রায়হানুল ইসলাম আকন্দ
প্রকাশিত: আগস্ট ৭, ২০২৬ ৪:৩৯ পিএম

কাঠালের রাজধানী গাজীপুরে প্রতি মৌসুমে হাজার হাজার টন কাঁঠাল গাছেই পঁচে গলে নষ্ট হয়। ভরা মৌসুমে গাছ পাকা কাঁঠালে সয়লাব হয়ে থাকে বাগান ও স্থানীয় বাজারগুলো। এসময় কাঁঠালের দামও কম থাকে। পুষ্টি সমৃদ্ধ জাতীয় এ ফলটি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকায় এ কাঁঠালের পঁচনরোধ করা সম্ভব হয় না। স্থানীয় বাগান মালিকদের এমন অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে।

তবে সেই চেনা গল্পটা এবার বদলে দিয়েছেন গাজীপুরে শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া। অপচয়রোধ আর কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহারের চিন্তা থেকে “কাঁঠাল বিস্কুট” উৎপাদন ও বাজারজাত করে পেয়েছেন সাফল্য। আর তার কারখানায় কাজ করছে খাদ্য উৎপাদনে অভিজ্ঞ কর্মীদল।

এদিকে “কাঁঠাল বিস্কুট” উৎপাদনের খবরে স্থানীয় কাঁঠাল বাগান মালিকেরা জাতীয় এ ফল চাষ থেকে আশার আলো দেখছেন। কাঁঠালের উপযুক্ত বাজারমূল্য পাওয়ার আশাও করছেন তারা।

বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, গাজীপুর জেলায় যে পরিমান কাঁঠাল উৎপন্ন হয় তার সিংহভাগ আসে শ্রীপুর উপজেলা থেকে। এই উপজেলায় যার জমি আছে তার কাঁঠাল গাছ নেই এমনটি খোঁজে পাওয়া যাবে না। গাজীপুরে প্রতি বছর ৯ হাজার ১’শ হেক্টরের বেশি জমিতে কাঁঠাল উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে শ্রীপুর উপজেলায় উৎপন্ন হয় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি। শ্রীপুরের উঁচু লাল মাটির কারণে এখানকার কাঁঠাল সুস্বাদু, সুমিষ্ট এবং মানসম্মত।

বৈশাখ থেকে ভাদ্র বছর ঘুরে এই সময়টাতে গাজীপুরের গাছে গাছে শোভা পায় জাতীয় ফল কাঁঠাল। তবে সঠিক সংরক্ষণ ও বিপণনের অভাবে প্রতি বছরই বাগানে পঁচে নষ্ট হয় টনকে টন জাতীয় এই ফল। আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া প্রযুক্তি ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কাঁঠালের রসে তৈরী করছেন বিস্কুট, যা ফলের পুষ্টি ও স্বাদ দুটোই ধরে রাখছে। কোনো কৃত্রিম ফ্লেভার ছাড়াই তৈরী এই কাঁঠালের বিস্কুট বাজারে আসতেই অনলাইনে তৈরী হয়েছে ব্যাপক চাহিদা। নতুন ধরণের এই বিস্কুট নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে দারুন কৌতূহল।

কারখানায় কাঁঠাল বিস্কুট উৎপাদনে নিয়োজিত প্রধান কারিগর মানিক মিয়া বলেন, পাকা কাঁঠাল থেকে কোষ বের করে ব্লেন্ডার করা হয়। পরে সম্পুর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে কোনো প্রকার ক্যামিকেল ছাড়াই মিক্সার মেশিনে দেওয়া কাঁঠালের রসের সাথে ঘি, বাটার, দুধ, ময়দা ও অন্যান্য উপকরণ একসাথে মিক্সার করা হয়। এসব উপকরণে মিক্সার হয়ে মন্ড তৈরী হয়ে গেলে টেবিলে উঠিয়ে ডাইস দিয়ে কেটে বিস্কুট তৈরি করে ট্রেতে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। একটি ট্রেতে ৩৬পিছ বিস্কুট দেওয়া যায়। এরকমভাবে একটি ট্রলিতে ৩৬টি ট্রে একসাথে রেখে তারপর ওভেনে ঢুকানো হয়। পরে ২৫ মিনিট পর বিস্কুট ওভেন থেকে বের করা হয়। গরম কমে গেলে বা ঠান্ডা হলে বক্স করা শেষে বাজারজাত করা হয়। একটি বক্সে ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট দেওয়া থাকে।

স্ট্যাড ফাস্ট কুরিয়ার কর্মী রাকিব বলেন, দুই মাস যাবত কাঁঠালের অনলাইনের অর্ডারগুলো মোমতাহিনা ফুড এন্ড অয়েল মিলস্’র ‘মেহমান ফুড’ থেকে নিয়ে যাচ্ছি। দিনে দিনে অর্ডার বাড়ছে। একবার যিনি অর্ডার দিচ্ছেন নতুন ভোক্তার পাশাপাশি পুরনো ভোক্তা আবারও অর্ডার করছেন। কখনো কখনো দিনে একাধিকবার অর্ডার নিয়ে যেতে হচ্ছে। ভোক্তার কাছে বেশ সাড়া পাচ্ছে “কাঁঠালের বিস্কুট”।

কাঁঠালচাষী নজরুল ইসলাম বলেন, শ্রীপুর তথা গাজীপুরে প্রতি মৌসুমে হাজার হাজার টাকার কাঁঠাল সঠিক সংরক্ষণের অভাবে পঁচে গলে নষ্ট হয়। এগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ না থাকায় বাগানের ফল বাগানেই পঁচে গলে নষ্ট হয়। প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে তা বাজারজাত করলে আমাদের মতো অনেক চাষী অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।

উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া বলেন, আমি দেশের বাইরে বিশেষ করে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান ভ্রমণ করেছি। সেসব দেশে দেখতে পেয়েছি কাঁঠাল দিয়ে কিভাবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উপাদান তারা বাজারজাত করছে। তা থেকেই মূলত: আমি কাঁঠালের বিস্কুট তৈরীর সিদ্ধান্ত নেই। ভবিষ্যতে কাঁঠালের চিপসসহ আরও খাদ্রপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার যদি নতুন এসব খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণে ভ্যাট ও টেক্স মওকূফ করে তাহলে ভোক্তার দোড়গোড়ায় সুলভ মুল্যে তা পৌঁছানো সম্ভব।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গাজীপুরের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল উৎপাদন হয় এবং প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল অপচয় হয়ে থাকে। কাঁঠালের অপচয় রোধে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরির কোনো বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ’ ইতোমধ্যেই প্রায় ২০টিরও অধিক প্রযুক্তি এবং উপকরণ উদ্ভাবন করেছে। এগুলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশব্যাপী বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু উদ্যোক্তা কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরি করে এগুলো বিক্রিও করছেন।

তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুরের এক উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া কাঁঠাল থেকে বিস্কুট তৈরি করেছেন, যা খুবই আশাব্যঞ্জক। এ ধরনের প্রযুক্তি বিশেষ করে কাঁঠালের বীজ, কাঁচা কাঁঠাল এবং পাকা কাঁঠাল শুকিয়ে যে পাউডার তৈরি করা যায় এতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিগুণ রয়েছে। বিশেষ করে প্রোটিন, মিনারেলস, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার— আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। কাঁঠালের এই পাউডারগুলি যদি আমরা আটা বা ময়দার সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিক্সড করে পাপড়, বিভিন্ন কুকিজ যেমন: বিস্কুট, কেক, ক্যান্ডি, আইসক্রিম এবং পাকা কাঁঠালের পাল্প দিয়েও একইভাবে বিস্কুট ও কেকসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য তৈরি করা যায়। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিগুণ রয়েছে। এগুলো বিক্রির মাধ্যমে আমাদের কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব। আমাদের যারা উদ্যোক্তা তারা বিক্রি করে যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হবেন তেমনই পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। কাঁঠালের যে অপচয়, সে অপচয় রোধেও সহায়তা করবে।

টিআর

শেয়ার

পাঠকের মতামত

প্রতিমন্ত্রী টুকু সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ, অপ-সাংবাদিকতা পরিহার করতে হবে

অপ-সাংবাদিকতা রোধে প্রকৃত সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সদস্য ও ...

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রেখে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে

স্থানীয় বিএনপির নেতারা তৃণমূল সংগঠনকে আরও সুসংগঠিত, শক্তিশালী ও জনমুখী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ...

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ১৫ আগস্ট ৭৫ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর হাতে অবসর সুবিধার টাকা

দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের। ২০২২ সালের পর অবসরে ...