বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: আগস্ট ৯, ২০২৬ ৯:৩৪ পিএম
  • ৪২টি খেলাপি ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত
  • গোপন সম্পদ উদ্ধারে বিশ্বখ্যাত ৮টি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি
  • প্রাথমিকভাবে ১২ দেশে নজর

বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে এমন সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ৪২টি খেলাপি ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে। এসব ঋণগ্রহীতা প্রত্যেকের অনাদায়ী বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১ প্রতিষ্ঠানের পর এসব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে তাদের গোপন সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে। এজন্য বিশ্বখ্যাত ৮টি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-বিএফআইইউ ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশে থাকা এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ খুঁজে বের করা এবং সেগুলো জব্দ, বাজেয়াপ্ত ও বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আটটি আন্তর্জাতিক আইন ও আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি ও পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার ও ক্রল, ইওয়াই ও ডেন্টনস, রহমান রাভেলি ও ইন্টারপাথ, বিসিজি ও এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘নো উইন, নো পে’ ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কাজ শুরুর আগে তাদের কোনো ফি বা পরিচালন ব্যয় দেওয়া হবে না। বরং সফলভাবে শনাক্ত, উদ্ধার ও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্পদের মূল্যের পূর্বনির্ধারিত একটি শতাংশ তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হবে।
ব্যাংকিং খাতে সম্পদের মান দ্রুত অবনতির মধ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর মূলধন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

প্রথম ধাপে ১১ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে প্রথম ধাপে সরকার গঠিত যৌথ তদন্ত দলের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কাস্টমসের গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি) এবং আয়কর বিভাগের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) কাজ করছে।

দ্বিতীয় ধাপে ৪২ বড় খেলাপি

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্বিতীয় ধাপে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে— এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা সম্পদ খুঁজে বের করতে আটটি বিদেশি আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এসব সম্পদ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রে ছড়িয়ে রয়েছে।

সম্পদের অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের অধীনে আইনি ব্যবস্থা নেবে। এর মাধ্যমে ওই সম্পদ স্থগিত বা জব্দ করার আদেশ পাওয়ার চেষ্টা করা হবে।

পরবর্তী সময়ে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা বিক্রি করে নগদায়ন করা হতে পারে। এরপর উদ্ধার হওয়া অর্থ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর, সম্পদ কেনা কিংবা বাংলাদেশের বাইরে বাড়ি, জমি ও অন্যান্য সম্পদ অর্জনের মতো ঘটনায় দেশীয়ভাবে সম্পদ উদ্ধারের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠাই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা নেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য।

তবে এই সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে। কারণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সম্পদ উদ্ধারের বিধিবিধান মেনে এগোতে হবে।

‘নো উইন, নো পে’ ব্যবস্থার আরেকটি উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকগুলোর তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কমানো। কারণ, সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ সফল না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো পারিশ্রমিক দিতে হবে না।

এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কর্তৃপক্ষ এখন শুধু দেশের প্রচলিত অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে ঋণ আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ থাকা সম্পদ সরাসরি সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

বর্তমানে কর্তৃপক্ষ বিদেশে থাকা সম্পদের সঠিক মূল্য, মালিকানা ও অবস্থান নির্ধারণের কাজ করছে। এরপর এসব সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্ত, বিক্রি করে নগদায়ন এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আজ সাংবাদিকদের বলেন, ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া কিছু ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। আবার কোনো কোনো ঋণগ্রহীতার মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও দেশে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এ ধরনের ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মুখপাত্র বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। যেসব দেশে অর্থ বা সম্পদ পাচার হয়ে থাকতে পারে, সেসব দেশের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো সম্পদ উদ্ধার করা গেলে চুক্তি অনুযায়ী উদ্ধার করা অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হবে।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

এস আলম ও সাবেক রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ায় সাসপেন্ড ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা

বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এস আলম ও ...

এবার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী বুঝে পেল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক

আর্থিক সংকট মোকাবিলায় একীভূত হওয়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় নতুন আরেকটি ...

চট্টগ্রাম বন্দরে তৃতীয় প্রান্তিকে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে নেতিবাচক প্রবণতা

জানুয়ারি–মার্চে পণ্য হ্যান্ডলিং কমেছে ০.৬৭%* রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং কমেছে ৮.৫৪% আমদানি পণ্য হ্যান্ডলিং কমেছে ০.১৭% ...

বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় পদক্ষেপ বিদেশে ঘুরতে ডলারের ঝামেলা শেষ, টাকায় মিলবে ভ্রমণ প্যাকেজ

বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ কিনতে এখন আর সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে ভাবতে হবে না বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের। ...