
আমাদের ব্যাংক খাত দীর্ঘ দিন ধরে বড় বড় ঋণখেলাপীদের কবলে পড়ে ক্ষতবিক্ষত। একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারী, পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ব্যাংক দখলের খবর দেশের সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিবিদদের হতাশ করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান যে ভয়াবহ নতুন বার্তার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা কেবল অর্থনীতির নীতিনির্ধারকদেরই নয়, সাধারণ নাগরিক সমাজকেও গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলবে। ব্যাংক খাতে এবার শুধু ‘হাঙর-বোয়াল’ জাতীয় বড় ঋণগ্রহীতারা নয়, চরম সংকটের মুখে পড়ে খেলাপি হয়ে উঠছেন ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষক এবং সাধারণ খুচরা গ্রহীতারাও। এক কোটি টাকা পর্যন্ত পরিমাণের ছোট ঋণে খেলাপির সংখ্যা গত এক বছরে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার খবর সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার এক জ্বলন্ত দলিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তথ্যমতে, গত মার্চ শেষে দেশে এক কোটি টাকার কম ঋণ আছে—এমন খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৫ জনে। অথচ ঠিক এক বছর আগে, অর্থাৎ আগের বছরের মার্চে এই সংখ্যাটি ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৩। মাত্র ৩৬৫ দিনের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে ক্ষুদ্র ও সাধারণ খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যায় যোগ হয়েছেন প্রায় ২৪ লাখ মানুষ! ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, যার অন্তত ১৫ শতাংশই ইতোমধ্যে খেলাপির খাতায় নাম লিখিয়েছে। এই হার ও সংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি খুচরা ও প্রান্তিক ঋণের মানের যে কতটা ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে, তাকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।
প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং কৃষি খাত এতদিন ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে এসেছে, সেখানে কেন এমন করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো? এর উত্তর পাওয়া খুব কঠিন নয়। দীর্ঘদিন ধরে ধরে রাখা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা, নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ যাবতীয় পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা একদম তলানিতে ঠেকেছে। পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সাধারণ চাকরিজীবী থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসায়ী—সবাই আজ নাভিশ্বাস তুলছেন। তাদের পক্ষে ঋণের কিস্তি শোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক খাত যখন আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে দেশের তৃণমূলের এই বিপর্যয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ব্যাংক খাতের বিভিন্ন খাতওয়ারি তথ্যের দিকে তাকালে সার্বিক অর্থনীতির পচনের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। বর্তমানে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যার সার্বিক খেলাপির হার ৩২.৭ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগই এখন খেলাপির খাতায় জমা পড়ে আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশে, যা মোট ব্যাংকিং ঋণের বড় একটি অংশ দখল করে আছে। শিল্প খাতে খেলাপির হার প্রায় ৩২ শতাংশ। আর অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম কারিগর সিএমএসএমই খাতে খেলাপির হার পৌঁছেছে ৩৪ শতাংশে। এর মধ্যে কুটির (কটেজ) শিল্প খাতে খেলাপির হার অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ৫৩ শতাংশে ঠেকেছে, যা স্পষ্ট নির্দেশ করে আমাদের ক্ষুদ্র উৎপাদকেরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
একইভাবে আবাসন ও নির্মাণ খাতে খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতের ঋণে খেলাপির হার বেড়ে ৩০ শতাংশ ছুঁয়েছে। এমনকি ভোক্তা ঋণের ক্ষেত্রেও খেলাপির চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। যদিও সরকারি বা বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর কোনো কোনোটিতে কৌশলগত কারণে গ্রাহক সংখ্যা কমার তথ্য দেখা যাচ্ছে (যেমন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে খেলাপি গ্রাহক ২৪ লাখ থেকে কমে ২০ লাখে নেমেছে), তবু তাদের মোট ঋণের ৩৮ শতাংশই খেলাপি। আগেকার মওকুফ করা কৃষিঋণের টাকা সময়মতো সরকারের কাছ থেকে না পাওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা তো আছেই, তার সাথে যোগ হয়েছে কৃষকের নিজস্ব ঋণ পরিশোধ ক্ষমতার চরম অবনতি।
এদিকে বড় আকারের ঋণের খেলাপিচিত্র বরাবরের মতোই কদাকার। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের শ্রেণিতে বিতরণকৃত প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সাড়ে ৪২ শতাংশই খেলাপি। এক বছরে এই শ্রেণির খেলাপির সংখ্যা ১,৪৭৮ থেকে বেড়ে ২,০৩৫ হয়েছে। ১ থেকে ১০ কোটি টাকা, ১০ থেকে ২০ কোটি টাকা, এবং ২০ থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপে খেলাপির হার ২৬ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। বড় গ্রাহকদের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংস্কৃতি বহু বছর ধরে চলমান থাকলেও, এখন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র গ্রাহকদের লাচার হয়ে খেলাপি হওয়া প্রমাণ করে যে দেশের অর্থনীতি একটি সার্বিক সিস্টেমিক সংকটের মুখোমুখি।
ব্যাংক ব্যবস্থার এই পরিস্থিতি নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক নির্বাহীরা যে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন, তা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। নীতিনির্ধারকদের এটি উপলব্ধি করতে হবে যে, বড় খেলাপির কারণে ব্যাংকের সাময়িক আর্থিক ক্ষতি বা মূলধন ঘাটতি বেশি হলেও, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণের খেলাপি গ্রাহক সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়াটা একটি দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার গভীর ক্ষতের লক্ষণ। এর অর্থ হচ্ছে সাধারণ মানুষের আর্থিক সুরক্ষাবলয় ভেঙে পড়েছে, ছোট ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
এই অচলাবস্থা থেকে বের হতে হলে কেবল ব্যাংকের শাখা থেকে তদারকি জোরদার করা বা বিশেষ নীতিমালার চাদরে ঋণ নিয়মিত করার কৃত্রিম চেষ্টা চালালেই চলবে না। সমস্যার মূলে হাত দিতে হবে। প্রথমত, দেশে যে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ রয়েছে, তা কমানোর বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, এসএমই ও কৃষি খাতের প্রকৃত ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যাতে সংকটকালে সময়মতো নীতিগত ও অর্থায়নের সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। সুবিধাবাদীদের হাতে সুবিধা না দিয়ে যেসব উদ্যোক্তা মহামারীর পর থেকে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে পারছেন না, তাদের পুনর্গঠন বা ঘুরে দাঁড়ানোর পথ তৈরি করে দিতে হবে।
সর্বোপরি, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। অর্থনীতির চালিকাশক্তি যদি তৃণমূল পর্যায়ে অচল হয়ে পড়ে, তবে পুরো আর্থিক অবকাঠামো ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না। ব্যাংকিং খাতকে এই মারাত্মক সতর্কসংকেত থেকে রক্ষা করতে অবিলম্বে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করাই সময়ের দাবি।
লেখক : মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com
- ১অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র আমাদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র: তথ্যমন্ত্রী
- ২এবার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী বুঝে পেল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
- ৩জবির আইন ও ভূমি প্রশাসন অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রাব্বি-সম্পাদক মারুফ
- ৪চট্টগ্রাম বন্দরে তৃতীয় প্রান্তিকে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে নেতিবাচক প্রবণতা
- ৫অভিবাসন ব্যয় কমাতে কাজ করছে সরকার : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
- ৬ব্যাংক খাতে নতুন দুর্যোগ: ছোট ঋণেও আশঙ্কাজনক খেলাপি
- ৭ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮ক ধারা বিলুপ্ত হচ্ছে
- ৮জবিতে আইএমএলডিসির বার্ষিক বিতর্ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত
- ৯চাঁদপুরে ঘূর্ণিস্রোতে সাড়ে চার হাজার বস্তা সিমেন্টসহ ট্রলার ডুবি
- ১০শিবচরে মেজর ছেলের প্রভাব খাটিয়ে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ, মানববন্ধন
- ১চট্টগ্রাম বোর্ডে এসএসসির ফল বিপর্যয়, পাসের হার ৫৯.৪৮ শতাংশ
- ২৩ কোম্পানির লেনদেন সাময়িক স্থগিত
- ৩১২ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি ঘোষণা
- ৪মৌলভীবাজারে পুত্রবধূকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে শ্বশুর কারাগারে
- ৫এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল : চট্টগ্রামের ৮ বিদ্যালয়ের কেউই পাস করেনি
- ৬সৌদিতে সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত
- ৭এসএসসিতে কুড়িগ্রামের চার বিদ্যালয়ে পাসের খাতা শূন্য
- ৮এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে ৩.৯৯ শতাংশ
- ৯শেখ হাসিনা ও হাদির হত্যাকারীদের প্রত্যার্পনের অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ
- ১০চাঁদপুরে হাসপাতাল থেকে ইয়াবাসহ চিকিৎসক গ্রেপ্তার





পাঠকের মতামত