
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সার্বভৌমত্বকে প্রায়ই একটি চূড়ান্ত, অখণ্ড ও পরম ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সংবিধান, পতাকা, সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রাষ্ট্রকে সার্বভৌম বলে ঘোষণা করে। কিন্তু ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতা দেখায়, সার্বভৌমত্ব কোনো স্থির বা চিরস্থায়ী ধারণা নয়; এটি সময়, শক্তি, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার সমীকরণের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। শক্তি যেখানে নেই, সেখানে সার্বভৌমত্ব কেবল কাগজে-কলমে টিকে থাকে।
সার্বভৌমত্বের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ইতিহাস
সার্বভৌমত্বের আধুনিক ধারণা প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তিতে। এই চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যেক রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভূখণ্ডে স্বাধীন এবং বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত। ইউরোপে এই তত্ত্ব কার্যকর হলেও ঔপনিবেশিক যুগে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বাস্তবে সীমিত ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নীতি ও আইনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা হয়। ১৯৪৫ সালে ৫১টি রাষ্ট্রের অংশগ্রহণে গঠিত জাতিসংঘ আজ ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত। সদস্য সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু বাস্তব ক্ষমতা ক্রমেই কয়েকটি শক্তিধর রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি মৌলিক বৈপরীত্যকে চিহ্নিত করে।
রিয়ালিস্ট আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্ব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত শক্তিনির্ভর। এখানে নৈতিকতা, আইন বা মানবাধিকার তখনই কার্যকর হয়, যখন তা শক্তির কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত ক্ষমতাই রাষ্ট্রের বাস্তব সার্বভৌমত্ব নির্ধারণ করে।
বৈশ্বিক শক্তির কেন্দ্রীকরণ
এসআইপিআরআই (স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট)-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৩৯ শতাংশ এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের। চীন ও রাশিয়াকে যুক্ত করলে শীর্ষ তিন রাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় বৈশ্বিক মোটের ৫৫ শতাংশের বেশি। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্টভাবে দেখায়, আজকের বিশ্বে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কারা প্রধান নিয়ামক।
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের প্রভাব কেবল সামরিক শক্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কৌশলগত জোটের ক্ষেত্রে এই তিন রাষ্ট্রকে প্রভাবশালী হিসেবে ধরা হয়। ফলে ছোট বা মধ্যম আকারের রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম ক্ষমতা প্রায়ই এদের প্রভাবের অধীনে পরিচালিত হয়।
আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা
আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক আদালত এবং জাতিসংঘকে তাত্ত্বিকভাবে সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে নয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা এই কাঠামোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
১৯৪৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই পাঁচ স্থায়ী সদস্য প্রায় ৩০০ বার ভেটো প্রয়োগ করেছে। এর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়েছে নিজস্ব বা মিত্র রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায়। ফলে আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর হলেও শক্তিশালীদের ক্ষেত্রে প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
ইউক্রেন সংকট এই সীমাবদ্ধতার একটি বড় উদাহরণ। ইউএনএইচসিআর ও জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর থেকে লাখের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় ৬০ লাখ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘ কার্যকর যুদ্ধবিরতি বা মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ভেনিজুয়েলা: সংঘাতের ইতিহাস ও অর্থনৈতিক সংকট
ভেনিজুয়েলার সংকট হঠাৎ নয়; এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ফল। ১৯২০-এর দশক থেকে ভেনিজুয়েলা তেলনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি হয়। জাতীয় আয়ের বড় অংশ আসে তেল থেকে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বহুজাতিক কোম্পানির হাতে।
১৯৯৮ সালে হুগো শাভেজ ক্ষমতায় আসেন। তিনি ‘বলিভারিয়ান বিপ্লব’ শুরু করে তেলের সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেন এবং সামাজিক খাতে ব্যয় বাড়ান। দারিদ্র্য কমে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে।
২০১৩ সালে শাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। সেই সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যায়, অর্থনীতি সংকুচিত হয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভেনিজুয়েলার জিডিপি প্রায় ৭০ শতাংশ কমে যায়।২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র হুয়ান গুয়াইদোকে ‘অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়।ফলে ভেনিজুয়েলা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতায় আটকে যায়, যা সার্বভৌমত্বের ক্ষয়কে প্রকটভাবে প্রকাশ করে।
সার্বভৌমত্ব ক্ষয়ের বৈশ্বিক ধারা
ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সার্বভৌমত্ব হারানোর ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সিকিম ১৯৭৫ সালে ভারতের অন্তর্ভুক্তি। হায়দারাবাদ ১৯৪৮ সালে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দখল। কাশ্মীর দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ সার্বভৌম সংকটে।হংকং ২০২০ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইনের পর রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত।
শিনজিয়াং ও তাইওয়ান চীনের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে বা চাপের মধ্যে। সিরিয়া ও ইরাক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক শক্তির প্রভাবের মধ্যে। ইউক্রেন ও মধ্য এশিয়ার বহু রাষ্ট্র রাশিয়ার কৌশলগত চাপের মধ্যে।ভেনিজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে।
এই ভিন্ন ভৌগোলিক বাস্তবতাগুলো একটি অভিন্ন সত্য প্রকাশ করে—যে রাষ্ট্র নিজের শক্তি, ঐক্য ও কৌশলগত সক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তার সার্বভৌমত্ব কেবল কাগজে-কলমে টিকে থাকে।
মায়ানমার ও রাখাইন: ব্যর্থ রাষ্ট্রের বাস্তব উদাহরণ
মায়ানমারও একই চক্রের অংশ। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে অন্তত ৩০ লাখ অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। আন্তর্জাতিক আদালত, জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন এবং মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট থাকা সত্ত্বেও কার্যকর সমাধান হয়নি। এটি দেখায়, দুর্বল রাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক আইন প্রায় অকেজো। রাখাইন শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং একটি ভূরাজনৈতিক পরীক্ষাগার, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির স্বার্থ যাচাই হচ্ছে।
বাংলাদেশ: আঞ্চলিক সতর্কতা ও বাস্তব শিক্ষা
এই বৈশ্বিক বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য দূরবর্তী তাত্ত্বিক নয়। আমাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান সংবেদনশীল। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ ভারতের প্রভাববলয়, চীন ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় শক্তির কৌশলগত আগ্রহের মধ্যবর্তী স্থানে। বঙ্গোপসাগরও ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ও জ্বালানি করিডোরে পরিণত হচ্ছে।
ইতিহাসের উদাহরণ স্পষ্ট। সিকিম, হায়দারাবাদ এবং কাশ্মীর দেখিয়েছে—ছোট রাষ্ট্রগুলো সর্বদা ঝুঁকিতে থাকে, যখন তারা নিজের শক্তি, কৌশল এবং মিত্রতা না গড়ে। মায়ানমার ও রাখাইন দেখিয়েছে, প্রতিবেশীর ব্যর্থতা সরাসরি বাংলাদেশকে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা স্পষ্ট: আবেগ বা নৈতিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে, রাষ্ট্রকে শক্তি, কৌশল এবং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের আলোকে পরিচালনা করতে হবে। অভ্যন্তরীণ ঐক্য, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা কাঠামো ছাড়া সার্বভৌমত্ব টেকসই হয় না।
লেখক: প্রকৌশলী মোহাম্মদ লোকমান
সদস্য, জাতীয় নির্বাহী পরিষদ
এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি
- ১ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন প্রত্যাহার
- ২রংপুর বিভাগের নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় তারেক রহমান
- ৩কোনো ধানাই-পানাই মানবো না, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতেই হবে
- ৪আ.লীগই ইতিহাস সবচেয়ে বেশি বিকৃত করেছে: বিদ্যুৎমন্ত্রী
- ৫শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ প্রথম উইকেট মাত্র, আন্দোলন চলবে: সিজেপি
- ৬নিরপেক্ষভাবে কাজ করাই সাংবাদিকতার মূল দর্শন হওয়া উচিত: তথ্যমন্ত্রী
- ৭বঙ্গভবনে অফিস, স্পিকারের বাসভবনে থাকবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি
- ৮সশস্ত্র বাহিনীকে দলীয় ‘হাতিয়ার’ হতে দেওয়া হবে না: প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা
- ৯বৃক্ষরোপণ করলেই হবে না, যত্নও নিতে হবে : ভূমিমন্ত্রী
- ১০হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু
- ১মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমা সদৃশ বস্তু, নিষ্ক্রিয় করেছে পুলিশ
- ২চা শ্রমিককে মারধরের অভিযোগে দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি ও মানববন্ধন
- ৩শেরপুরে হাতি সংরক্ষণে জনসচেতনতা বিষয়ক তিনদিনব্যাপী প্রশিক্ষণ
- ৪ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে : তথ্যমন্ত্রী
- ৫সংবিধান রক্ষা করেছি, নতুন সরকার দেশ চালাচ্ছে, এসব আমারই কৃতিত্ব
- ৬কয়রায় জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের স্মরণে ছাত্রশিবিরের দোয়া অনুষ্ঠান
- ৭আত্মঘাতী বোমা হামলায় পাকিস্তানের ১২ সেনাসহ ১৫ জন নিহত
- ৮শেরপুর সীমান্তে ভারতীয় মদসহ ২ চোরাকারবারি আটক
- ৯দেশে নতুন বিনিয়োগের ৯২ শতাংশই চীনের: বিডা
- ১০মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চা-শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ





পাঠকের মতামত