
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবেচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে ব্যাংক খাতে। বিভিন্ন গ্রুপ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঋণের নামে ব্যাংক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে। সাবেক গভর্নর ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদারের সময় ব্যাংক খাত ছিল লুটপাটের মহোৎসব। ২০১৭ সালে রাতের আধারে দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে এস আলমের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ফজলে কবির। এরপর থেকেই ব্যাংকটি থেকে ঋণের নামে একের পর এক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটতে থাকে।
এরপর ২০২২ সালে আব্দুর রউফ তালুকদার এসে বৈষম্যহীন লুটপাট চালু করেন। এসব লুটপাট ঢাকতে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশও নিষিদ্ধ করেছিলেন। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পালিয়ে গেছেন আব্দুর রউফ তালুকদার। যেটা দেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। কিন্তু সাবেক গভর্নর ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদার এখনো ধরাছোয়ার বাইরে। সরকার কেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না-এনিয়ে মানুষের মধ্যেও প্রচ- ক্ষোভ রয়েছে। বিগত ১৬ বছরে অর্থপাচারেরও রেকর্ড হয়েছে। কারো মুখ খোলোর মত অবস্থা ছিল না। পুরো খাতজুড়ে নীরব রক্তক্ষরণ হয়েছে। যা গত আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে।
এদিকে, অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়ে সংস্কারে মনোযোগ দেয়। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার, সুশাসন, রিজার্ভ প্রভৃতি তথ্য সাধারণ মানুষ জানার পর একটা আতঙ্ক দেখা দেয়। সেই থেকে ব্যাংকের ওপর আস্থার সঙ্কট সৃষ্ট হয়। মানুষ ব্যাংকের টাকা উঠাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অনেক ব্যাংকের গ্রাহক সঞ্চয়ের টাকা তুলতে পারেন নি। যদিও ধীরে ধীরে আস্থা অনেকটা ফিরার উপক্রম হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে রীতি মত ধোয়াসা রয়েছে। কবে রক্তপাতের ক্ষত শুকাবে তা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর চলমান রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্ট সরকার বদলের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। তারা দায়িত্ব নেওয়ার পরই আস্থার সংকটে অনেক গ্রাহক ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি সামলাতে নগট টাকা তোলার সর্বোচ্চ সীমা বেধে দেয়। যা ১ লাখ থেকে ৭ লাখ পর্যন্ত করা হয়। তবে একটা পর্যায়ে সেই সীমা তুলে নেয় এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে ২৮ হাজার কোটি ছাপিয়ে তারল্য সহায়তা দেয়। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টির বদলে তারল্য সহায়তা দেয় সবল ব্যাংকগুলো। কিন্তু এখনো গ্রাহকের চাহিদা মত নগদ টাকা দিতে পারছে না দুর্বল ব্যাংকগুলো।
জানা গেছে, এস আলমের মালিকনাধীন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ সহ ১১ টি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। তারম্যধে কিছু যাতে আস্থা ফিরে আসে। কিন্তু কয়েকটি ব্যাংকে পর্ষদ কাজ করছে না। আবার ইসলামী বাংকের এস আলমের লুটের সহকারি এমডি মুহাম্মদ মনিরুল মওলাকে নিয়ে বিক্ষোভ গতকাল পর্যন্ত চলমান ছিল।। তবে এস আলমের লোকজন সক্রিয় থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সবমিলে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে ত্রুটিপূর্ণ একীভূতকরণ করা হয়। যা এখণ পর্যন্ত লক্ষ্যমাফিক কাজ করছে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মে মাসে ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক করে। এতে সুদের হার মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ থেকেক প্রায় ১৫ শতাংশে ছাড়িয়ে যায়। এতে বিনিয়োগ হ্রাস পায়। আবার একই সময়ে ডলার কেনাবেচায় ‘ক্রলিং পেগ’ ব্যবস্থা চালু করে। ব্যাংকগুলোকে ১১০ টাকার ডলার প্রায় ১১৭ টাকায় বিক্রির কথা জানায়।
এভাবে বাড়তে বাড়তে ডলারের দর ১২২ টাকায় গিয়ে ঠেক খায়। গতকাল ব্যাংকে প্রতি ডলারের ঘোষিত দর ছিল ১২১ টাকা ৯১ পয়সা। যা খোলা বাজারে ছিল ১২৭ টাকা। আর গতমাসে রেকর্ড উটে ১৩১ টাকার। এতে মূল্যস্ফিতি উস্কে যায়। মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ। লক্ষ্য ছিল সাড়ে ৬ শতাংশ। কবে এই লক্ষ্য পূরণ হবে তা নিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার নেই।
এদিকে গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে খেলাপি বেড়েছে ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। মূলত হাসিনা সরকার বদলের পর খেলাপি গোপনীর সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার প্রবণতার কারণে গোপনীয় খেলাপি প্রকাশ করায় এরকম উলক্ষন হয়েছে । যদিও ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।
বাংরাদেশ ব্যাংক বানিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ফরেনসিক অডিট, পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। মূলত এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, জেমকন গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ ও আরামিট গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও অন্যান্য আর্থিক জালিয়াতি তদন্তে সরকারি টাস্কফোর্স বাড়তি গুরুত্ব দিচ। ছে। এজন্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী সরকারের সময় গত ৩১ জুলাই রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ৫৯২ কোটি ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ৪৮ কোটি ডলার। তিন বছর আগে মোট রিজার্ভ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছিল। চলতি মাসে মোট রিজার্ভদাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৭২ কোটি ডলার। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী যা ২ হাজার ৪৫ কোটি ডলার।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকসহ এস আলম গ্রুপের মালিকানায় থাকা ব্যাংকগুলোয় যে ভঙ্গুর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার বিস্তৃতি কতটা, তা জানতে নিরীক্ষা দরকার। এর ভিত্তিতে ঠিক করতে হবে, এসব ব্যাংকের সংস্কার কীভাবে হবে এবং শেষ পর্যন্ত এগুলোর দায়দায়িত্ব কার ওপর দেওয়া হবে। ব্যাংক খাতে থেকে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা পাচার ভাগিয়ে নিয়েছে কয়েকটি গ্রুপ। যা অধিকাংশ পাচার হিসাবে সন্দেহ করা হচ্ছে।
সিপিডি জানায়, গত ১৫ বছরে দেশের ব্যাংক খাতে ২৪টি বড় ধরনের কেলেঙ্কারি হয়েছে। এতে অর্থ লোপাট হয়েছে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। এটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের ১২ শতাংশ। অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচাল ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, পুরো ব্যাংক খাত চলে গেছে নিয়মনীতির বাইরে। এত দিন বিশেষ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রসারে কাজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অপরদিকে বিএফআইইউ এর পধানকে দুর্নিতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দোষীদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এস আলম, সালমান এফ রহমানসহ সন্দেহভাজন পায় ১০ হাজার হিসাব জব্দ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত লকারা জব্দের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক খাতে অনেক অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। কিছু ব্যাংক দুর্বল অবস্থা রয়েছে। সবমিলে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে আনতে চেষ্টা করা হচ্ছে। অনিয়ম অনুসন্ধান ও সংকট উত্তরণে সুপারিশ করবে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো। পরে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এসব হতে সময় লাগবে।
এম জি
- ১চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার
- ২কয়রায় জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মৎস্যঘের দখলের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন
- ৩গাজীপুর জেলা শ্রমিক দল নেতার বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন
- ৪পাথরঘাটায় পুলিশ ফাঁড়ির বিরুদ্ধে ট্রলার থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ
- ৫ব্লক মার্কেটে লেনদেন ২৭ কোটি টাকার
- ৬সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সরকার পর্যালোচনা করছে
- ৭ইবিতে জুলাইয়ের সম্মুখসারীর নেতাদের আগমন
- ৮দর পতনের শীর্ষে সিএপিএম আইবিবিএল মিউচ্যুয়াল ফান্ড
- ৯দর বৃদ্ধির শীর্ষে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স
- ১০মাদারীপুরে ডাল গবেষণা কেন্দ্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ
- ১চকরিয়ায় বন্যার্ত ৫০ পরিবারকে ধরা’র ত্রাণ বিতরণ
- ২সার্ককে আরও গতিশীল করতে চায় বাংলাদেশ-মালদ্বীপ
- ৩তুরস্ক সফর শেষে দেশে ফিরেছেন সেনাপ্রধান
- ৪রংপুর বিভাগের নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় তারেক রহমান
- ৫সিরিয়ায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত অন্তত ৩৫
- ৬কোনো একসময় বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবে : ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী
- ৭‘তেলাপোকাদের’ চিহ্নিত করে গুন্ডা দমন আইনে মামলার ঘোষণা শুভেন্দুর
- ৮ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেলেঙ্কারিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জড়িত
- ৯তৃণমূল সংগঠনের খোঁজ-খবর ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী
- ১০চাঁদপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আনোয়ার বাবলু মারা গেছেন





পাঠকের মতামত