এস আলম ও সাবেক রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ায়

সাসপেন্ড ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২৬ ১১:১০ পিএম , আপডেট: আগস্ট ১১, ২০২৬ ১১:২৬ পিএম

বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এস আলম ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনসহ ৩৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেছিলেন ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী। অভিযোগ দাখিলের পর ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াসিন আলীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে।

ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার ইয়াসিন আলীকে সাসপেন্ড করে ব্যাংকের ট্রেনিং একাডেমিতে পাঠানো হয়েছে। সাসপেনশনকালীন সময়ে তিনি মূল বেতনের অর্ধেক পাবেন। হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়া দুদকে অভিযোগ দাখিল করায় তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

তবে ইয়াসিন আলীর দাবি, তিনি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ীই দুদকে অভিযোগটি দাখিল করেছেন। তাকে কেন সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং সাসপেনশনের শর্ত কী—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ইসলামী ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে আসে। একই সঙ্গে ব্যাংকের চেয়ারম্যানও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন বলেন, অভিযোগকারী কর্মকর্তা হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়াই দুদকে অভিযোগ করেছেন। এ কারণে ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ তাকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করেছে। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন এবং একটি কোম্পানির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে মামলা করা যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে যথাযথ তথ্য-উপাত্ত থাকতে হবে।

জহির হোসেন আরও বলেন, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তিনি বিষয়টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জানিয়েছেন। তবে ইয়াসিন আলীর চাকরিচ্যুতির বিষয়ে তার কোনো ভূমিকা নেই; বিষয়টি ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ দেখেছে।

৫০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ

এর আগে গত ২৯ জুন ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী দুদকে অভিযোগটি দাখিল করেন।

অভিযোগে বলা হয়, পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া এবং তা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকটি আর্থিক সংকটে পড়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড মূলত একটি রুগ্ণ ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল। প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগসীমা ছিল ১০০ কোটি টাকা। পরে প্রভাব খাটিয়ে ধাপে ধাপে এই সীমা প্রথমে ২০০ কোটি এবং পরবর্তী সময়ে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পর্যাপ্ত জামানত ও নিশ্চয়তা ছাড়াই এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই না করে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে হেড অফিসে ঋণ প্রস্তাব পাঠানো হয়। এসব ঋণ ২০১৭ সালের ২০ জুন থেকে ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত এক্সিকিউটিভ বোর্ডের সভায় অনুমোদন করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, ঋণ পরিশোধের জন্য ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একাধিকবার তাগাদাপত্র ও চূড়ান্ত তাগাদাপত্র পাঠানো হলেও ঋণ পরিশোধ করা হয়নি।

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

অভিযোগে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড এবং প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস ওরফে আলহাজ মো. ইউনুস বাদলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড, এবিএম শামসুল হাসান, সালেহা শাহিন, উম্মে সালমা শারমিনসহ প্রতিষ্ঠানটির একাধিক পরিচালককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল আলম (মাসুদ) ওরফে এস আলমের নামও রয়েছে। তাকে ঋণসুবিধার সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের সাবেক একাধিক পরিচালক, নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং কয়েকজন কর্মকর্তার নামও অভিযোগপত্রে রয়েছে।

অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭(এ), ৩৪ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(১)(২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪ ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।

‘আদালতের নির্দেশনায় তথ্য দেওয়া হয়েছে’

ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী বলেন, এস আলমের ঋণ অনিয়মের ঘটনায় ব্যাংকের একাধিক মামলা রয়েছে। আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি মামলার তথ্য সরবরাহের জন্য দুদককে ঋণ অনিয়মের তথ্য দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাননি। কমিশন গঠন না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগ নিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। কমিশন গঠনের পর অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।

শেয়ার

পাঠকের মতামত

এবার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী বুঝে পেল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক

আর্থিক সংকট মোকাবিলায় একীভূত হওয়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় নতুন আরেকটি ...

চট্টগ্রাম বন্দরে তৃতীয় প্রান্তিকে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে নেতিবাচক প্রবণতা

জানুয়ারি–মার্চে পণ্য হ্যান্ডলিং কমেছে ০.৬৭%* রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং কমেছে ৮.৫৪% আমদানি পণ্য হ্যান্ডলিং কমেছে ০.১৭% ...

আমির খসরুর নেতৃত্বে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি বিষয়ক জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি

দেশে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিকাশ ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়ে ‘ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি বিষয়ক জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি’ ...

৪২ ঋণখেলাপির পাচারের অর্থ ফেরাতে ৮ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি

৪২টি খেলাপি ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত গোপন সম্পদ উদ্ধারে বিশ্বখ্যাত ৮টি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক ...