোর’ নামে যেকোনো কার্যক্রম বন্ধ করা হবে। এত প্রচারণা পরেও সংশ্লিষ্টতা পেলে ছাড় দিবে না প্রশাসন।

ছাত্র উপদেষ্টা ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ না এলেও কোনো ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ম্যানার’ বা ফরমাল পরিচয় শেখানোর কোনো নিয়ম নেই।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, যেকোনো র‍্যাগিং ইস্যুতে জিরো টলারেন্স। লিখিত অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও ডিনদের কাছে নোটিশ পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রক্টরকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এনজে

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাকৃবিতে চার হলের সংঘর্ষ-ভাঙচুরের ঘটনায় ৪২ শিক্ষার্থীকে শোকজ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) চারটি আবাসিক হলকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক সংঘর্ষ, হামলা, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ভাঙচুরের ...

মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত রাবির ইফাদ বাঁচতে চান

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ ইফাদ প্রাণঘাতী ...

বাকৃবিতে শুরু হচ্ছে বিএসভিইআরের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন

ভেটেরিনারি শিক্ষা ও গবেষণার অর্জিত জ্ঞান মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ...

জবির লোক প্রশাসন বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) লোক প্রশাসন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এপিএ)’ ...

জবি শিক্ষার্থীদের জন্য জকসুর অ্যাম্বুলেন্স উপহার

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে একটি অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর করেছে ...