
ভ্যাপসা গরম। কখনো আচমকা বৃষ্টি। হুট করেই বয়ে যায় দমকা হাওয়া। কখনোবা আবার লাল টকটকে লিচ ঝুলে থাকা গাছের ছায়ায় জিরানো। দিগন্ত বিস্তৃত নীলাভ জল। পৌরানিক কাহিনী গাঁথা নদীর ধার। সারি সারি পাম গাছের ফাঁক গলে হেঁটে যাওয়া। সড়ক পথের কলিজা কাঁপানো বাঁক। এসব মিলিয়ে স্বল্প সময়ে ঘুরে আসার মত রোমাঞ্চকর স্মৃতি বয়ে আনা প্রকৃতি কন্যা উপজেলা কাপ্তাই।
টানা তিনদিন ছুটি। ছুটি মানেই ভ্রমণে বের হওয়ার জন্য মন থাকে পাগলপারা। এছাড়া আগেই পরিকল্পণা ছিলো দে-ছুট ভ্রমণ সংঘর,৩২তম পদাপর্ণ দিবসটা সংগঠনের মূল কয়েকজন কাপ্তাই পালন করব। সেই মোতাবেক রাত ১১টায় বাস। ভ্রমণ সঙ্গীরা সবাই বাস কাউন্টারে। কিন্তু ঘড়ির কাটা সাড়ে দশটা ছুঁইছুঁই করলেও, আমার তখনো যাওয়া হয়নি। মাথা পুরাই নষ্ট। পরদিন দলীয় র্যালীতে না গেলেই নয়। রাজনৈতিক কর্মসূচি, কি যে করি। এদিক দিয়ে ভ্রমণ সঙ্গীরা অনবরত ফোন দিয়েই যাচ্ছে। হা হুতাশ করতে করতে রাত ১১টার সময় পর্যটনবান্ধব ও প্রিয় রাজনৈতিক অভিভাবক হামিদুর রহমান হামিদ ভাইকে বলেই ফেললাম, ঘোরাঘুরির জীবনে এই প্রথম আমি আজ দে-ছুট ভ্রমণ সংঘর সঙ্গী হতে পারলাম না।তিনি আমার চোখে মুখে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট বুঝতে পেরে দ্রুত অনুমতি দিয়া দিলেন। এবার আমাকে আর পায় কে?
মুহূর্তের মধ্যেই ওয়ারী থেকে জনপথ মোড় পৌঁছে যাই। প্রচন্ড জ্যামের কারণে বাস একটু দেরিতেই ছাড়ল। স্বস্তির একটা নিশ্বাস ছেড়ে সিটে বসলাম বেশ আয়েশ করে। যেতে যেতে ভোরে পৌঁছাই কাপ্তাই। বন্ধু রতনের কল্যাণে সরকারি এক বিশ্রামাগারে আগেভাগেই রুম ঠিক করা ছিলো। রুমে উঠে সাফসুতর হয়েই সিএনজি করে আসাম বস্তির দিকে ছুটে যাই। যেতে যেতে বাঙাল হালিয়া পাহাড়ি বাজারে ব্রেক। কর্ণফুলি নদী ও কাপ্তাই লেকের নানান পদের মাছ আর ফলের পসরা মেলে রেখেছে পাহাড়িরা। টক মিষ্টি লিচুর স্বাদ নিই।পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি হাট-বাজার গুলোর ভিন্নমাত্রার বৈশিষ্ট থাকে। যা ভ্রমণপিপাসুদেরও বেশ আকৃষ্ট করে থাকে। তরতাজা মাছ কেনার ইচ্ছে দমিয়ে ছুটলাম মূল গন্তব্যে।পাহাড়ের বুক চিরে এঁকেবেঁকে চলা সড়ক। উঁচু নিচু ঢালু। একপাশে পাহাড়,আরেক পাশে কাপ্তাই লেকের নীলাভ জলরাশি। বয়ে চলা পানির বুকে ছোট্ট করে মাথা জাগিয়ে রাখা মাটি। সেই মাটি ভেদ করে শিরদাঁড়া উঁচু করে আছে বৃক্ষরাজি। চমৎকার চমৎকার সব প্রাকৃতিক দৃশ্য। এরকম নৈসর্গিক পরিবেশে মুগ্ধ নয়নে যেতে যেতে হঠাৎ লাল টসটসে লিচু বাগান দেখে চোখ আটকায়। গাড়ি থামিয়ে চলল ফটোশ্যুট। কোথাও কোথাও পথের ধারে কৃত্তিম ও প্রকৃতির সম্মলিনে পর্যটকদের জন্য সাজুগুজু করে রাখা হয়েছে নানান স্থাপনা। কোথাওবা সড়কের পাশে কংক্রিটের বেঞ্চ। তবে কাঠ-বাঁশের হলে প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে যেতো বেশ। ব্রিজ পর্যন্ত যেতে আরো কয়েকবার থেমেছি। পথের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আমাদেরকে থামতে বাধ্য করেছে। জুমের কলা,পেঁপে,আনারসের ছিলো সেই স্বাদ। যেতে যেতে কাঙ্খিত ব্রিজ। সত্যিই অসাধারণ সৌন্দর্যে ঘেরা সর্পিল আসামবস্তি ব্রিজ। মাথার ওপরে নীল আসমান। ডানে-বামে কাপ্তাই লেকের টলটলে পানি। সামনে তাকালে এঁকে বেঁকে যাওয়া ব্রিজটি চলে গেছে বহুদূর। তপ্ত রোদেও ঘন্টার পর ঘন্টা বিমুগ্ধ নয়নে ব্রিজের রেলিং ধরে তাকিয়ে থাকা যাবে লেকের জলে। ১৯৫৬ সালে কর্ণফুলী নদীর উপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এটি একটি কৃত্রিম হ্রদ। বর্তমানে এই হ্রদ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অন্যতম দর্শনিয় স্থান। অথচ এর পেছনের ইতিহাস অত্যন্ত করুণ। বাঁধটি নির্মাণকালে রাঙ্গামাটি জেলার প্রায় ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি পানিতে ডুবে সৃষ্টি হয় হ্রদ। বাদ যায়নি রাঙ্গামাটির রাজার রাজ বাড়িটিও। একরাতের মধ্যেই বহু বসত বাড়ি পানির তোড়ে বিলীন হয়ে গিয়েছিলো। সব সুন্দরের পেছনের ইতিহাস হয়ত অনেকটা এরকমই হয় থাকে। বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানব সৃষ্ট হ্রদ। এর গভীরতা ১০০ ফুট হতে কোথাও কোথাও প্রায় ১৭৫ ফুট পর্যন্ত। সবুজের সঙ্গে মিতালী করা কাপ্তাই লেকের আয়তন ৪,২৯৪ বর্গমাইল। এই লেকের মাছ বেশ সুস্বাদু। রাঙ্গামাটির স্থানীয় বাসিন্দা সহ ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকদের রসনা মিটানোর পাশাপাশি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ হয়ে থাকে। বিশেষ করে রুই ও চাপিলা মাছের জুড়ি মেলা ভার।
যাই এবার দুপুরের আহারটা রেষ্টুরেন্টে সেরে নিই। বেশ মজা করে খেয়েদেয়ে নামমাত্র বিশ্রাম নিয়ে ছুটলাম এবার শীলছড়ি। কাপ্তাই বাজার থেকে সড়কের রোমাঞ্চকর বাঁকগুলো পেরিয়ে মাত্র ২৫ মিনিটেই হাজির হই কর্ণফুলী নদীর তীরে লুসাই পাহাড়ের সন্নিকটে, শীলছড়ি ৩৫ আনসার ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পের মূল ফটকে। জবিয়ান বন্ধু ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সেলিম স্বশরীরে এসে অভ্যর্থনা জানায়।যারপরনাই আন্দোলিত হই। গেস্টরুমে গিয়ে তার সঙ্গে ক্যাম্পাসের সোনালী অতিতের স্মৃতিচারণ। এরইমধ্যে মৌসুমি নানান ফল আর শরবতের গ্লাস দিয়ে ডাইনিং সয়লাব। এত কিছু সব খেতে গেলে সুন্দর বিকালটাই হারিয়ে যাবে। সেই ভয়ে সেলিমকে তাড়া দিতেই,আমাদেরকে নিয়ে গেলো কর্ণফুলীর কূলে। জায়গাটা এত বেশি নয়নাভিরাম ও পরিচ্ছন্ন,প্রথম দেখাতে মনেই হবেনা যে এটা আমাদের দেশ। সারি সারি পাম গাছ সহ নানান প্রজাতির বৃক্ষরাজি। দৃষ্টির সীমায় মাথা উঁচু করে আছে লুসাই পাহাড়। সবুজের গালিচা দিয়ে মোড়ানো। সেই পাহাড়ে বসবাস করে নানান ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী। পাহাড়ি নদীর বয়ে চলা পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। ঝিরঝির বাতাসের দোল। জুম ঘরের আদলে তৈরী ছাউনিতে বসে চা’য়ের আড্ডা,সব মিলিয়ে সুন্দর একটি বিকেলের সাক্ষী হই। সময়ের পরিক্রমায় লাল টকটকে সূর্যটা লুসাইর বুকে থাকা গহীন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে,আমরাও ওইদিনের স্মরণীয় একটা ভ্রমণের ইতি টেনে বিশ্রামাগারে ফিরি।
পরদিন সকালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক আসাদুজ্জামান আকন সাহেবের কল্যাণে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি মিলে। ঢুকেই ভেতরটা ঘুরে ঘুরে দেখি। চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। সবুজ মাঠ ও গাছগাছালিতে ঠাসা। কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোতে ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে। চোখের তৃপ্তিতে মনও ফুরফুরে। হাঁটতে হাঁটতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে এসে হাজির। পাশাপাশি দুটো ভবন। স্কুলটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৫৪ সাল। এর পুরানা ভবনে আশির দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত, দর্শকদের হৃদয় নাড়ানো শিশুতোষ চলচিত্র ছুটির ঘন্টা ছবির স্যুটিং করা হয়েছিলো। বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মীত তখনকার সময় ছুটির ঘন্টা এতাটাই দর্শক প্রিয় হয়েছিলো,যা এই প্রজন্মের কাছেও গল্পের খোরাক। আরো সামনের দিকে আগানোর পর চোখে পড়ে পরিত্যাক্ত একটি ভবন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়,এটা একসময় সিনেমা হল ছিলো। ভাবুক মন বলে এরকমভাবে অযত্নে ফেলে রাখার চেয়ে, সংস্কার করে জনবান্ধব কোন বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেত। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাল ১৯৫৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শুরু করার পর শেষ হয় ১৯৬২ সালে। এর কার্যক্রম জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা। এটিই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। উক্ত কেন্দ্রে ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন ক্ষমতা সম্পন্ন জেনারেটর রয়েছে । এক মেগাওয়াট মানে দশ লক্ষ ওয়াট। যা দেশের বিদ্যুৎ চাহিদায় বেশ অবদান রাখছে। ভ্রমণ নির্মল বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষা লাভেরও উপর্যুক্ত মাধ্যম। যা জানার জ্ঞানভান্ডারকে সমবৃদ্ধ করে থাকে। বই পড়ে জ্ঞান আহরনের চেয়ে, ভ্রমণের মাধ্যমে জানার শক্তি বহুগুণ। পুরো পৃথিবীটাই একটা আদর্শ বই। যা ভ্রমণের দ্বারাই পাঠ করা সম্ভব।
ভ্রমণ তথ্য: যাদের সময় কম তারা রাতের বাসে গিয়ে সারাদিন ঘুরে, আবারো রাতের বাসে ফিরতে পারবেন। আর যারা থাকতে ইচ্ছুক,তাদের জন্যও রাত্রীযাপনের খোঁজখবর দেয়া রয়েছে।
যাতায়াত: জেলা রাঙ্গামাটি কিন্তু ঢাকার বিভিন্ন বাস টার্মিনাল হতে দিনে-রাতে বিভিন্ন পরিবহনের সার্ভিস সরাসরি কাপ্তাই যাতায়াত করে। সুতরাং রাঙ্গামাটি যাবার দরকার নাই।
থাকা-খাওয়া: সরকারি বিশ্রামাগার,ডাকবাংলো সহ বেসরকারি বিভিন্ন মানের হোটেল,রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। খাবারের জন্য প্রচুর রেস্টুরেন্টও রয়েছে।
উল্লেখ্য সরকারি বিশ্রামাগারে থাকা-খাওয়ার জন্য পূর্বানুমতি নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
ছবির ছৈয়াল: দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
লেখক: মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম
- ১দু:সহ মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির বার্ষিকী আজ
- ২সৌদি আরবের ওপর হুথি গোষ্ঠির সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা জারি
- ৩দেশের ১৯ অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস
- ৪চাঁদপুরে ইলিশের আকাল, কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ দল
- ৫রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে
- ৬জিয়াউল আহসানের বাড়িতে দুদকের অভিযান শেষ, মালামাল জব্দ
- ৭কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন, আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ
- ৮জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ২.২ শতাংশ, বড় পতন শিল্প ও সেবাখাতে
- ৯পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন বেড়েছে ৯০ শতাংশ
- ১০‘লুটপাটে সহায়তাকারী’ আইএফআইসির এমডি মনসুর মোস্তফা বহাল তবিয়তে
- ১রণক্ষেত্র দিল্লি: ভারতের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় আন্দোলনের’ ডাক সিজেপির
- ২মতিগঞ্জে টর্নেডোয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে আর্থিক অনুদান প্রদান
- ৩কেশবপুরে দুই দিনব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত
- ৪সাতক্ষীরায় বিলে মৎস্য ঘের থেকে গাড়িচালকের মরদেহ উদ্ধার
- ৫মেসি নয়, সেরা খেলোয়ারের পুরস্কার জিতলেন রদ্রি
- ৬সারাদেশে ফ্যামিলি কার্ড সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
- ৭কমলগঞ্জে মনিপুরি গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
- ৮প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হলেন রাশেদ খাঁন
- ৯প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আইএলও মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ, সহযোগিতা জোরদারের আশ্বাস
- ১০রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মঘণ্টা ও করের টাকার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে





পাঠকের মতামত