
মাত্র ২৪ বছর বয়সেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে শামীম হাসানকে। বাবার রেখে যাওয়া ঋণ, সংসারের খরচ এবং পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঋণ নিয়ে শুরু করেছিলেন চিংড়ি চাষ। কিন্তু শুরুতেই ধাক্কা খেতে হয়েছে তাকে। প্রথমে ঘেরে ছাড়া বাগদা চিংড়ির পোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে গলদা চিংড়ি চাষের পরিকল্পনা করলেও এবার দেখা দিয়েছে রেণুর তীব্র সংকট।
এপ্রিল, মে ও জুন এই তিন মাস গলদা রেণু ছাড়ার উপযুক্ত সময়। কিন্তু মৌসুম প্রায় শেষ হতে চললেও ঘেরে রেণু ছাড়তে পারেননি তিনি। কয়েকবার আড়তে গিয়েও খালি হাতে ফিরে এসেছেন। ফলে বছরজুড়ে লোকসানের আশঙ্কা আর ঋণের বোঝা নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার।
মঙ্গলবার সকালে বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া গ্রামের ঘেরপাড়ে বসে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন শামীম হাসান।
তিনি বলেন, আমার নিজের কোনো জমি নেই। ৪০ হাজার টাকা দিয়ে জমি বন্ধক নিয়েছি। ঘের প্রস্তুত করতে আরও ২০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। সব টাকা ঋণ করে জোগাড় করেছি। এখন সময়মতো রেণু না পেলে পুরো বছরটাই ক্ষতির মধ্যে যাবে। ঋণের টাকা শোধ করব নাকি সংসার চালাব—সেটাই বুঝতে পারছি না।
শুধু শামীম নন, দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার চিংড়িচাষি বর্তমানে একই সমস্যার মুখোমুখি। চাহিদা অনুযায়ী গলদা রেণু না পাওয়ায় অনেক ঘের এখনও খালি পড়ে আছে। আবার যারা কিছু রেণু পেয়েছেন, তাদেরও চাহিদার তুলনায় অনেক কম রেণু দিয়ে চাষ শুরু করতে হয়েছে।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বাগেরহাট জেলায় বর্তমানে ৫৪ হাজার ৮৪৮টি মৎস্য ঘের রয়েছে। এসব ঘেরে বছরে প্রায় ৯৮ কোটি ৬০ লাখ গলদা রেণুর প্রয়োজন হয়। অথচ বর্তমানে মাত্র চারটি হ্যাচারিতে রেণু উৎপাদন হচ্ছে, যা মোট চাহিদার মাত্র ৮ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। ফলে বিশাল চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে।
ফকিরহাট উপজেলার মৌভূক এলাকার চাষি দীপক চৌধুরী বলেন, গত বছর প্রতি হাজার রেণু ১৫শ থেকে ১৭শ টাকায় কিনেছি। এবার সেই রেণুর দাম বেড়ে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকায় পৌঁছেছে। এত বেশি দাম দিয়েও পর্যাপ্ত রেণু পাওয়া যাচ্ছে না। আমার ১০ বিঘা ঘেরে যেখানে কয়েক হাজার রেণু আরও দরকার, সেখানে মাত্র ৪ হাজার রেণু ছাড়তে পেরেছি। এভাবে চললে লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হবে।
একই ধরনের অভিযোগ করেন চিংড়িচাষি আহাদ শেখ। তিনি বলেন, আমার ৪০ বিঘা ঘের রয়েছে। সেখানে অন্তত দেড় লাখ রেণু দরকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৭ হাজার রেণু ছাড়তে পেরেছি। টাকা থাকলেও রেণু পাওয়া যাচ্ছে না। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবিকা চিংড়ি চাষের ওপর নির্ভরশীল। রেণু না পেলে ঘের চালিয়ে লাভ কী?
তিনি আরও বলেন, নদী থেকে রেণু আহরণ বন্ধ করার আগে সরকারকে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত ছিল। এখন হ্যাচারির উৎপাদন খুবই কম। আবার অনেক সময় মান নিয়েও অভিযোগ থাকে। ফলে চাষিরা চরম সংকটে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে চিংড়ি শিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা ও পিরোজপুর অঞ্চলের লাখো মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাতের সঙ্গে জড়িত। ঘের মালিক, শ্রমিক, রেণু ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, মাছের খাদ্য বিক্রেতা, বরফ কারখানা, আড়তদারসহ অসংখ্য মানুষের জীবিকা নির্ভর করে চিংড়ি শিল্পের ওপর।
ফকিরহাটের রেণু ব্যবসায়ী সালাম শেখ বলেন, আমাদের এলাকায় ৬০টির মতো রেণুর আড়ত রয়েছে। প্রতিদিন শত শত চাষি রেণু কিনতে আসছেন। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নেই। হ্যাচারি থেকে যে রেণু পাওয়া যায় তা মোট চাহিদার ৮ থেকে ১০ শতাংশের বেশি নয়। আগে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভোলা ও পটুয়াখালীর নদী-সমুদ্র থেকে আহরিত রেণু এবং ভারতীয় রেণুর মাধ্যমে চাহিদার বড় অংশ পূরণ হতো। এখন সেসব উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে।
স্থানীয় চাষিরা জানান, গলদা চিংড়ির রেণু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘেরে ছাড়া না গেলে উৎপাদন কমে যায়। মৌসুমের শেষে রেণু ছাড়লে চিংড়ি কাঙ্ক্ষিত আকারে বড় হতে পারে না। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারমূল্যও কমে যায়। ফলে বছর শেষে চাষিদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়।
চিংড়ি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু চাষিরাই নয়, পুরো চিংড়ি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর প্রভাব রপ্তানি আয়, স্থানীয় অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের ওপরও পড়তে পারে।
এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রাজ কুমার বিশ্বাস বলেন, সরকার নদী থেকে রেণু আহরণ ও বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ করেছে। তাই আমরা নিয়মিত নজরদারি করছি। অবৈধভাবে বিদেশ থেকে রেণু আসলে নতুন রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে, যা চিংড়ি শিল্পের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, চাষিদের চাহিদা বিবেচনায় খুলনা অঞ্চলে নতুন কয়েকটি হ্যাচারি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব হ্যাচারি পূর্ণ উৎপাদনে গেলে রেণুর সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা করছি।
তবে মাঠপর্যায়ের চাষিদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বর্তমান সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। হ্যাচারির উৎপাদন বৃদ্ধি, মানসম্পন্ন রেণু সরবরাহ নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা এবং চিংড়ি খাতের জন্য পৃথক সহায়তা কর্মসূচি চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
একদিকে বাগদা চিংড়িতে ভাইরাসের আক্রমণ, অন্যদিকে গলদা রেণুর তীব্র সংকট দ্বিমুখী এই সংকটে দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার চিংড়িচাষি এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই কার্যকর সমাধান না এলে চলতি বছর চিংড়ি উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
টিআর
- ১গাজীপুরে আবাসিক হোটেল থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার
- ২ফিলিপাইন ব্ল্যাক আখ চাষে ১০ লাখ আয়ের স্বপ্ন
- ৩রোগ শনাক্তে ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে স্বাস্থ্যকর্মীরা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
- ৪আকস্মিক বন্যায় কৃষকের স্বপ্ন মূহুর্তেই তছনছ
- ৫নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধানকে র্যাঙ্ক ব্যাজ পরালেন প্রধানমন্ত্রী
- ৬ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিংয়ের বোর্ড সভা ২৯ জুলাই
- ৭আজ মেগাসিটি ঢাকার বায়ু মাঝারিমানের
- ৮ব্র্যাক ব্যাংকের বোর্ড সভা ২৮ জুলাই
- ৯লাফার্জ হোলসিমের বোর্ড সভা ২৯ জুলাই
- ১০মেরিকোর বোর্ড সভা ২৯ জুলাই
- ১লোকসানী শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর এক মাসে বেড়েছে ৬৮ শতাংশ
- ২‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতেই চলবে বৈদেশিক সম্পর্ক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- ৩পারিবারিক বিরোধের জেরে তায়েবাকে হত্যার অভিযোগ, ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
- ৪কানাডা থেকে ৪০ হাজার টন এমওপি সার কিনবে সরকার
- ৫একনেক সভায় ১৪ হাজার ৪১ কোটি টাকার ৮ প্রকল্প অনুমোদন
- ৬মানিকগঞ্জে বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান
- ৭অনলাইনে রিটার্ন দাখিল ৪৭ লাখ
- ৮টেকসই অর্থায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ
- ৯এমপি গাজী নজরুলকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার
- ১০শ্রীপুরে জলাবদ্ধতা নিরসনে নিজ অর্থায়নে স্থানীয়দের ড্রেন নির্মাণ





পাঠকের মতামত