বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬ ৭:৪৯ এএম , আপডেট: মে ৬, ২০২৬ ১০:৫৭ পিএম

উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতির কারণে লভ্যাংশ দিতে পারেনি পুজিবারের তালিকাভুক্ত অর্ধেকেরও বেশি ব্যাংক। খেলাপি ঋণের হার দুই অঙ্কের ঘরে থাকা কোনো ব্যাংককে ২০২৫ সালের জন্য লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে কেবল ১৬টি লভ্যাংশ দিতে পেরেছে। দেশীয় ৫২টি ব্যাংকের মধ্যে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮টি।

জানা গেছে, গত বছরের ১৩ মার্চ শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ ঘোষণার নীতিমালা শীর্ষক একটি বিধান করা হয়। সেখানে বলা হয়, কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ হলে ওই ব্যাংক আর লভ্যাংশ দিতে পারবে না। বর্তমানে ২৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে ২৯ শতাংশের ওপরে। এর মধ্যে ১৭টি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। আবার মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি থাকলেও লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ নেই। আগে প্রভিশন সংরক্ষণে বাড়তি সময় নিয়েছে এরকম ব্যাংকও লভ্যাংশ দিতে পারেনি।

আবার মূলধন ভিত্তি সবচেয়ে ভালো এবং রেকর্ড মুনাফা করা ব্যাংকেও সর্বোচ্চ লভ্যাংশের সীমা বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একটি ব্যাংক কোনো অবস্থায় পরিশোধিত মূলধনের ৩০ শতাংশ কিংবা নিট মুনাফার ৫০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিতে পারবে না। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, পরবর্তী বছরের ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

গত বছরও কঠোর নীতি করা হয়। যে কারণে গত বছর নির্ধারিত সময়ে আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করতে পারছিল না অধিকাংশ ব্যাংক। ফলে এক মাস সময় বাড়ানো হয়েছিল। এবার নির্ধারিত তারিখে সব ব্যাংক আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করেছে।

এ বিষয়ে কথা বললে মানারাত ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে আর ফেরত না দেয়ার কারণেই মূলত এমন হয়েছে। এটার জন্য মূলত এককভাবে কেউ দায়ী না। বিগত সরকারের আমলে কিছু ব্যাংক মালিক, ব্যবসায়ী, সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও দায় আছে। তাই ঢালাওভাবে বর্তমান সব মালিককে দায়ী করা ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, এসব নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ভাবতে হবে। গ্রাহকদের যেমন বাচিয়ে রাখতে হবে, ঠিক তেমনি ব্যাংক এবং শেয়ারহোল্ডারদেরকেও বাচিয়ে রাখতে হবে। এজন্য মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। প্রভিশনের বিধান ঠিক থাকবে। প্রভিশন দেয়ার একটা সময় বেধে দিয়ে দিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সবাইকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

লভ্যাংশ দিয়েছে যেসব ব্যাংক

ব্যাংক খাতের নানা সংকটের মধ্যেও বেসরকারি খাতের ৬টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবার সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ অনুমোদন করেছে। নগদ ও স্টক মিলে এ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়। এ তালিকায় রয়েছে–ব্র্যাক, সিটি, পূবালী, ডাচ্-বাংলা, প্রাইম ও উত্তরা ব্যাংক। লভ্যাংশ বিতরণে পরের অবস্থানে থাকা যমুনা ব্যাংক দিয়েছে ২৯ শতাংশ। এর পরে রয়েছে যথাক্রমে ইস্টার্ন ব্যাংক ২৮ শতাংশ, এনসিসি ২৫, ব্যাংক এশিয়া ১৭, শাহ্জালাল ইসলামী ১৩, ট্রাস্ট ব্যাংক ১৩, এমটিবি ১২, সাউথইস্ট ব্যাংক ১০, ঢাকা ১০ এবং মিডল্যান্ড ৬ শতাংশ। পুঁজিবাজারে তালিকভুক্ত এসব ব্যাংকের বাইরে এবার কমিউনিটি ব্যাংক ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিয়েছে।

লভ্যাংশ দিতে পারেনি যেসব ব্যাংক

বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে কোনো লভ্যাংশ দিতে না পারার তালিকায় রয়েছে– ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। এক সময় ‘এ’ ক্যাটেগরি থেকে ব্যাংকটি এবার ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে নেমে এসেছে। এটার খেলাপি ঋণ ৪৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ তালিকায় রয়েছে আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫৩ শতাংশ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২২ শতাংশ, ইউসিবির ১১ শতাংশ, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৬ শতাংশ, এবি ব্যাংকের ৫০ শতাংশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ১৫ শতাংশ, আইসিবি ইসলামিকের ৮৪ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৫১ শতাংশ, এনআরবির ৮ শতাংশ, এনআরবিসির ১৭ শতাংশ, ওয়ান ব্যাংকের ১৩ শতাংশ, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৩০ শতাংশ, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের ১৫ শতাংশ।

একীভূত হওয়ার কারণে পুঁজিবাজারের তালিকা থেকে বাদ পড়া এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোস্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক রয়েছে এ তালিকায়। এসব ব্যাংক একীভূত করে অকার্যকর ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূলত বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে ‘নস্ট্রো’ অ্যাকাউন্ট পরিচালনার সুবিধার্থে ব্যাংকগুলোর এখনও লাইসেন্স বাতিল করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন ব্যাংকের মধ্যে লভ্যাংশ দিতে পারেনি– বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬৫ শতাংশ, মেঘনা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ, মধুমতি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ শতাংশ, পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৩ শতাংশ ও সীমান্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬ শতাংশ। আর সিটিজেনস ব্যাংক নিট মুনাফা করলেও লভ্যাংশ বিতরণ করেনি।

সরকারি ব্যাংকের মধ্যে রূপালীর খেলাপি ঋণ ৪১ শতাংশ, সোনালীর ১৬ শতাংশ, জনতার ৭৪ শতাংশ, অগ্রণীর ৩৮ শতাংশ, বিডিবিএলের ৪৯ শতাংশ, বেসিকের ৬৬ শতাংশ, বিকেবি ৪৬ শতাংশ, রাকাবের ১৯ শতাংশ ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ১৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ। এই ব্যাংকগুলো সরকারকে লভ্যাংশ দিতে পারেনি।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

ব্যাংকারদের শৃঙ্খলাভঙ্গের মামলা দুই মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ

ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজের অভিযোগ ও শৃঙ্খলামূলক মামলা দুই মাসের মধ্যে ...

খেলাপি হলে মিলবে না ইডিএফ ঋণের নতুন সুবিধা

রপ্তানিমুখী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার অর্থায়ন আরও সুশৃঙ্খল করতে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) ...

ফ্রিল্যান্সার ও সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সহজে নতুন নির্দেশনা

দেশের ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তি পর্যায়ের সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আরও সহজ করতে নতুন নির্দেশনা ...