জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬ ১২:২৬ পিএম

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কাথরিয়া ইউনিয়নের মধ্যম মানিক পাঠান গ্রামে বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামছে। কিন্তু পানি সরে গিয়ে যা দেখাচ্ছে, তা আরও কষ্টের। ধসে পড়া মাটির দেয়াল, নরম হয়ে যাওয়া ঘরের গোড়া, ডুবে যাওয়া বীজাগার- এই ক্ষতচিহ্নগুলো বলছে, পানি গেলে জীবন স্বাভাবিক হয় না।

মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৫ জুলাই শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ বন্যাকবলিত হয়। ৬ জুলাই থেকে বাহারছড়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, খানখানাবাদ, গণ্ডামারা, কাথরিয়া, বৈলছড়ি ও ছনুয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। মানিক পাঠান সেই ভয়াবহতার একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র।

একই গ্রামের উলা মিয়া (৪৮) বন্যার সময় ছেলেমেয়েদের নিয়ে তিন কিলোমিটার দূরে বৈলছড়ি ইউনিয়নে শ্বশুরের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পানি নামার খবরে নিজের বাড়ি দেখতে এসেছেন। দেখে মন ভারী হয়ে গেছে।

উলা মিয়া ও তার ভাই আহমদ নবীসহ ছয় ভাইয়ের পরিবার থাকে একটি লম্বা একচালা বাড়িতে। বন্যার পানিতে মাটির দেয়ালের গোড়া এতটাই নরম হয়ে গেছে যে যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে। ভেতরে ঢোকার সাহস হচ্ছে না কারও। বিদ্যুৎ অফিসের কর্মীরা এসে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গেছেন দুর্ঘটনা এড়াতে। উলা মিয়া ও আহমদ নবী বললেন, “আতঙ্কে ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারছি না।”

পারভিন আক্তার (৪২)-এর অবস্থা আরও করুণ। টিন ও মাটির তৈরি তার ছোট্ট ঘরে বন্যার পানি ঢুকে দেয়াল ধসিয়ে দিয়েছে। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে পাঁচ দিন বড় ভাইয়ের পাকা বাড়িতে আশ্রয় ছিলেন। পানি কমলেও নিজের ভিটায় ফেরার পরিস্থিতি নেই। যে ঘরে ফিরবেন, সেই ঘর আর নেই।

ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মিনু বানু রায়ের ৭০ বছরের পুরনো মাটির ঘরটি এবারের বন্যায় পুরোপুরি ধসে পড়েছে। জীবনে বহু ঝড়-জলোচ্ছ্বাস দেখলেও এমন ভয়াবহ বন্যা আগে দেখেননি বলে জানান তিনি। স্বামীকে হারানোর পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে এ ঘরেই ছিল তার ছোট্ট সংসার। এখন সেই ঘরের জায়গাজুড়ে কাদা আর ভাঙা মাটির স্তূপ। প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তার।

বন্যায় পৈতৃক মাটির ঘর হারিয়ে বৃদ্ধ মাকে নিয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন একই ইউনিয়নের আলমগীর হোসেন। এনজিও ও ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের টাকায় কেনা তিনটি গরুর একটি অসুস্থ। ঘর পুনর্নিমাণ, ঋণের কিস্তি ও সংসার চালানো নিয়ে চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

বসত বাড়ির পাশাপাশি কৃষিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। মানিক পাঠান গ্রামে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সীড ভিলেজ বা বীজাগার পুরোপুরি ডুবে গেছে। প্রকল্পের সাইনবোর্ড পর্যন্ত পানির নিচে চলে গিয়েছিল। বীজাগার ডুবে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের আগামী মৌসুম নিয়ে চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বন্যার পানি নামছে। কিন্তু মানিক পাঠানের মানুষ জানেন না, পানি গেলেই কি সব ঠিক হয়ে যায়? ধসে পড়া ঘর আবার দাঁড়াতে সময় লাগে। বীজাগারের ক্ষতি পোষাতে লাগে আরেকটি মৌসুম। দুর্গত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়েছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। অনেক গ্রামে এখনো সড়কপথে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘বৃষ্টি বন্ধ হওয়ায় বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাঁশখালীর পরিস্থিতিও দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। তবে উপজেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঘরবাড়ি মাটির তৈরি হওয়ায় পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো একে একে ধসে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব ঘরের মূল্যায়ন (অ্যাসেসমেন্ট) শুরু করেছি। সুপেয় পানির সংকট মোকাবেলায় আপাতত পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ করা হচ্ছে।’

টিআর

শেয়ার

পাঠকের মতামত

পারিবারিক বিরোধের জেরে তায়েবাকে হত্যার অভিযোগ, ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুরে আলোচিত শিশু তায়েবা হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক বছর পর মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর ...

সাতক্ষীরায় দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ক রচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা

দুর্নীতি বিরোধী শপথের প্রদীপ্ত স্বাক্ষরে নতুন সূর্য শিখা জ্বলবেই এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গণসচেতনতা সৃষ্টি ...