

দ্রব্যমূল্যের দাম কমাতে ও দেশীয় শিল্প বিকাশে সরকার কিছু পণ্যে শুল্কছাড় দিয়ে থাকে। উচ্চ রাজস্ব ঘাটতি হলেও সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে গত অর্থবছরে করছাড়ের পরিমাণ ৫৪ হাজার কোটি টাকা ছিল। এত উচ্চ হারে করছাড় দেওয়ার পরও দ্রব্য মূল্যের দাম কমেনি, উল্টো বেড়েছে। কর আদায় বাড়ানোর বদলে বেশি মনযোগ করছাড়ে। অথচ করছাড়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ও এনবিআর চেয়ারম্যান। শুল্ক অব্যাহতি গত বছরের তুলনায় বেড়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৯২ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হলেও শুল্কছাড়ে সিদ্ধহস্ত ছিল রাজস্ব বোর্ড।
অর্থসংকট কাটাতে যখন বড় রাজস্ব আয় করার কথা, সেখানে উল্টো অবাধ ছাড় দিয়ে ৫৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করা হয়েছে। এ সুযোগ নিয়েছে মোবাইল ফোনসেট উৎপাদক, পোলট্রিশিল্প, ভোজ্যতেল-পাথর-ফ্রিজ-এসি আমদানিকারক, রূপপুর বিদ্যুকেন্দ্র এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থা। অথচ আর্ন্তজাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ছাড়াও অর্থনীতিবিদরা বারবার করছাড় কমিয়ে আনার কথা বলেছেন।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে মোবাইল ফোন উৎপাদন খাতে ২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার শুল্কছাড় দেওয়া হয়। তখন বলা হয়েছিল, এর ফলে অপেক্ষাকৃত কম দামে মানুষ মোবাইল ফোন সেট কিনতে পারবে। অথচ বাজারে মোবাইল ফোনসেটের দাম খুব একটা কমেনি। পোলট্রিশিল্পে ছাড় দেওয়া হয় ১ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। বাস্তবে পোলট্রি পণ্য, বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম বেড়েছে।
ছাড়ের পরেও কেন মূল্যবৃদ্ধি এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পোলট্রি এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, এ ধরণের ছাড় দেওয়াই উচিত না। সরকার যত ছাড় দেবে বাজারে সিন্ডিকেট বা অস্থিরতা তত বাড়বে। কারন করপোরেট উদ্যোক্তরা একদিকে ছাড় নিচ্ছে অন্যদিকে বাজারকে জিম্মি করছে। সিন্ডিকেট করে তারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করছে। ডিম, মুরগি, পোলট্রি ফিড বা মুরগির বাচ্চার দাম তারাই ঠিক করছে। এ কাজের সহযোগী সরকারের আমলারা। এতে ছোট খামারীরা হারিয়ে যাচ্ছে, বড় ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বাড়ছে।’
সাধারণ মানুষের নিত্যব্যবহার্য একটি পণ্য ফ্রিজ। সেইসঙ্গে তীব্র গরমে কিছুটা স্বস্তি পেতে সামর্থ্য থাকলে অনেকেই ব্যবহার করেন এসি। এই দুটি পণ্য উৎপাদনের উপকরণ আমদানিতে ছাড় দেওয়া হয়েছে ৭১৪ কোটি টাকা। তবে দামে ছাড় পায়নি ভোক্তারা, উল্টো দাম বেড়েছে। কারন জানতে চাইলে মিনিস্টার ফ্রিজের হেড অব প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার মনিরুল হাসান স্বপন বলেন, ‘সব ধরণের উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়নি। কম্প্রেসর সবাই বানায় না। এখানে ছাড় দিলে ভোক্তার কোন লাভ হবে না। আবার আগে ভ্যাট ছিল ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, এখন বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়েছে। এ কারণে দাম বেড়েছে।’
এছাড়া ভোজ্যতেলের আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছিল। এতে রাজস্ব ক্ষতি হয় ২ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে ছাড়ের পরিমাণ ছিল ৫৯২ কোটি টাকা। টেক্সটাইল খাত ছাড় পেয়েছে ১ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেজা) ৯০৫ কোটি টাকা এবং পাওয়ার গ্রিড কম্পানি ৪৪৭ কোটি টাকা শুল্কছাড় নিয়েছে। এনবিআরের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৫ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা, অগ্রিম আয়করসহ অন্যান্য খাতে ১ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে। বিশেষ অব্যাহতির মাধ্যমে ছাড় দেওয়া হয়েছে ৮৯৮ টাকার শুল্ক। মূলধনি যন্ত্রপাতি কিনতে ছাড় দেওয়া হয়েছে ৮ হাজার ৩৩ কোটি টাকা, ত্রাণসামগ্রী খাতে ছাড় দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালামালের ছাড় ২ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ২৮ কোটি টাকা।
সরকারের পক্ষ থেকে বড় শুল্কছাড় দেওয়া হলেও এর পক্ষে ব্যবসায়ীরা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, ‘যেখানে অব্যাহতি প্রয়োজন সেখানে দিতে হবে। কারন এরসঙ্গে কর্মসংস্থান ও খাতের স্বনির্ভরশীল হওয়ার প্রশ্ন জড়িত। আমেরিকার মতো দেশও অনেক খাতে অব্যাহতি দেয়। যাতে শিল্প বড় হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে ও অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। আমরা উন্নত দেশ না। অব্যাহতি তুলে নিলে তার প্রভাবও বিশ্লেষণ করতে হবে। আইএমএফের সব শর্ত মেনে নিলে সবসময় ভালো হয়, বিষয়টা এমন না।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ঠিকমতো রাজস্ব আয় না হওয়ার পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন খাতে শুল্কছাড় দেওয়ার কারণেই সরকারকে বিপুল অঙ্কের টাকা ধার করতে হয়েছে। অর্থ বিভাগের নীতি-বিবৃতির তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৮১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য সংশোধিত ঋণ স্থিতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ২১ লাখ ১১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নতুন অর্থবছরে কিছু জায়গায় অব্যাহতি কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এবারের বাজেটেও সরকার কর অব্যাহতি কমানোর চেষ্টা করেছে। এলডিসি গ্রাজুয়েশনকে সামনে রেখে আগামী বছরের বাজেটেও অব্যাহতি কমাতে হবে। কর অব্যাহতি যৌক্তিককরণ করতে হবে। অব্যাহতি একবারেই লাগবে না, তা ঠিক নয়। আমাদের মতো অর্থনীতিতে কর অব্যাহতি লাগবে।’
এনবিআরের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী, স্বল্প করহার, কর অব্যাহতি ও কর অবকাশ সুবিধার কারণে কর-জিডিপি অনুপাত ২ দশমিক ২৮ শতাংশ কম হচ্ছে। এসব সুবিধা তুলে দিলে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে দাঁড়াবে। অথচ সেদিকে নজর সীমিত বলে মনে করছেন রাজস্ব খাতের বিশেষজ্ঞরা।
কোভিডজনিত অর্থনৈতিক সংকট আর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে চাপে বিশ্ব অর্থনীতি। এর ধাক্কা লাগে বাংলাদেশেও। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ডলার সাশ্রয়সহ কৃচ্ছসাধনের নানামুখী পদক্ষেপ নেয়। পাশাপাশি বড় রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ঠিক করে। এর সঙ্গে যোগ হয় আইএমএফের কঠিন সব শর্ত। এর অন্যতম ছিল করছাড় কমিয়ে আনা এবং ধাপে ধাপে তা একেবারে তুলে দেওয়া। রাজস্ব আয় বাড়িয়ে কর-জিডিপি অনুপাতও দুই অঙ্কের ঘরে নিয়ে যাওয়ার চাপ ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয়ে হতাশাজনক অবস্থায় পড়ে এনবিআর। দুর্বল আদায় ব্যবস্থাপনার কারণে বিদায়ী অর্থবছরে ৯২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা ঘাটতি থাকে। রাজস্ব আদায়ে সংস্থাটি যখন ক্রমেই পিছিয়ে, তখনো বিভিন্ন খাত ও সংস্থাকে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ছাড় অব্যাহত রাখা হয়। এনবিআরের শুল্কছাড়-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে এনবিআর ৫৪ হাজার কোটি টাকার শুল্কছাড় দিয়েছে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ৪৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। যখন বেশি রাজস্ব আয় দরকার, তখন বাড়তি ৫ হাজার ১২০ কোটি টাকা (১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ) ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের সাবেক সদস্য আবদুল মান্নান পাটোয়ারী অবশ্য বলেন, ‘আইএমএফ চায় রাজস্ব অব্যাহতি না থাকুক। তবে জনস্বার্থে সরকারকে রাজস্ব ছাড় দিতে হয়। যে পরিমাণ ছাড় দেওয়া হয়েছে, ততটুকু সুবিধা ভোক্তারা পাবে-এটা আশা করা যায় না। ব্যবসায়ীরা তাদের লাভের কথা চিন্তা করবেনই। ছাড় না দিলে এই অজুহাত দেখিয়ে হয়তো আরও দাম বাড়িয়ে দিতেন।’
বিএইচ
- ১সিজেপির তীব্র বিক্ষোভে দিল্লির ১৬ মেট্রো স্টেশন বন্ধ
- ২শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের দ্বিতীয় প্রান্তিক প্রকাশ
- ৩প্রিমিয়ার ব্যাংকের দ্বিতীয় প্রান্তিক প্রকাশ
- ৪লোকসানেও আলহাজ্ব টেক্সটাইলের লভ্যাংশ ঘোষণা
- ৫চাঁদপুরে বাঁশ দিয়ে আটকে দেওয়া হলো মসজিদের প্রবেশপথ
- ৬কুষ্টিয়ায় হজ্ব ও ওমরাহ সেবা নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
- ৭চকরিয়ায় ২০ প্যাকেট ইয়াবাসহ মাদককারবারী আটক
- ৮রংপুরে প্রি-পেইড মিটার স্থাপন বন্ধের দাবিতে মামলা
- ৯চাঁদপুরে মোটরসাইকেল-অটোরিক্সা সংঘর্ষে কিশোর নিহত
- ১০বিশ্ববাজারে ফের বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম
- ১‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতেই চলবে বৈদেশিক সম্পর্ক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- ২একনেক সভায় ১৪ হাজার ৪১ কোটি টাকার ৮ প্রকল্প অনুমোদন
- ৩এমপি গাজী নজরুলকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার
- ৪পারিবারিক বিরোধের জেরে তায়েবাকে হত্যার অভিযোগ, ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
- ৫অনলাইনে রিটার্ন দাখিল ৪৭ লাখ
- ৬টেকসই অর্থায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ
- ৭মানিকগঞ্জে বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান
- ৮শ্রীপুরে জলাবদ্ধতা নিরসনে নিজ অর্থায়নে স্থানীয়দের ড্রেন নির্মাণ
- ৯স্থানীয় সরকার কার্যকর হলেই গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী হবে
- ১০কানাডা থেকে ৪০ হাজার টন এমওপি সার কিনবে সরকার





পাঠকের মতামত