বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ৩০, ২০২৬ ৩:৫৪ পিএম , আপডেট: জুলাই ৩০, ২০২৬ ৬:৫৩ পিএম

ইসতিয়াক মাহিম:

পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশ, তীব্র আবাসন সংকট, সংকুচিত ক্যাম্পাস আর সীমিত অবকাঠামো থেকে মুক্তি পেতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৫ সালের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা সংকটে ভুগতে থাকা জবি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছিল। সে ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আবাসিক হলের দাবিতে মাসব্যাপী আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তখনই সরকার কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া এলাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের সিদ্ধান্ত জানায়। বলা হয়েছিল, এটি হবে রাজধানীর অন্যতম আধুনিক ও পরিকল্পিত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে নির্মাণের কথা ছিল একাধিক অ্যাকাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক হল, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, ক্যাফেটেরিয়া, খেলার মাঠ, চিকিৎসা কেন্দ্র, সুইমিংপুল, লেকসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস। এ লক্ষ্যে তেঘরিয়ার পশ্চিমদি মৌজায় প্রায় ২০০ একর ভূমি অধিগ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়।

২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর ভূমি মন্ত্রণালয় জমির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। এরপর একই বছরের ৯ অক্টোবর একনেকে ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন: ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রায় এক হাজার ৯২০ কোটি ৯৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকার এই প্রকল্প ২০২০ সালের অক্টোবরের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে নতুন ক্যাম্পাসের নকশাও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হয়। একই বছর প্রায় ৯০০ কোটি টাকার চেক পায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরে ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি মোট ২০০ একরের মধ্যে ১৮৮ দশমিক ৬০ একর জমি বুঝে পায় বিশ্ববিদ্যালয়। পরবর্তীতে অবশিষ্ট ১১ দশমিক ৪০ একর জমিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কিন্তু কাগজে-কলমে এত অগ্রগতি হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আট বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির দৃশ্যমান অগ্রগতি অত্যন্ত সীমিত। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্প ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন, অভিযোগ ও অনিশ্চয়তা। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে গত দেড় বছরে দীর্ঘ আন্দোলন, মানববন্ধন, অনশন ও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের মুখে প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও বড় ধরনের দৃশ্যমান কাজ শুরু হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে না দিতে নানা ষড়যন্ত্র চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। নেপথ্যে রয়েছে এই বিশাল টাকার প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি। এমনকি প্রথম ধাপের কাজও সেনাবাহিনীর কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এদিকে বেদখল হল উদ্ধার আন্দোলনের নাম করে মূল প্রকল্পকে চাপা দেওয়া, বিকল্প আবাসিক পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া এবং প্রশাসনের সভা-সমন্বয়ের নাম করে আড়ালে প্রকৃত তথ্য গোপন করারও একাধিক অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

আন্দোলনের মুখে সেনাবাহিনীর হাতে কাজ, কিন্তু মাঠে নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি

নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পের ধীরগতির প্রতিবাদে গত কয়েক বছরে কয়েক দফায় আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন, অবস্থান কর্মসূচি, অনশন কর্মসূচির মাধ্যমে তারা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছিল। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, প্রকল্প অনুমোদনের পর বছরের পর বছর কেটে গেলেও বাস্তব অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো নয়। পরে গত বছরের মে মাসে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা ঘেরাও কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলন আরও তীব্র হলে সরকার প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। তবে সেই আশার প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলছে, এক বছর আগেই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তর হলেও ডিপিপি অনুমোদনে অসহযোগিতার মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ আটকে রাখা হচ্ছে। এর ফলে এক বছর পার হয়ে গেলেও এখনও সেনাবাহিনী কাজই শুরু করতে পারেনি। এমনকি ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে চলমান বিভিন্ন কাজে অনিয়মের অভিযোগ তুলে কাজ বন্ধ করে রাখায় এক বছর ধরে মূলত কাজই বন্ধই হয়ে আছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফাইল প্রসেসিং, অনুমোদন, সমন্বয় এসব কারণ দেখানো হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে ডিপিপি অনুমোদনের কোনো আগ্রহই দেখা যায়নি।বাস্তবে কাজের গতি প্রত্যাশার অনেক নিচে। ডিপিপি অনুমোদনে দেরী হওয়ায় সেনাবাহিনীও কাজ শুরু করতে পারছেনা।

দ্বিতীয় ধাপ সেনাবাহিনীর হাতে না দিতে নানা চেষ্টা, প্রথম ধাপ সরিয়ে নিতেও নানা চাপ

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্প ঘিরে সবচেয়ে বড় সংঘাত এখন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ পুরোপুরি সেনাবাহিনীর হাতে গেলে বড় অঙ্কের নির্মাণকাজ, সরবরাহ ব্যবস্থা ও সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হারাবে একটি প্রভাবশালী মহল। এতে আর্থিক ভাগবাটোয়ারার সুযোগ হারানোর শঙ্কায় এমন ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালোয়ের এক অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার কাজ হবে। এখানে টেন্ডার, সরবরাহ, সাব-কন্ট্রাক্ট সবকিছুতেই বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। তাই অনেকেই চায় না পুরো প্রকল্প সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে যাক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক একটি সূত্র দাবি করেছে, শুধু দ্বিতীয় ধাপ নয়, প্রথম ধাপের কাজও সেনাবাহিনীর কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার নীরব চেষ্টা চলছে। ওই সূত্রের দাবি, শুরু থেকেই কিছু মহল সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততায় অস্বস্তিতে ছিল। এখন তারা আবার আগের প্রভাববলয় ফিরিয়ে আনতে চায়। তবে সেনাবাহিনীও সহজে দায়িত্ব ছাড়তে আগ্রহী নয়। এমনকি এ নিয়ে চাপ প্রয়োগ করায়, সেনাবাহিনী কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে প্রথম ধাপের কাজ শেষ করা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বেদখল হল উদ্ধারের আন্দোলনের আড়ালে মূল প্রকল্প চাপা দেওয়ার অভিযোগ

সম্প্রতি পুরান ঢাকায় বিভিন্ন বেদখল হল উদ্ধারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে সক্রিয় দেখা গেছে। শাখা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ঘটা করে হল উদ্ধারের ঘোষণা দিয়ে বেদখল হওয়া কয়েকটি হলে ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে সংবাদ সম্মেলন করে হল উদ্ধারের জন্য ১০ দিনের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। ১০ এপ্রিল সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে কাগজপত্র উদ্ধার করার দাবি জানানো হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সকল ক্রীয়াশীল সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা করেন উপাচার্য। সেখানে নানামুখী আশার বাণী শোনান তিনি। সবাইকে সাথে নিয়ে হল উদ্ধার করার শ্বাস দেন। কিন্তু এই ঘটনার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি নেই।

তবে সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, এসব আন্দোলনকে সামনে এনে মূলত নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পের ধীরগতির প্রশ্ন আড়াল করা হচ্ছে। কোনো ইস্যু নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে প্রশ্ন উঠলেই মূলত এমন নাটকীয়তা মঞ্চস্থ করে সেসব ইস্যুকে আড়াল করা হচ্ছে। সবাইকে সাথে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মতবিনিময় সভা করায় অন্যান্য ছাত্রসসংগঠনের নেতারাও মূলত এসব ইস্যুতে আর কোনো কর্মসূচি দিতে পারছেন না। এতে খুব সহজেই সবাইকে ম্যানেজ করে ধামাচাপা দেওয়া সহজ হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, হল সংকট অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ২০০ একরের পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ক্যাম্পাস বাস্তবায়নই হচ্ছে স্থায়ী সমাধান। সেটি নিয়ে চাপ কমাতে অন্য ইস্যু সামনে আনা হচ্ছে। হল উদ্ধারের নাম করে মূলত ২০০ একরের ক্যাম্পাসের বিষয়টি আড়াল করা হচ্ছে। এজন্য ছাত্রদলকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

নিজস্ব ৭ একর জায়গায় বিকল্প হল পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন জেলাখানার সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রায় ৭ একর জায়গায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য দুইটি আবাসিক হল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা ভাবছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত বছরের মে মাসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে পাওয়া বিশেষ বৃত্তির টাকার একটি অংশ যা অস্থায়ী হল নির্মাণের জন্য বরাদ্দ ছিল, তা দিয়েই হল একটি নির্মাণের কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি পুরান ঢাকায় বানী ভবনে একটি হল নির্মাণাধীন আছে। তবে দীর্ঘদিন থেকেই এই কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। বংশালে হাবিবুর রহমান হলের কাজ চললেও সেখানেও অগ্রগতি নেই।

তবে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের অভিযোগ, এসব পরিকল্পনা সামনে এনে ২০০ একরের মূল প্রকল্পের ধীরগতির বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রশাসনের মধ্যে ২০০ একরের ক্যাম্পাসের কাজকে গুরুত্ব না দিয়ে এসব ইস্যুকে সামনে এনে শিক্ষার্থীদের একটা বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।

২০০ একরের ক্যাম্পাস থাকতে পারে শুধু খেলার মাঠ আর পিকনিক স্পট হয়ে!

এদিকে, অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরু না হলে কেরানীগঞ্জের বিশাল জায়গাটি শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র খেলার মাঠ বা পিকনিক স্পট হিসেবেই পরিচিত হয়ে থাকবে। এদিকে, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, বর্তমান প্রশাসন যেভাবে ভাবছে, এমন ভাবে এগোলে নতুন ক্যাম্পাসের কাজে তেমন কোনো অগ্রগতি আসবেনা। শেষ পর্যন্ত সেটাকে শুধু খেলার মাঠ আর পিকনিক স্পট হিসেবেই ব্যবহার করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত, এই প্রকল্পে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, বছরের পর বছর শুধু ডিপিপি সংশোধন, মাস্টারপ্ল্যান সংশোধন করেই যাওয়া হচ্ছে। বিগতে কয়েক বছরে চারজন উপাচার্য এসেছেন, চারজনই মাস্টারপ্ল্যান সংশোধন করে কালক্ষেপণ করেছেন। অথচ এই মাস্টারপ্ল্যান কয়েক বছর আগেই হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এসব আটকে থাকায় কাজ এগোচ্ছেনা।

নতুন ক্যাম্পাস নিয়ে ভয় ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ

নতুন ক্যাম্পাস ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে শাখা ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সময় বলা হচ্ছে, নতুন ক্যাম্পাস পুরোপুরি চালু হলে পুরান ঢাকার বর্তমান ক্যাম্পাস ছেড়ে দিতে হবে। বিশেষ করে শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন বক্তব্যে এসব কথা বেশি ফুটে উঠছে। বিভিন্ন মহলেও তারা এসব কথা বলছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ডিন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ক্যাম্পাস থাকে। কিন্তু এখানে এমনভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে যেন নতুন ক্যাম্পাস মানেই পুরান ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে যাওয়া। আমাদের এই ক্যাম্পাসও থাকবে। নতুন ক্যাম্পাসও থাকবে। এটাকে হারানোর কথা বলে নতুন ক্যাম্পাসের কাজ আটকে রাখা ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা আর বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। এভাবে শিক্ষার্থীদের ভাগ্য নিয়ে ছেলেখেলা করা হচ্ছে।

একাধিক শিক্ষার্থী মনে করছেন, পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই এই ভয় তৈরি করা হচ্ছে।

নানা অভিযোগ সামনে আসলেই সভা করে ম্যানেজ করার চেষ্টার অভিযোগ

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা সমালোচনা। অভিযোগ উঠেছে, কোনো ইস্যু নিয়ে অভিযোগ উঠলেই ক্রিয়াশীল সংগঠনের নেতা, ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মী এবং সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে মতামত নিয়ে নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তেমন কোনো কাজ হয়না। বরং আন্দোলন এবং চাপ থামাতেই এই কৌশলে সবার মুখ বন্ধ রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, ছাত্রসংগঠন, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ও প্রশাসনকে নিয়ে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে যাতে সবাই মনে করে কাজ হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে প্রকল্পের রোডম্যাপ এখনো অস্পষ্ট। মূলত চাপ কমাতে আগেই এই কৌশলে মুখ বন্ধ করা হয়। যাতে নতুন ক্যাম্পাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনকে চাপ না দিতে পারে।

নজড়কাড়া ইশতেহার দিয়ে নির্বাচিত হলেও নতুন ক্যাম্পাস নিয়ে নীরব জকসু

এদিকে, নজরকাড়া ইশতেহার, বড় বড় প্রতিশ্রুতি আর নতুন ক্যাম্পাস বাস্তবায়নের অঙ্গীকার দিয়ে নির্বাচিত হলেও নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পের ধীরগতি, ডিপিপি জটিলতা, সেনাবাহিনীর হাতে কাজ হস্তান্তরের পরও দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব কিংবা প্রকল্প ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারছেনা শিবির অধ্যুষিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু)। নির্বাচনের আগে ২০০ একরের পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ক্যাম্পাসকে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন হিসেবে তুলে ধরে তা বাস্তবায়নে মুখরোচক সব প্রতুশ্রুতি দেওয়া হলেও বর্তমানে সেই ইস্যুতে জকসুর নীরবতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি, প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করা কিংবা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বিত আন্দোলনের বদলে জকসু এখন অনেকটাই নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বলছেন, ভোটের সময় যে ইস্যু ছিল সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি, নির্বাচনের পর সেটিই যেন সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়ে পড়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জকসুর ভিপি মোঃ রিয়াজুল ইসলাম বলেন, জকসুর কাজ মূলত প্রশাসনের সাথে কথা বলে সমস্যার সমাধান করা। দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের উপচার্যের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয় ধাপের কাজ সবুজ খাতায় উঠেছে, তবে বিল পাশ না হওয়ায় বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা ভিসি স্যারের সাথে এসব নিয়ে যোগাযোগ রাখছি। গত রবিবারেও দেখা করে কথা বলেছি।

কোনো চাপে পড়ে তারা নিরব হয়ে গেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে জকসুর ভিপি বলেন, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।

এদিকে, নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পে আগে থেকেই কাজ করা ঠিকাদারদের বিল তুলে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের বর্তমান শীর্ষ নেতাসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের কাজ না করেই একের পর এক বিল তুলে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শাখা ছাত্রদলের কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, বর্তমান শীর্ষ দুই নেতা এসব ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কমিশন বাগিয়ে নেওয়ার বিনিময়ে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিল তুলে দিচ্ছেন। এতে কোনো কাজ না করেই তারা বিল তুলে নিচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের সাবেক এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জবির নতুন ক্যাম্পাসের কাজ ঠিকভাবে হোক এটা অনেকেই চায়না। সবাই নিজেদের ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া আর ভাগ বাটোয়া নিয়ে ব্যস্ত আছে। নতুন ক্যাম্পাসের বিগত দিনের অনিয়মের তদন্ত চলছে। ফ্যাসিস্ট আমলের ঠিকাদাররা কাজ না করেই বিল তুলে নিয়েছে। এখনও কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা তাদের কাজের বিল তুলে দিতে কমিশন নিচ্ছে ভাগবাটোয়ারা করে। এখানে প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই জড়িত। আমি শুনেছি, অনিয়মের তদন্তের আগে যাতে সেসব ঠিকাদারকে বিল না দেওয়া হয় এজন্য ভিসি স্যারকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন কল দিয়েছিলেন। কিন্তু ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে তিনি আরো বিলে স্বাক্ষর করে গেছেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে সংশ্লিষ্ট এক ঠিকাদারকে বারবার কল দেওয়া হলেও তিনি ভয়ে এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হোন নি।

এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আমিরুল ইসলাম এর সাথে বক্তব্য নিতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেখা করার জন্য সময় দেন। পরে তার সাথে দেখা করতে গেলেও তাকে তার দপ্তরে পাওয়া যায়নি। এরপর বারবার তার সাথে যোগযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

অভিযোগের বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহদী হাসান হিমেল বলেন, বর্তমানে যারা সেকেন্ড ক্যাম্পাসে কাজ করে বা কোন ঠিকাদারের সাথে কোনো যোগাযোগ নাই। এ ধরণের সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। সেকেন্ড ক্যাম্পাসের কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করবে প্রশাসনেও সাথে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলও তাদের যথাযথ সহায়তা করবে। আমরা চাই দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হোক। প্রথম ধাপের কাজ সেনাবাহিনী সম্পন্ন করছে আর দ্বিতীয় ধাপের কাজ কারা করবে সেটা ইউজিসি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অথবা মন্ত্রণালয় ঠিক করবে। এ বিষয়ে আমাদের দায় দেয়া বোধগম্য নয়।

তিনি আরও বলেন, হল উদ্ধারের জন্য প্রশাসনকে আমরা জানিয়েছি। তারা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস নিয়ে কাজ শুরু করেছে। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী ও সকল ক্রিয়াশীল সংগঠনকে নিয়ে হল উদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ সেনাবাহিনীই করছে। তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আমরা সহযোগিতা করতে চাইলেও তারা তেমনভাবে কাজ এগিয়ে নিচ্ছেনা। যতোটুকু শুনেছি তাদের ঠিকাদার নিয়ে সমস্যা চলছে। আমরা গিয়ে ঠিকাদার পাইনা। আর প্রথম ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর কাছ থেকে নিয়ে নিবে এমন কোনো অফিশিয়াল কথা আমি আমার জানা নেই। তবে দ্বিতীয় ধাপের কাজ যেহেতু এখনও শুরু হয়নি। তাই সেটা কাকে দিবে এটা নিয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছেনা। এটা বিশ্ববিদ্যালয় যা সিদ্ধান্ত নিবে সেভাবেই হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন বলেন, “কিছুক্ষণ আগেই বিশ্ববিদ্যালয়, ইউজিসি, সেনাবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্প নিয়ে একটি সমন্বয় সভা শেষ হয়েছে। প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আশা করি ভালো কিছু হবে।”

সেনাবাহিনীর কাছ থেকে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্পের কাজ সরিয়ে নিতে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং সিদ্ধান্তও হয়নি। এটি সরকারের একটি প্রকল্প এবং এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, বিশ্ববিদ্যালয় ও সেনাবাহিনীর সমন্বিত সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছুই হবে না। প্রকল্প সরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। বর্তমান প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। আগে চলমান কাজ সম্পন্ন হবে, এরপর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

টিআর

শেয়ার

পাঠকের মতামত

একটি সাক্ষরের ভুলে ভেঙে গেল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছ ভর্তি কার্যক্রমের শূন্য আসনে প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তির আওতায় ...

ডিবেটিং এডুকেশন সোসাইটির নতুন সভাপতি হেলাল উদ্দিন, সম্পাদক মহিউদ্দিন

দেশব্যাপী বিতর্কচর্চা, নেতৃত্বের বিকাশ এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করা সংগঠন ডিবেটিং এডুকেশন সোসাইটি ইন ...

বাকৃবিতে স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় নবীনবরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার ...

পাবিপ্রবিতে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচিতে প্রশাসনের বাধা, প্রতিবাদে বিক্ষোভ

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি) ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচী পালন করতে দেয়নি প্রশাসন। এর প্রতিবাদে ...

জুলাই আন্দোলন ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণ: জাহিদুল ইসলাম

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ...

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে যবিপ্রবির ছাত্রী হলে প্রকাশ হবে দেয়াল পত্রিকা

‘জুলাই গণগঅভ্যুত্থান দিবস’ পালন উপলক্ষে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ...

রাকসু ভবনে পুলিশ রেইড দিলে অস্ত্রের কারখানা পাওয়া যাবে: ছাত্রদল নেতা হিমেল

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবির হাসান হিমেল বলেছেন, রাকসু ভবনের ভিপি ...

ছাত্রলীগকে ডিফেন্ড করা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারী রাকসু ভিপির

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেছেন হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেছেন, ...