ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: আগস্ট ৬, ২০২৬ ৬:৪৯ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলা কোনো নেতার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

সেই দাবির পক্ষে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) যুক্তিতর্কের দ্বিতীয় দিনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ফোনালাপ, জাতিসংঘের প্রতিবেদন এবং সমসাময়িক বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ আদালতে তুলে ধরা হয়।

সেই ফোনালাপে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন তৎকালীন সেতুমন্ত্রীকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি, জমায়েত ও সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে অবহিত করছেন। শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির কথা শুনে ওবায়দুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়, ‘পিটাও না কেন ওদের? মারো না কেন? বাড়তে দাও কেন ওদের?’

একটি রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিজের অধীনস্থ ছাত্রসংগঠনের সভাপতিকে এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় অপরাধে উসকানির শামিল বলেও জানায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশন বলছে, দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশ, ফোনালাপ, প্রকাশ্য বক্তব্য এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে হামলাগুলো একটি সমন্বিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল বলে প্রতীয়মান হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেল এ সংক্রান্ত বিষয়ে যুক্তিতর্ক শুনানি গ্রহণ করেন।

প্রসিকিউটর তামিম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দামের মধ্যকার একটি ফোনালাপের রেকর্ড জব্দ করেছে এবং তার ফরেনসিক প্রতিবেদনও আদালতে দাখিল করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ আখ্যা দেওয়ার পর ওবায়দুল কাদের প্রকাশ্যে বলেন, আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট এবং ‘রাজাকার’ স্লোগানের জবাবও ছাত্রলীগ দেবে।

প্রসিকিউশনের দাবি, এর পরদিন ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন শতাধিক নিরস্ত্র আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা হামলা চালায়। তাদের মারধর, গুলি ও কুপিয়ে আহত করা হয়। আহতদের একটি অংশ চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে সেখানেও তাদের ওপর হামলা চালানো হয়।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ হিসেবে ওই বছরের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হামলায় উসকানির বিষয়টি উল্লেখ করে প্রসিকিউশন সমসাময়িক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করে।

প্রসিকিউটর তামিম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ওবায়দুল কাদেরের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন মন্ত্রী হিসেবে তিনি ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে উসকানি দেন।

আদালতে উপস্থাপিত আরেকটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তামিম বলেন, ওবায়দুল কাদের ‘ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে’ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন।

প্রসিকিউশনের দাবি, এসব তথ্য-প্রমাণ একত্রে বিবেচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলা কোনো একক ব্যক্তির সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল আওয়ামী লীগের একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সশস্ত্রভাবে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়, যাতে হতাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

রাজনৈতিক বিক্ষোভে সরকারি দলের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো কি অপরাধ? এমন প্রশ্নে প্রসিকিউটর তামিম সাংবাদিকদের বলেন, প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের সামনে প্রতিরোধের কথা বলা আর ব্যক্তিগত ফোনালাপে ছাত্রলীগ সভাপতিকে ‘পিটাও না কেন ওদের? মারো না কেন? বলা এক বিষয় নয়।

তার ভাষ্য, ওই নির্দেশনার পর যে ফল দেখা গেছে, তা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সশস্ত্র ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলা। তাই প্রকাশ্যে প্রতিরোধের কথা বলা হলেও বাস্তবে সেটি আক্রমণের নির্দেশ হিসেবেই কার্যকর হয়েছিল।

শুনানি ৯ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। এর আগে গত ৪ আগস্ট যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। গত ২২ জানুয়ারি ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসামিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম না হওয়ায় তাদের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বারিধারায় পাকিস্তানি হাইকমিশনারের বাসায় আগুন, আইসিইউতে হাইকমিশনার

রাজধানীর বারিধারায় পাকিস্তান হাইকমিশনারের সরকারি বাসভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হাইকমিশনার ইমরান হায়দার ও তার স্ত্রী নাইমা ...

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে স্বল্পমেয়াদি অধিবেশন ডাকা হবে: চিফ হুইপ

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে জাতীয় সংসদে স্বল্পমেয়াদি বিশেষ অধিবেশন ডাকা হবে বলে জানিয়েছেন সরকারি দলের চিফ ...

ভারত সফরের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নেবেন : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশনের (বিমসটেক) বর্তমান সভাপতি প্রধানমন্ত্রী তারেক ...

তনু হত্যা: সাবেক সেনাসদস্য হাফিজুরকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়া অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ...

মিটফোর্ড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হলেন এমপি হামিদুর রহমান

রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য ...

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অধ্যাপক ড. ...

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কা‌ছে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধির পরিচয়পত্র পেশ

বাংলাদেশে নবনিযুক্ত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিক্স পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কাছে পরিচয়পত্র ...