সাক্ষাৎকারে আহসান এইচ মনসুর
ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের মূল বাধা রাজনৈতিক পর্ষদ

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে সুশাসন ও স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদের নিয়োগ এবং পদোন্নতি নীতিমালায় বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
গত ২৬ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন এই রূপরেখা জারি করে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল ব্যাংকের এমডি পদে আর সরাসরি ‘নিয়োগ’ দেবে না সরকার; বদলে কেবল ‘মনোনয়ন’দেবে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ৭ সদস্যের বাছাই কমিটি।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি (এনওসি) নিয়ে নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। নতুন নীতিমালার পাশাপাশি ডিএমডি ও জিএম পদোন্নতিতে ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন সূচক আনা হয়েছে, যেখানে বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে (এসিআর) ৪০ এবং সাক্ষাৎকারে ১০ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যাংক খাতের এসব সাম্প্রতিক পরিবর্তন, ছয় ব্যাংকের এমডি নিয়োগ, পর্ষদের প্রকৃত স্বাধীনতা, খেলাপি ঋণ আদায়ের বাস্তবতা ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাণিজ্য প্রতিদিনের প্রতিনিধি শাহাব উদ্দীন ওয়াসিম।
বাণিজ্য প্রতিদিন: গত ২৬ জুলাই জারি করা নতুন নীতিমালায় বলা হচ্ছে, স্বাধীন পর্ষদের মাধ্যমে এমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। কিন্তু যেখানে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি প্রার্থী মনোনয়ন দেবে, সেখানে পর্ষদ আসলে কতটা স্বাধীন থাকতে পারবে? নাকি এটা স্রেফ কাগজে-কলমের স্বাধীনতা?
আহসান এইচ মনসুর: এটি মূলত নির্ভর করবে অর্থমন্ত্রী মহোদয় এবং ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের ওপর।
বাণিজ্য প্রতিদিন: পর্ষদকে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বানিয়ে পরবর্তীতে এমডিদের অনিয়ম কিংবা ব্যাংকের যেকোনো ব্যর্থতার দায়ভার পর্ষদের ওপর চাপানোর ব্যবস্থা করা হলো কি না?
আহসান এইচ মনসুর: দেখুন, এমডিদের ব্যর্থতা এখন সরকারের ওপর চাপিয়ে লাভ কী হয়েছে? তার চেয়ে পর্ষদের ওপর চাপানো তো ভালো, এটলিস্ট পর্ষদ তো দায়বদ্ধ থাকবে। বর্তমানে পর্ষদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই, মন্ত্রণালয়ের সচিব সাহেবেরও কোনো দায়বদ্ধতা নেই। আসল ইম্পর্টেন্ট বিষয়টা হলো—পর্ষদগুলো কীভাবে সিলেক্ট করা হয়? মূল চ্যালেঞ্জ তো ওইটাই। সুশাসন বা গভর্নেন্সের জায়গাটা তো ওখানেই কম্প্রোমাইজড হয়ে যায়। দেখা যায়, বাদ পড়া রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দিয়ে বা খারাপ পর্ষদ গঠন করা হয়। ধরেন, যাকে এমপি মনোনয়ন দেওয়া যায়নি, তাকে ব্যাংকের ডিরেক্টর বানিয়ে দেওয়া হলো। সে তো আসবেই ব্যাংকের টাকা মারার জন্য, নিজের সুবিধামতো লোন স্যাংশন করিয়ে নেওয়ার জন্য। সমস্যাটা তো ঠিক ওই জায়গাটায়। আর ডিরেক্টরদের কোয়ালিটি কেমন হবে, তা তো মন্ত্রণালয়কেই ঠিক করতে হবে।
বাণিজ্য প্রতিদিন: নীতিমালায় বলা হয়েছে, এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ কমানোর অভিজ্ঞতায় গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা যায় বড় ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী। সে ক্ষেত্রে নতুন পর্ষদ ও এমডিদের অবস্থান কতটা শক্ত হবে?
আহসান এইচ মনসুর: প্রথমত, বড় বড় ঋণখেলাপির ক্ষেত্রে একটা বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—তাদের অনেকেই রাজনৈতিক কারণে ইতোমধ্যে দেশের বাইরে চলে গেছে বা আর ফিরবে না। এই টাকা তো আর ফেরত আসবে না, তারা টাকা নিয়ে চলেই গেছে। সে ক্ষেত্রে এমডি বা পর্ষদ খুব শক্ত অবস্থান নিলেই বা কী করার আছে?
বাণিজ্য প্রতিদিন: কিন্তু এখন যারা নতুন ঋণ নিচ্ছেন বা পরবর্তীতে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন, তাদের ক্ষেত্রে নতুন এমডিদের অবস্থান কতটা কার্যকর হবে?
আহসান এইচ মনসুর: খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিসত্তা নয়, আইনি কাঠামোটাই সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট। আমাদের দেশে বেশিরভাগ খেলাপি ঋণ আইনি জটিলতায় আটকে যায়। সেজন্য যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার, তা হলো—অর্থঋণ আদালত আইন (মানি লোন কোর্ট অর্ডিন্যান্স) সংশোধন করে দ্রুত পাস করানো, যাতে আদালত দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন। বর্তমানে বাস্তবতা হচ্ছে, কোর্টে সামান্য পয়সা খরচ করে আইনি আদেশ আটকে রাখা যায়। ফলে খেলাপিদের আর টাকা পরিশোধ করতে হয় না।
বাণিজ্য প্রতিদিন: ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি একটি নীতিমালা করা হয়েছিল, সেটি বাতিল করে আবার ২৬ জুলাই নতুন নীতিমালা চাপানো হলো। ২০২৩ সালেও নীতিমালা ছিল। এই ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তনের কারণ কী? নিজেদের পছন্দের লোক বসাতেই কি বারবার নিয়ম পরিবর্তন হয়?
আহসান এইচ মনসুর: না, আমি তেমনটি মনে করি না। আমার মনে হয় নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য ঠিকই আছে। তবে কাজের ক্ষেত্রে এটি বাস্তবে কতখানি ইফেক্টিভ হবে, সেটাই দেখার বিষয়। নীতিমালার উদ্দেশ্য খারাপ বলা যাবে না।
বাণিজ্য প্রতিদিন: ডিএমডি ও জিএম পদোন্নতিতে ১০০ নম্বরের মূল্যায়নে এসিআরে ৪০ নম্বর রাখা হলেও ভাইভাতে ১০ নম্বর দেওয়া হয়েছে। এতে কি তোষামোদ বা তদবির বাণিজ্য বাড়তে পারে বা কেমন হবে বলে মনে করেন?
আহসান এইচ মনসুর: যেহেতু ভাইভাতে নম্বর কমিয়ে মাত্র ১০ রাখা হয়েছে, তাই কেবল ভাইভা ঘিরে তোষামোদ করার সুযোগ কম। আর এসিআর তো বহু আগেই ঠিক হয়ে গেছে। ১০-১২ বছরের চাকরির ইতিহাসে কে কী নম্বর বা গ্রেড পেয়েছে, তা তো অলরেডি নির্ধারিত; এখানে নতুন করে তদবির করার কিছু নেই। তবে আমাদের এসিআর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সংস্কার খুব দরকার। বর্তমানে দেখা যায় ব্যাংকিং খাতে সবাইকে গড়ে ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ বা ‘এ’ দিয়ে দেওয়া হয়। এই মূল্যায়ন সঠিক নয়। আউটস্ট্যান্ডিং মূল্যায়নের সীমা নির্দিষ্ট হওয়া উচিত—সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কর্মকর্তা আউটস্ট্যান্ডিং পাবেন, পরবর্তী ১০ শতাংশ পাবেন ‘এ’, তার পরের ১০ শতাংশ পাবেন ‘এ মাইনাস’। এভাবে পর্যায়ক্রমে করতে করতে যাবে। কিন্তু আমাদের হয় উল্টো—প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কর্মকর্তাকেই আউটস্ট্যান্ডিং দেওয়া হয়। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকেও দেখেছি সবাইকে আউটস্ট্যান্ডিং দেওয়া হয়। তাহলে সেই এসিআরের মূল্য কী রইল? এসিআরে যেহেতু ৪০ নম্বর রাখা হয়েছে, তাই ব্যাংকের পর্ষদগুলোকে এসিআরে ‘বেল কার্ভ’ বা পার্সেন্টাইল পদ্ধতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাণিজ্য প্রতিদিন: সামগ্রিক নীতিমালা নিয়ে আপনার কোনো বিশেষ পরামর্শ আছে কি?
আহসান এইচ মনসুর: নীতিমালার নম্বর বণ্টন বা প্রপোরশনগুলো বেশ ভালো— ৪০ নম্বর এসিআর এবং ১০ নম্বর ভাইভা। ভাইভাতে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে সেটাও খারাপ না। তবে যদি সত্যিকারের অর্থে ভাইভাকে শক্তিশালী করা হতো তাহলেও খারাপ হতো না। কারণ ভাইভার একটা গুরুত্ব আছে, কিন্তু তদবিরের সমস্যাটা একটু বেড়ে যায় ভাইভাতে। নির্মোহভাবে করলে ভাইভা ভালো হইলে সেটা কিন্তু সিলেকশনের জন্য ভালো হয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই ক্যান্ডিডেটকে ভাইভা নিলেই বোঝা যায়, ভাত টিপলেই টের পাওয়া যায়। সারাজীবন কী করছেন না করছেন কিচ্ছু ইম্পর্টেন্ট না, তুমি কতখানি জানো সেটাই ইম্পর্টেন্ট। দুইটা-তিনটা প্রশ্ন করলেই টের পাওয়া যায়। কিন্তু যদি তদবির বাণিজ্যের মধ্যে পড়ে যায় তাহলে ভাইভার বেশি নম্বর ক্ষতিকর, আর তদবির বাণিজ্যের মধ্যে না পড়লে ভাইভার বেশি নম্বর ভালো।
বিএইচ
- ১হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু
- ২প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে উৎসবের আমেজ, বুকভরা আশা হাটহাজারীবাসীর
- ৩কল-কারখানা স্থাপন করে উপকূলের বেকার সমস্যা সমাধান করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
- ৪শিক্ষার্থীদের জীবনের লক্ষ্য ও বদলে যাওয়া স্বপ্ন: কাঠামোগত বাস্তবতার সংকট
- ৫সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডন গ্রেফতার
- ৬ইসলামী ব্যাংকের শরী’আহ সুপারভাইজরি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত
- ৭প্রাথমিকের কারিকুলামে যুক্ত হচ্ছে সায়েন্স টয় : ববি হাজ্জাজ
- ৮দর বৃদ্ধির শীর্ষে নিটল ইন্স্যুরেন্স
- ৯আড়াই মাসে ভোটার বেড়েছে তিন লাখ ৯ হাজার, মোট ১২ কোটি ৮৬ লাখ
- ১০বিদেশে ঘুরতে ডলারের ঝামেলা শেষ, টাকায় মিলবে ভ্রমণ প্যাকেজ
- ১চাহিদা অনুযায়ী বগুড়ার তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি: বাণিজ্যমন্ত্রী
- ২সাতক্ষীরায় বর্ষা মৌসুমে পাট পঁচানোর ধুম
- ৩চাঁদাবাজি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতার পদ স্থগিত
- ৪সোমবার সকাল ১০টায় এসএসসি ও সমমানের ফল উদ্বোধন করবেন শিক্ষামন্ত্রী
- ৫শেয়ারবাজারে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৫
- ৬হাম ও উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু
- ৭সিলেটে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবার পাবে ৫ লাখ টাকা
- ৮চলনবিলে ইকো ট্যুরিজমের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে : পর্যটনমন্ত্রী
- ৯হেলিকপ্টারে মহেশখালীর পথে প্রধানমন্ত্রী
- ১০মা মাছ রক্ষায় হাওরে হচ্ছে ‘মিঠা পানির মাছের অভয়াশ্রম’





পাঠকের মতামত