
দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি গত পাঁচ অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ, সেখান থেকে সাড়ে চার বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ০৩ শতাংশে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ স্থবিরতা, শিল্প খাতের মন্থর গতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে টানা কমছে দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়ানো সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে অর্থনীতিতে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে সরকারের উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করা নাও হতে পারে।
যে অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকে, সেখানে প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
এছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ভোগ ব্যয়ও কমছে। আর ভোগ ব্যয় কমে গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি—দুই খাতেই বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দেয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ০৩ শতাংশে। প্রবৃদ্ধির হার কমলেও বেড়েছে অর্থনীতির সামগ্রিক আকার। চলতি মূল্যে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ১৭৬ বিলিয়ন টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৯০১ বিলিয়ন টাকা।
খাতভিত্তিক হিসাবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে হয়েছে ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
ধারাবাহিকভাবে কমছে প্রবৃদ্ধি
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর মধ্যে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৪২ শতাংশ, শিল্প খাতে ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ ছিল। এ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার।
এর আগের (২০২৩-২৪) অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। তখন কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, শিল্প খাতে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ। এ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৩৮ ডলার। গত অর্থবছরের তুলনায় মাথাপিছু আয় কমেছে ১১ মার্কিন ডলার।
২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৪৯ ডলার।
আর ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বশেষ পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বাংলাদেশ। সে সময় মাথাপিছু জিডিপি ছিল ২ হাজার ৭৯৩ ডলার।
কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তী ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশে পৌঁছায়। ওই বছর মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৫৯১ ডলার।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন
দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে ধীরগতির চিত্র দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহেও বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, ডিসেম্বরে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে আসে। ধারাবাহিকভাবে ঋণপ্রবাহ কমে মার্চে এসে তা আরও তলানিতে পৌঁছেছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে অর্থনীতিতে যেসব কার্যক্রম সক্রিয় থাকা প্রয়োজন, বর্তমানে সেসবের বড় অংশই অনুপস্থিত। সামনের দিনে যদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা না যায়, তাহলে প্রবৃদ্ধি আরও কমবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহেও নেতিবাচক ধারা
অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহেও নেতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে দেশে নিট এফডিআই এসেছে ১০০ কোটি ৬০ লাখ (১ দশমিক ০৬ বিলিয়ন) ডলার। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এফডিআই ছিল ১৩১ কোটি ৬০ লাখ (১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন) ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। একই সঙ্গে দেশীয় বিনিয়োগেও গতি না থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে।
তিন বছরে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা
দেশের তৈরি পোশাক খাতেও মন্দা অবস্থা বিরাজমান। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হালনাগান প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৮২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট এক বিবৃতিতে বলেন, গত এক দশকে দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ। এর মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৮৭ লাখ মানুষের জন্য। ফলে এখনো প্রায় ৫৩ লাখ তরুণ বেকার রয়েছেন। এসব বেকারের প্রায় অর্ধেকই চাকরি পাননি তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৬০ হাজার। দেশে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে। এর মধ্যে শিক্ষিত যুবকদের বেকারত্বের হার প্রায় ৮৭ শতাংশ। বেকার শিক্ষিতদের বড় অংশই অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি।
তবে সরকারের প্রকাশিত বেকারত্বের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, সরকারি হিসাবের বাইরে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৯৬ লাখ ৪০ হাজার ছদ্মবেকার যুবক-যুবতী রয়েছেন। গত দশ বছর ধরে ছদ্মবেকারের সংখ্যা প্রায় ১ কোটির কাছাকাছি রয়েছে।
সরকারি সংজ্ঞা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৬০ হাজার। তবে অর্থনীতিবিদদের দাবি, এই হিসাবের সঙ্গে ছদ্মবেকারদের যুক্ত করলে দেশে বেকারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সোয়া ১ কোটি।
বিবৃতিতে জোহানেস জাট বলেছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বাড়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে থাকা মৌলিক প্রতিবন্ধকতাগুলো দ্রুত দূর করতে হবে। এজন্য দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
অর্থনৈতিক মন্দা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে অর্থনীতিবিদ মো. মাজেদুল হক বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেরও তাগিদ দেন।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ব্যাংক খাতকে সংকটমুক্ত করা। ব্যাংক খাত সংকটে থাকলে অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসে না। এই খাতকে স্থিতিশীল করা গেলে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে এবং মানুষের জীবনমানও উন্নত হবে।
আগামী বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সামনের বাজেট জিডিপি-কেন্দ্রিক না হয়ে সাধারণ মানুষকে টিকিয়ে রাখার বাজেট হতে হবে। শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে লক্ষ্য করলেই প্রবৃদ্ধি বাড়বে না। বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আগামী এক থেকে দুই বছর প্রবৃদ্ধির ধীরগতি অব্যাহত থাকতে পারে। স্বল্প সময়ে এটি পুনরুদ্ধার করা সহজ নয়।
এএ
- ১সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত মুজিবুরের পরিবারকে সরকারি সহায়তা
- ২বাকৃবিতে দুগ্ধ ও গরুর মাংস উৎপাদন ব্যবস্থা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কর্মশালা শুরু
- ৩মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের দফায় দফায় হামলা
- ৪রাজধানীতে গ্যাস লিকেজ থেকে আগুনে ৩ জন দগ্ধ
- ৫চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ৩ জনের প্রাণহানি
- ৬সূচকের উত্থানে চলছে লেনদেন
- ৭বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম
- ৮সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্সের বোর্ড সভা ২৩ জুলাই
- ৯সিটি ব্যাংকের বোর্ড সভা ২৬ জুলাই
- ১০আরএকে সিরামিকসের বোর্ড সভা ২৬ জুলাই
- ১রণক্ষেত্র দিল্লি: ভারতের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় আন্দোলনের’ ডাক সিজেপির
- ২গ্রাহকদের জন্য নিজস্ব ওএমএস চালু করছে মর্ডান সিকিউরিটিজ
- ৩মতিগঞ্জে টর্নেডোয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে আর্থিক অনুদান প্রদান
- ৪সাতক্ষীরায় বিলে মৎস্য ঘের থেকে গাড়িচালকের মরদেহ উদ্ধার
- ৫চাঁদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ছাড়া খাবার তৈরি করায় জরিমানা
- ৬সারাদেশে ফ্যামিলি কার্ড সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
- ৭যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে তারেক রহমানের অভিনন্দন
- ৮জোট শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী
- ৯৯৯৯-এ ফোনে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ১০ শিক্ষার্থী উদ্ধার
- ১০ঝুঁকিতে চাঁদপুর মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প





পাঠকের মতামত