সাঈদ খোকনের পর ইসলামী ইন্সুরেন্সে নতুন দানব কে?

সিইও নিয়ে ইসলামী ইন্সুরেন্স-আইডিআরএ মুখোমুখি

রাশেদ রুবেল
প্রকাশিত: আগস্ট ২৭, ২০২৫ ৪:৫২ পিএম

মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়ে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। গত ২০ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আব্দুল খালেক মিয়াকে দায়িত্ব থেকে অপসারন করে নতুন ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে মো: মইনুল আহসান চৌধুরিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এদিকে, গতকাল (মঙ্গলবার) সিইও আব্দুল খালেক মিয়াকে দায়িত্ব থেকে অবৈধ ভাবে অপসারণের আবেদনটি না-মঞ্জুর করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।

জানা যায়, বেআইনি ভাবে ইস্তফা দিতে আবদুল খালেক মিয়ার বাসায় লোকজন পাঠিয়ে হুমকির বিষয়ে গত ১৯ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) আইডিআরএ চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন করেন আবদুল খালেক মিয়া। ইসলামী ইন্সুরেন্সের পাল্টা আবেদনে সিইও’র অপসারনের আবেদন করলে, তারই প্রেক্ষিতে ২৬শে আগস্ট (মঙ্গলবার) আইডিআরএ সিইও’কে চুক্তি অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনার আদেশ দেয়া হয়।

এর আগে ২০শে আগস্ট সিইও আবদুল খালেক মিয়াকে ইসলামী ইন্সুরেন্স থেকে অপসারন করে নতুন ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে মো: মইনুল আহসান চৌধুরিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে প্রতিষ্ঠানের ভিতরে বাহিরে প্রশ্ন উঠেছে, একসময় সাইদ খোকনের হাত ধরে নিয়োগ পাওয়া কোম্পানির সচিব চৌধুরী এহসানুল হক এখন নতুন করে কেন বিরোধে জড়াচ্ছেন। তার কারন কি আবারো লুটপাটের স্বর্গরাজ্য হতে চলেছে ইসলামী ইন্সুরেন্স এমন অভিযোগ বিমা সংশ্লিষ্টদের। তবে প্রশ্ন উঠেছে কে এই নতুন দানব ইসলামী ইন্সুরেন্সের?

এদিকে, আইডিআরএ বলছে ইসলামী ইন্সুরেন্স থেকে আবদুল খালেক মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং আবদুল খালেক মিয়ার পক্ষে ইসলামী ইন্সুরেন্স এর ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদসহ একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। উভয়ের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে আইডিআরএ ব্যাবস্থা গ্রহন করবে বলে জানান আইডিআরএ এর মূখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি। তবে কোম্পানির সিইওকে অপসারণে আইডিআরএ কোনো অনুমতি না নেয়ায় এবং যথাযথ আইন পালন না করায় তাকে পূর্নবহাল করা হলো বলে জানা যায়।

সিইও আব্দুল খালেক মিয়াকে অপসারণের বিষয় নিয়ে আইডিআরএ বরাবর চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, হঠাৎ করে অজ্ঞাত কারনে ১৭ই আগস্ট ২০২৫ ইসলামী ইন্সুরেন্সের ভাইস-চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ ও কোম্পানি সেক্রেটারি চৌধুরি এহসানুল হক তাকে বাসায় লোকজন পাঠিয়ে ইস্তফা দেয়ার জন্য চাপ দেয়। এমন কর্মকান্ডে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বরাবর তিনি তার পাওনাদি পরিশোধ ছাড়াই ইস্তফার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন। আবদুল খালেক মিয়ার অভিযোগ, নিয়োগের ১০ নম্বর শর্ত অনুযায়ী কোম্পানির পর্ষদ সভায় তাঁর চাকরির অবসানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা অবৈধ। এমন চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ। নিয়োগ চুক্তির ১০ ধারায় দুই মাসের নোটিশে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদানের কথা থাকলেও তা মান্য করা হয়নি।

তবে ইসলামী ইন্সুরেন্স এর ২৪৮তম সভার আলোকে চুক্তিপত্রের ১০ নং শর্ত অনুযায়ী আবদুল খালেক মিয়াকে অবসায়ন করার দাবি করা হয়। সেই দাবিকে নাকচ করে দিয়ে সিইও আবদুল খালেক মিয়া বলেন, চলতি বছরের ১৪ই আগস্টে তাদের বোর্ড সভাই অবৈধ। কারন সেখানে কোম্পানি আইনের নিয়ম মানা হয়নি। চেয়ারম্যান বোর্ড সভায় ছিলেন না এবং ইন্টারনাল অডিট কমিটির লোক রিগান এর স্ত্রী ব্যারিস্টার তানহা ও ফজলে করিম এর স্ত্রী আকিলা পারভিন এই বোর্ড সভায় থাকতে পারেন না। তা সম্পূর্ন অবৈধ হিসেবে গন্য করা হয়, কারন তাদের স্বামীগন ইসলামী ইন্সুরেন্সের ইন্টারনাল অডিট কমিটিতে আছে।

জানা যায়, ২০২৩ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর তিন বছরের জন্য আব্দুল খালেক ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশের সিইও পদে নিয়োগ পান। এখনো এক বছরের বেশি সময় এ পদে দায়িত্ব পালনের চুক্তি রয়েছে তার। এরইমধ্যে চলতি আগস্ট মাসের ১৯ তারিখ কোম্পানি সচিব চৌধুরী আহাসানুল হক সিইও আবদুল খালেকের বাসায় লোকজন গিয়ে ক্ষমতা দেখিয়ে তাকে ইস্তফা দেয়ার চাপ দেয়। এরই মধ্যে আবদুল খালেক মিয়ার অভিযোগের পর আইডিআরএরের চাপে সিইওকে ২০শে আগস্ট অবসায়ন করার পর, নতুন করে ২৫ আগস্ট তদন্ত পরিচালনার স্বার্থে বাধ্যতামূল ছুটিতে প্রেরন করার চিঠি ইস্যু করা হয়। লিখিত অবেদনে আরো জানা যায়, সিইও আবদুল খালেক মিয়া অসুস্থতার কারনে গত ১৪ আগস্ট থেকে ছুটিতে রয়েছেন।

তবে বীমা আইন ২০১০ এর ৮০(২) উপধারায় আইনে রয়েছে, বীমা কোম্পানির সিইও বা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইডিআরএ’র পূর্ব অনুমতি ছাড়া অপসারণ, চাকরিচ্যুত বা বরখাস্ত করা যাবে না। আবার সিইও এবং কোম্পানি বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির শুনানি ছাড়া আইডিআরএ অপসারণের অনুমতি দিতে পারে না।

অপরদিকে, আবদুল খালেকের বিরুদ্ধে ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ স্বাক্ষরিত কারন দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে আট দিন সময় দিয়ে। তাতে বলা হয়েছে তিনি দায়িত্ব পালনের সময় অদক্ষতার কারনে কোম্পানির একাধিক শাখা বন্ধ হয়েছে এবং অনেক শাখা লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। কোম্পানির সবাইকে চাকুরিচ্যুতির হুমকি দেয়ার অভিযোগসহ পরিচালকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরন করার অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে আবদুল খালেক মিয়া তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ প্রত্যাখান করে বলেন, কোম্পানির সচিব চৌধুরি এহেসানুল হক ইসলামী ইন্সুরেন্সে প্রভাব বিস্তার করে লুটপাট করেন। তাকে লুটপাট করতে বাধা দেয়ায় সে ষড়যন্ত্র করছে। চৌধুরি এহসানের পক্ষে হয়ে কাজ করছেন ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন। নূর মোহাম্মদ আমেরিকা অবৈধভাবে বাড়ী গাড়ি করেছেন বলে আবদুল খালেক মিয়া অভিযোগ করেন। চৌধুরি এহেসানের লুটপাটের আরেক সহযোগী সিএফও মো. মঈনুল আহছান চৌধুরীকে ষড়যন্ত্র করে এমডি করা হবে বলেও জানান তিনি।

সিইও অপসারনের বিষয়ে ইসলামী ইন্সুরেন্সের ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ এর সাথে বাণিজ্য প্রতিদিন থেকে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে এ বিষয়ে জানতে কোম্পানি সচিব চৌধুরী এহেসানুল হক এর সাথে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কথা বলার চেষ্টা করলেও তিনি তার ফোন রিসিভ করেননি। গত ২৫শে আগস্ট (সোমবার) ইসলামী ইন্সুরেন্স এর প্রধান কার্যালয় পুরানা পল্টন কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারে গিয়ে বাণিজ্য প্রতিদিনের প্রতিনিধি বক্তব্যের জন্য চৌধুরি এহেসানুল হকের অনুমতি চান। তবে তিনি অনুমতি না দিয়ে তার অধিনস্ত এডমিন বিভাগের শরিফ আহমেদ এর সাথে কথা বলতে বলেন, এহেসানুল হক বক্তব্য প্রদানে অপরাগতা প্রকাশ করেন। তবে শরিফ আহমেদ এর কাছে আইডিআরএ থেকে সিইও আবদুল খালেক মিয়াকে অপসারন করার আবেদন প্রত্যাহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

নতুন সিইও নিয়োগ ও সিইও পদ থেকে আবদুল খালেক মিয়াকে অপসারণ এবং তার আবেদনের বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কতৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর মূখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, আবদুল খালেক মিয়ার পক্ষ থেকে এবং ইসলামী ইন্সুরেন্সের পক্ষ থেকে আইডিআরএ বরাবর অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কতৃপক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করবে।

এর আগে ইসলামী ইন্সুরেন্সের কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানের ৮ উদ্যোক্তা পরিচালককে সরিয়ে স্ত্রী, বোন, ভগ্নিপতিসহ পরিবারের ৮ সদস্যকে পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ন পদে বসিয়েছেন তিনি। ২০১২ সালের দিকে সাবেক চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে জোরপূর্বক সাইদ খোকন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবেই ১২ বছর নির্বাচন ছাড়াই বেআইনিভাবে তিনি এ পদে বহাল থেকে নানা দুর্নীতি ও অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ পরিচালনা পর্ষদের।

সাইদ খোকন সেই সময় আইডিআরএ এর নিয়ম নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। পুরোটাই নিয়ন্ত্রন করতেন যেভাবে খুশি সেইভাবে, যাকে তাকে দিয়ে কোম্পানি পরিচালনা করার অভিযোগ ছিলো চেয়ারম্যান সাঈদ খোকনের দিকে।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

রপ্তানি খাতে নতুন নীতিমালা ডিজিটাল ট্রেড ও ফ্রিল্যান্সারদের সহায়তায় একাধিক নতুন বিধান

ফ্রিল্যান্সারদের জন্য পৃথক অধ্যায় যুক্ত সেবা রপ্তানিতে ইএক্সপি ফর্মের বাধ্যবাধকতা নেই ডিজিটাল নথির স্বীকৃতি পেল ...

জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিক টেকসই অর্থায়নে উল্লম্ফন, কমেছে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ

টেকসই প্রকল্পে অর্থায়ন বেড়েছে ১৬,৩১১ কোটি টাকা সবুজ প্রকল্পে অর্থায়ন কমেছে ১,৭৮৪ কোটি টাকা টেকসই ...