গিয়াস উদ্দিন, সম্পাদক
প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬ ১০:১৩ এএম

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি ও উন্নয়ন সাংবাদিকতার অন্যতম দৈনিক বাণিজ্য প্রতিদিন পাঁচ বছর অতিক্রম করে ষষ্ঠ বছরে পদার্পণ করেছে। সময়ের নানা চ্যালেঞ্জ, অর্থনীতির উত্থান-পতন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যেও পাঠকের আস্থা নিয়ে এগিয়ে চলার এই যাত্রা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এই পথচলায় পাঠকের বিশ্বাস, ব্যবসায়ী সমাজের সহযোগিতা এবং বস্তুনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সাংবাদিকতার প্রতিশ্রুতিই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। এবারের প্রতিপাদ্য “নির্ভরতায় আগামীর যাত্রা” শুধু একটি স্লোগান নয়; বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলোর একটি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতির চাপ ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতে অনিয়ম, পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা, এসএমই খাতে সহজে অর্থায়ন না পাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ অর্থনীতিকে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো এখনও পুরোপুরি বিপর্যস্ত না হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট।

বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে দিয়েছে। আয় বাড়ার তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা চাপে পড়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, সরবরাহ সংকট এবং অসাধু সিন্ডিকেটের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি এনে দেয়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

একইভাবে ব্যাংক খাতও নানা চ্যালেঞ্জে বিপর্যস্ত। খেলাপি ঋণের লাগামহীন বিস্তার, আর্থিক অনিয়ম এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের দুর্বল ব্যবস্থাপনা সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সুশাসন, কঠোর নজরদারি এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ সচল রাখতে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য ব্যাংক ব্যবস্থা অপরিহার্য। অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে হলে কেবল নীতিগত ঘোষণা নয়, কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন।

এদিকে, পুঁজিবাজার দেশের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, গত প্রায় দুই বছর ধরে দেশের পুঁজিবাজার থেকে শিল্প খাতে কোনো মূলধন সংগ্রহ হয়নি। অর্থাৎ যে বাজার শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস হওয়ার কথা, সেই বাজারই আজ আস্থাহীনতা ও অস্থিরতার চক্রে আটকে পড়েছে। নীতির অসামঞ্জস্য, কারসাজির অভিযোগ, দুর্বল তদারকি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ বাজারকে বারবার অস্থিতিশীল করে তুলছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ বিনিয়োগকারীরা, যারা প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন। একটি সুস্থ পুঁজিবাজার শুধু শেয়ারের দাম বাড়া-কমার বিষয় নয়; এটি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে টেকসই বিনিয়োগ প্রবাহ নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোতে শিল্পায়নের বড় অংশই পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অথচ বাংলাদেশে এখনও ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতির কারণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বিকল্প উৎস পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। এই বাস্তবতায় পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বাজারে কারসাজি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে উৎসাহ প্রদান এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর নীতি গ্রহণ ছাড়া আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কারণ আস্থাহীন পুঁজিবাজার কখনও শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি হতে পারে না।

অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা দেশের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের বড় চালিকাশক্তি। এখনও সহজ অর্থায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় তাদের। এসএমই খাতে ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, উচ্চ সুদ এবং জামানত সংকট অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নীতিগত প্রণোদনা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি তৈরি হতে পারে। কারণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রগুলোর একটি এই এসএমই খাত। তাই এসএমই অর্থায়ন সহজ করা এখন কেবল অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়।

বর্তমানে কর্মসংস্থানও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, স্টার্টআপ, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং রপ্তানিমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। আমরা মনে করি দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন।

তবে আশার জায়গাও রয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এখনও দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং ভোগব্যয় টিকিয়ে রাখতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একইসঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।

এই বাস্তবতায় “নির্ভরতায় আগামীর যাত্রা” কেবল একটি প্রতিপাদ্য নয়; এটি আস্থা ফিরিয়ে আনার এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক আহ্বান। অর্থনীতির প্রতিটি খাতে যদি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়, তবে বর্তমান সংকট অতিক্রম করে বাংলাদেশ আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারবে।

ষষ্ঠ বছরে পদার্পণের এই মুহূর্তে বাণিজ্য প্রতিদিন-এর প্রত্যাশা দেশের অর্থনীতি নির্ভরতা, আস্থা ও সম্ভাবনার শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাবে। কারণ আগামীর যাত্রা কখনও একা সম্ভব নয়; তা গড়ে ওঠে বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং সম্মিলিত অঙ্গীকারের ভিত্তিতে।

বাণিজ্য প্রতিদিন-এর এই শুভক্ষণে পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ী ও সকল শুভাকাঙ্ক্ষীকে অন্তরের অন্তরস্থল থেকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা। আপনাদের আস্থা, ভালোবাসা ও সহযোগিতাই আমাদের এগিয়ে চলার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। “নির্ভরতায় আগামীর যাত্রা” প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে আগামীতেও পাশে থাকার ও পাশে রাখার প্রত্যাশা করছি।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাজেটের প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করছে সফল বাস্তবানের ওপর: অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, গত দেড়-দুই মাসের পরিশ্রমে প্রণীত সাম্প্রতিক বাজেটটি দেশের সর্বস্তরের ...

অনলাইনে রিটার্ন দাখিল ৪৭ লাখ

২০২৫-২০২৬ করবর্ষে রেকর্ড প্রায় ৪৭ লাখ করদাতা ই-রিটার্ন সিস্টেমের মাধ্যমে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। ...

শ্রীপুরে জলাবদ্ধতা নিরসনে নিজ অর্থায়নে স্থানীয়দের ড্রেন নির্মাণ

গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রায় দুই যুগের দুর্ভোগ জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বপ্রণোদিত হয়ে ড্রেন নির্মাণ করছে স্থানীয় বাসিন্দারা। ...