
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদের মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় নির্মিত বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগই এখন অকার্যকর কিংবা সীমিত সুবিধাসম্পন্ন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার উদ্দেশ্যে ৫৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের ২২০টি বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্রের একটিও শতভাগ ব্যবহারের উপযোগী নয়। অনেক কেন্দ্রেই নেই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, অচল সোলার প্যানেলের কারণে বিদ্যুৎ সুবিধা নেই, গবাদিপশুর জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণও অসম্পূর্ণ। ফলে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় দুর্গত মানুষের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে এসব কেন্দ্র প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের ১৬ জেলার ৮৬টি উপজেলায় ‘উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় এসব আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটির কাজ ২০২২ সালের জুনে শেষ হলেও নির্মাণ শেষে বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুর্যোগকালে দরিদ্র, অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি গবাদিপশু ও গৃহস্থালি সম্পদ রক্ষার লক্ষ্যেই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে দ্বিতীয় দফা সংশোধনের পর ২০২২ সালের জুনে কাজ শেষ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে ঘূর্ণিঝড় ফণী, বুলবুল ও আম্পানের মতো দুর্যোগে উপকূলীয় জনগণের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হতো। ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্পানেই প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়, ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা এবং ২০১৩ সালের মহাসেন উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি ঘটায়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ভয়াবহ বন্যায় দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি স্বাভাবিক সময়ে শিক্ষা ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তুলতে ২২০টি বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মোড়লগঞ্জের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর করুণ চিত্র
আইএমইডির মূল্যায়নে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রের নাজুক অবস্থা উঠে এসেছে। সেলিমাবাদ ডিগ্রি কলেজ-কাম বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, তোরাব আলী মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র এবং সোনাখালী আজিজিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে প্রকল্পের মূল সুবিধাগুলোর অনেক কিছুই নেই।
এসব কেন্দ্রে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়নি, গবাদিপশুর আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেই, অ্যাপ্রোচ সড়কও নির্মাণ করা হয়নি। অধিকাংশ সোলার প্যানেল অচল হয়ে পড়ে আছে। সোনাখালী আজিজিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা আশ্রয়কেন্দ্রটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এর দরজা-জানালা ক্ষতিগ্রস্ত এবং অবকাঠামোর বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে গেছে।
দুর্যোগে কাজে আসছে না অনেক কেন্দ্র
সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বন্যার সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিলেও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। অনেকেই বন্যার পানি পুরোপুরি না নামতেই আশ্রয়কেন্দ্র ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
কক্সবাজারের পেকুয়ার উজানটিয়া বহুমুখী কমিউনিটি আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থাও উদ্বেগজনক। সেখানে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে, পিলারে ফাটল দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা সত্ত্বেও এবারের বন্যায় প্রায় ২০০ পরিবার সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আশ্রয়কেন্দ্রটি অনেক সময় মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডাস্থল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
অচল সোলার প্যানেল, অকেজো পানির ব্যবস্থা
প্রকল্প অনুযায়ী ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হলেও অধিকাংশই বর্তমানে অচল। ফলে দুর্যোগকালে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুতের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা থাকে না।
একইভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য স্থাপিত রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থাও অপরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
মূল প্রকল্পে প্রতিটি কেন্দ্রে গবাদিপশুর জন্য পৃথক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে শতাধিক কেন্দ্রেও তা নির্মাণ করা হয়নি। ফলে দুর্যোগকালে অনেক পরিবার তাদের গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে রাখতে না পেরে কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়।
প্রতিটি গবাদিপশু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে ১৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। এছাড়া ৩৪টি গভীর নলকূপ স্থাপন না হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। যেসব নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে, তার অনেকগুলোর মোটর নষ্ট থাকায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ঘাটতি
আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বাস্তব চাহিদা ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের ঘাটতি ছিল। ফলে মাঝপথে প্রকল্প সংশোধন করতে হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকালে চারজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করায় কাজের ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হয়েছে।
তবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো স্থানীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যাতে দুর্যোগকালে আশ্রয়কেন্দ্র এবং স্বাভাবিক সময়ে শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা যায়।
রক্ষণাবেক্ষণে নতুন উদ্যোগ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, “আশ্রয়কেন্দ্রগুলো বছরজুড়ে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এগুলোকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আলাদা বাজেটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে সারা বছর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে কার্যকরভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র কেবল একটি ভবন নয়, বরং দুর্যোগকালে হাজারো মানুষের জীবনরক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল। তাই নির্মাণের পাশাপাশি কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ এবং গবাদিপশুর জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
টিআর
- ১কুবিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে ‘দায়সারা’ আয়োজনের অভিযোগ
- ২কুষ্টিয়ায় বাঁশ-বেত শিল্পের নতুন সম্ভাবনা
- ৩যে ডকুমেন্টারিতে আবু সাঈদের ছবি নেই, সেটা কোনো ডকুমেন্টারি নয়
- ৪হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু
- ৫কয়রায় দুঃস্থ ও অসহায়দের মাঝে ব্যাটারিচালিত ভ্যান বিতরণ
- ৬২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ৮৭ হাজার কোটি টাকা
- ৭সন্ত্রাসমুক্ত জঙ্গল সলিমপুর গঠনে প্রস্তুত প্রশাসন : জানালেন ডিআইজি ও এসপি
- ৮উষ্ণমণ্ডলের তুলনায় নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তির ঝুঁকি বেশি
- ৯ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজে ইউরোমানি অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি
- ১০জুলাই নিয়ে টানাটানি করলে জুলাই আমাদের কারও থাকবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- ১‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’: ইতিহাসের শিক্ষা, বৈষম্যহীন সমাজ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ
- ২এবার ৮ ব্র্যান্ডের ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমে ভয়াবহ মাত্রার মার্কারি শনাক্ত
- ৩শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড ও কাউন্সিলর একরাম হত্যার বিচার শুরু হয়েছে
- ৪৫ আগস্ট ঘিরে নাশকতার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই: ডিবিপ্রধান
- ৫মানবপাচারকারীদের নতুন কৌশল মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ
- ৬জুলাইয়ের ডকুমেন্টারি ঘিরে রাষ্ট্রপতির সামনেই হট্টগোল
- ৭মৌলভীবাজারে চা শ্রমিকদের উত্থাপিত মজুরি সংসদে বাতিলে বিক্ষোভ সমাবেশ
- ৮সাতক্ষীরার ব্লিস হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড, নিরাপদে সরানো হলো রোগীদের
- ৯বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট নিয়ে অজুহাতের মাধ্যমে দায়িত্ব এড়াতে চাই না
- ১০বিএটি বাংলাদেশের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাখাবের বেনিদজে





পাঠকের মতামত