জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২৬ ২:২৭ পিএম

ভোরের আলো ফুটতেই সিরাজগঞ্জের খাল-বিল ও নদী-নালার পাড়ে শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। বাঁশের ভেলায় বাঁধা পাটের আঁশ ছাড়ানো আর ধোয়ার শাঁ শাঁ শব্দ। রোদের তাপে শুকানো সোনালি আঁশের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে পথঘাট। হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার সেই চেনা রূপ আবার ফিরে এসেছে সিরাজগঞ্জের মাঠে মাঠে। দীর্ঘদিন পর পাটের বাম্পার ফলন আর বাজারে চড়া দাম পাওয়ায় চাষিদের মুখে এখন প্রশান্তির হাসি।

মাঠ থেকে হাট, কিংবা হাট থেকে পাটকল-সব জায়গাতেই এখন ব্যস্ততার আমেজ। জেলার স্থানীয় বাজারগুলো ছাড়াও পোড়াবাড়ী, সমোসপুর, সোহাগপুর, নলকা ও বল্লামপুর হাটে কেনাবেচার ধুম পড়েছে।

স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও হাট ঘুরে জানা যায়, মানভেদে মেস্তা পাট বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৪,৬০০ থেকে ৪,৯০০ টাকায়। অন্যদিকে তোষা ও সাদা পাটের দাম মিলছে ৩,৭০৩ থেকে ৩,৯০০ টাকা। সংগৃহীত পাট সরাসরি চলে যাচ্ছে দেশের বড় বড় পাটকলে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের পোড়াবাড়ী এলাকার পাট ব্যবসায়ী শাহ আলম জানান, ভালো পাটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাজারে মেস্তা বা তোষা যাই আসুক, দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তাই কেনার তাগিদও বেশি।

অবশ্য সব জাতের গল্পটা এক নয়। ব্যবসায়ী মো. সানোয়ার খন্দকার ও আনোয়ার খন্দকার জানান, নামলা বা ইরিকাটার চেয়ে চৈতা বাইন বা আগ্গুর জাতের পাটের ফলন ও মান দুটোই ভালো হয়েছে। ফলে দামও বেশি পাচ্ছেন কৃষকরা।

একসময় খরচ না ওঠা এবং কৃত্রিম তন্তুর আগ্রাসনে অনেক চাষিই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তবে সেই অনাগ্রহের মেঘ কাটতে শুরু করেছে।সদর উপজেলার দুখিয়া বাড়ি গ্রামের আরমান

শোনালেন ঘুরে দাঁড়ানোর কথা দাম না পেয়ে একসময় তো আবাদ বন্ধই করে দিয়েছিলাম। কৃষি অফিসের কথায় সাহস করে এবার আবার বুনেছিলাম। প্রতিটি গাছ ১২ থেকে ১৪ ফুট লম্বা হয়েছে! বিঘায় পেয়েছি ১৫ মণ করে। খরচ বাদ দিয়ে যা থাকছে, তাতে আমরা খুবই খুশি।

সিরাজগঞ্জের মোট আবাদ ১৪,৬১০ হেক্টর জমি (তোষা, মেস্তা, বারি-১, সবুজ সোনা ইত্যাদি) আবাদ হয়েছে। গড় ফলন বিঘাপ্রতি ১০–১২ মণ (উৎকৃষ্ট ক্ষেত্রে ১৫ মণ পর্যন্ত)। উৎপাদন খরচ বিঘাপ্রতি ১২,০০০–১৪,০০০ টাকা। বর্তমান বাজারদর: প্রতি মণ ৩,৭০০–৪,৯০০ টাকা।

পাট কেবল কৃষকের ভাগ্যই ফেরায়নি, গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনেও এনেছে স্বস্তি। পাট কাটা, জাগ দেওয়া, ধোয়া, শুকানো থেকে শুরু করে বহন ও বাছাই প্রতিটি ধাপে তৈরি হয়েছে নতুন কাজের সুযোগ। পুরুষদের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরাও পাট ও পাটখড়ি শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় পাট নিয়ে নতুন স্বপ্ন বুনছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যাগ, কার্পেট, জিও-টেক্সটাইল কিংবা নানা ফ্যাশনসামগ্রীর কাঁচামাল হিসেবে পাটের সম্ভাবনা এখন আকাশচুম্বী।

সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মাওলা বলেন, নিয়মিত পরামর্শ ও আধুনিক চাষাবাদের কারণেই এবার সুফল এসেছে। খরচ কম কিন্তু ভালো দাম থাকায় কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। এ ধারা বজায় রাখতে সার্বিক কৃষি সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

উৎপাদনের এই গতি, ন্যায্য দাম আর সরকারি-বেসরকারি সহায়তা যদি অব্যাহত থাকে, তবে সিরাজগঞ্জের বুক চিরে সোনালি আঁশের ঐতিহ্য আবার তার আগের জৌলুশে ফিরবেই।

এনজে

শেয়ার

পাঠকের মতামত

কুড়িগ্রামে ফ্রেন্ডশিপের সেমিনার দুর্গম চরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সেবা নিশ্চিতের তাগিদ

নদী-নালা, খাল-বিল আর দুর্গম চরাঞ্চল পেরিয়ে নাগরিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া কুড়িগ্রামে এখনো বড় ...

সোনাহাট সেতু চালু না হওয়ায় সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব, দুর্ভোগে লক্ষাধিক মানুষ

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দরের পাশে নির্মিত নতুন সড়ক সেতুর মূল কাজ শেষ হলেও শুধুমাত্র ...