
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সরকারের ঋণ গ্রহণের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক–এর সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাজেট–ঘাটতি মেটাতে সরকার এই সময়ে আর্থিক খাত থেকে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা এসেছে ব্যাংক খাত থেকে, আর বাকি ৭ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ প্রায় চার গুণ বেড়ে গেছে।
এই ঋণ প্রবণতা কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়; এটি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা ও নীতিনির্ধারণী চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত বহন করে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক খাত থেকে এবং ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—প্রথম সাত মাসেই মোট লক্ষ্যমাত্রার ৫৮ শতাংশের বেশি ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে, আর ব্যাংক খাতের ক্ষেত্রে তা ৬২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। গত সাত মাসের এই ঋণের পুরোটাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া। গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। দায়িত্বের শুরু থেকেই অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে নতুন সরকার।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—কেন সরকার এত দ্রুত এবং এত বড় পরিমাণে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে? এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের কর–জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে কম, যা সরকারের নিজস্ব আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হচ্ছে, যার সহজলভ্য উৎস হচ্ছে ব্যাংকিং খাত।
অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ প্রত্যাশিত না হওয়াও এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল–এর ঋণের কিস্তি ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করেছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে এই ঋণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নে বিলম্ব হলে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর চাপ বাড়ে—যার সরাসরি প্রতিফলন আমরা ব্যাংক ঋণের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে দেখতে পাচ্ছি।
তবে এই প্রবণতার অর্থনৈতিক প্রভাব গভীর এবং বহুমাত্রিক। প্রথমত, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ “crowding out” প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ, ব্যাংকের সীমিত তহবিলের একটি বড় অংশ সরকার নিয়ে নিলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে যেখানে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি, সেখানে এই প্রবণতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সুদের হারের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। ব্যাংকগুলো যখন সরকারের ঋণ চাহিদা মেটাতে বেশি অর্থ বরাদ্দ করে, তখন তারা ঝুঁকি ও তারল্য বিবেচনায় সুদের হার বাড়াতে পারে। এর ফলে বেসরকারি খাতের ঋণ ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণের জন্য ভোগ্য ঋণও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইতোমধ্যেই খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, সুশাসনের ঘাটতি এবং মূলধন সংকট বিদ্যমান। এই অবস্থায় সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে এই খাত থেকে ২৪ হাজার ৬১২ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেখানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৭২৪ কোটি টাকায়। সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সংগ্রহ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে—মাত্র ৬১০ কোটি টাকা। এর পেছনে সুদের হার হ্রাস, কঠোর শর্ত এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, যা আবার বাজেট ঘাটতিকে আরও বিস্তৃত করছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা দেশের রপ্তানি খাতকেও প্রভাবিত করছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করা এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা। শুধুমাত্র ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে বাজেট ঘাটতি পূরণ করা কোনোভাবেই টেকসই সমাধান নয়। বরং এটি অর্থনীতিকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ চক্রে আবদ্ধ করতে পারে, যেখানে ঋণ বাড়বে, সুদের চাপ বাড়বে এবং বিনিয়োগ কমে যাবে।
সমাধানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন রাজস্ব ব্যবস্থার গভীর সংস্কার। করের আওতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা চালুর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক অর্থায়নের প্রবাহ নিশ্চিত করতে উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। আইএমএফসহ অন্যান্য সংস্থার শর্ত পূরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, ব্যাংকবহির্ভূত উৎসগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। সঞ্চয়পত্রে আকর্ষণীয় সুদহার ও সহজ শর্ত প্রদান করলে সাধারণ মানুষ আবার এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।
চতুর্থত, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণ একটি তাৎক্ষণিক সমাধান হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন সুপরিকল্পিত নীতি, বাস্তবসম্মত সংস্কার এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। অন্যথায় এই ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যতে অর্থনীতিকে একটি গভীর সংকটে ঠেলে দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।
এটি লেখকের নিজস্ব মতামত
লেখক : মো. সহিদুল ইসলাম সুমন, অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com
- ১মার্জিন বিধিমালার খসড়া সংশোধনী প্রকাশ, মতামত আহ্বান
- ২চুয়াডাঙ্গায় মরিয়ম ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড
- ৩রণক্ষেত্র দিল্লি: ভারতের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় আন্দোলনের’ ডাক সিজেপির
- ৪মাগুরায় শিশু ধর্ষণ চেষ্টা ও হত্যার দায়ে একজনের মৃত্যুদণ্ড
- ৫ব্লক মার্কেটে লেনদেন ১৮ কোটি টাকার
- ৬গাজীপুরে ২ সন্তানের জননীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ যুবকের বিরুদ্ধে
- ৭বিজিবিকে আরও শক্তিশালী করতে জনবল-প্রযুক্তি-অস্ত্র বাড়ানো হবে
- ৮দর পতনের শীর্ষে প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স
- ৯দর বৃদ্ধির শীর্ষে এল আর গ্লোবাল বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড
- ১০ঝুঁকিতে চাঁদপুর মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প
- ১বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে ৫ বছর মেয়াদি নতুন কর্মপরিকল্পনা
- ২জুলাইয়ের ১৮ দিনে এলো ১৮০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স
- ৩চাঁদপুরে এক কালভার্ট বদলে দেবে ৮ গ্রামের মানুষের জীবন
- ৪মে মাসে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় ধাক্কা
- ৫টাঙ্গাইলে আদিবাসী যুবকের মরদেহ উদ্ধার
- ৬সাতক্ষীরা সীমান্তে প্রায় পঁচিশ লক্ষ টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ
- ৭মোস্ট সাসটেইনেবল কোম্পানি অব দ্য ইয়ার পুরস্কার জিতেছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ
- ৮কেশবপুরে দুই দিনব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত
- ৯প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আইএলও মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ, সহযোগিতা জোরদারের আশ্বাস
- ১০রেমিট্যান্স আহরণে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাইলফলক অর্জন





পাঠকের মতামত