নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২৬ ৩:০৪ পিএম , আপডেট: আগস্ট ১১, ২০২৬ ৩:০৬ পিএম

নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও বহুমাত্রিক করার লক্ষ্যে ওয়েলিংটনে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সদর দপ্তরে উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৈঠকে আঞ্চলিক কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)-এ বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভ, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত তিন বছর সময় এবং দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে নিউজিল্যান্ডের সক্রিয় সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ।

নিউজিল্যান্ডের ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের ডিভিশনাল ম্যানেজার সারা মেম্যান্ড ও ইউনিট ম্যানেজার জোনাস হোল্যান্ড বৈঠকে দেশটির পক্ষে নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান নেতৃত্ব দেন। প্রতিনিধিদলে মন্ত্রণালয়ের ফরেন ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) উইংয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ওয়েলিংটনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর ইশতিয়াক আহমেদ ছিলেন।

বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ সরকারের ও বাণিজ্যমন্ত্রীর শুভেচ্ছা নিউজিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নিউজিল্যান্ডের সক্রিয় ভূমিকার প্রশংসা করে দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়।

আরসিইপিতে সদস্যপদে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন

বৈঠকে গুরুত্ব পায় আরসিইপিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের বিষয়টি। বাংলাদেশ জানায়, সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলীর বিস্তারিত জবাব ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আরসিইপির উচ্চমানের বাণিজ্যিক শৃঙ্খলার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন খাতের নীতিমালা ও কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এসব সংস্কারের মধ্যে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও লজিস্টিকস খাত আরও উন্মুক্ত করা এবং প্রতিযোগিতা, পেটেন্ট, কপিরাইট ও ডেটা সুরক্ষায় আধুনিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ রয়েছে।

আরসিইপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিউজিল্যান্ডের নীতিগত প্রভাবের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ দেশটির সক্রিয় সমর্থন কামনা করে। পাশাপাশি সংবেদনশীল পণ্য ও শিল্প খাত সুরক্ষায় আসিয়ানভুক্ত এলডিসি সদস্যদের মতো ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি পর্যায়ক্রমিক শুল্ক নমনীয়তার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।

এলডিসি উত্তরণে বাড়তি সময় চায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও বৈঠকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়সীমার পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণকাল বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে করা আবেদনের পক্ষে বাংলাদেশের বাস্তবতা তুলে ধরে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চাওয়া হয়।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি উন্নয়নশীল এবং উত্তরণপ্রক্রিয়ায় থাকা অর্থনীতিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের চলমান আর্থ-সামাজিক রূপান্তর, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীলকরণ এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশ জানায়, এলডিসি উত্তরণ অনির্দিষ্টকালের জন্য বিলম্বিত করার কোনো অভিপ্রায় নেই। বরং অতিরিক্ত সময়কে টেকসই ও সুসংগঠিত জাতীয় প্রস্তুতি বাস্তবায়নের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতির জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।

এফটিএতে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১৪তম মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলন (এমসি-১৪)-এর প্রাক্কালে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের আলোচনার ধারাবাহিকতায় এফটিএ আলোচনার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায় বাংলাদেশ।

প্রস্তাবিত এফটিএ বাস্তবায়িত হলে নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের ভোক্তা বাজারে দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ধাতব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিউজিল্যান্ডের বাজারে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি এফটিএ দুই দেশের বাণিজ্যকে নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

তিন দফা প্রস্তাব

বৈঠকের শেষ পর্যায়ে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরও গতিশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে বাংলাদেশ তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়।

প্রথমত, আরসিইপি ও এলডিসি-পরবর্তী বাজার সুবিধা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য একটি বার্ষিক ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

দ্বিতীয়ত, এফটিএ আলোচনার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দুই দেশের সমন্বয়ে একটি ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

তৃতীয়ত, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময়ের আবেদনের প্রতি সমর্থন নিশ্চিত করতে নিউইয়র্কে দুই দেশের স্থায়ী মিশনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আশা প্রকাশ করে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ, বাজার সম্প্রসারণ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা পাবে।

বৈঠকে উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ ও উচ্চপর্যায়ের নীতি-সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল শিগগিরই নিউজিল্যান্ডের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানায়। নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে।

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত