ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫ ৫:১০ পিএম , আপডেট: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫ ৯:০৩ পিএম

রেমিট্যান্স আহরণের নতুন দিগন্ত মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। মূহূর্তের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এমএফএসের একাউন্ট থেকে এটিএম এর মাধ্যমে তোলা যাচ্ছে। আগামী দিনের ডিজিটাল লেনদেন নিয়ে দৈনিক বাণিজ্য প্রতিদিনকে বিস্তারিত জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।

বাণিজ্য প্রতিদিন: রেমিট্যান্স প্রবাহে এমএফএস কিভাবে কাজ করে?

আরিফ হোসেন খান: বিদেশে অবস্থিত বিভিন্ন ব্যাংক/মানি ট্রান্সফার অর্গানাইজেশন (এমটিও)/মানি এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে প্রেরিত অর্থ এমএফএসসমূহের মাধ্যমে বাংলাদেশের এমএফএস (গ্রাহক) হিসাবে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাংক/এমটিও/এক্সচেঞ্জ হাউজের সাথে এমএফএস প্রোভাইডারদের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় একজন এক্সপাট্রিয়েট বা বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তি নির্দিষ্ট এমএফএস হিসাবে ঐ ব্যাংক/এমটিও/এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে বাংলাদেশে টাকা পাঠাতে পারেন। বাংলাদেশের এমএফএসসমূহ বিদেশে অবস্থানরত প্রেরকের কাছ থেকে সরাসরি অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন না। এমএফএস প্রোভাইডাররা শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরে অর্থ পৌঁছানোর (ডিস্ট্রিবিউশনের) দায়িত্ব পালন করে।

বাণিজ্য প্রতিদিন: গত বছর বাংলাদেশে এমএফএস রেমিট্যান্স মার্কেট কত ছিলো?

আরিফ হোসেন খান: ২০২৪ এর জুলাই থেকে ২০২৫ এর জুন সময়কালে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা সমপরিমাণ ফরেন রেমিটেন্স এমএফএস’র মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকদের হিসাবে জমা হয়েছে। এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই মাসে ২.৪৮ বিলিয়ন ডলার ও আগস্ট মাসে ২.৪২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আর ইসলামী ব্যাংকে আগস্ট মাসে এসেছে অর্থ বছরের সর্বোচ্চ ৫৫৬ মিলিয়ন ডলার। বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোয় সরকার প্রদত্ত ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনাও দেয়া হয় হিসাব দারীদেরকে।

বাণিজ্য প্রতিদিন: একটি এমএফএস কত টাকার রেমিট্যান্স পাঠানো ও উঠানো যাবে?

আরিফ হোসেন খান: একটি এমএফএস একাউন্টে একবারে ৩ লাখ টাকা ব্যালেন্স থাকতে পারবে। কিন্তু, রেমিট্যান্স ট্রান্সফারের কারণে ব্যালেন্স ৩ লাখ টাকার বেশি হলে তা আবার ৩ লাখ টাকায় নেমে না আসা পর্যন্ত আর কোনো ক্যাশ-ইন বা অ্যাড মানি করা যাবে না।

বাণিজ্য প্রতিদিন: মোবাইল লেনদেনে গত বছরের লেনদেন কেমন ছিলো?

আরিফ হোসেন খান: মোবাইল লেনদেন বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে ২০২৪ সালের আগস্টে এক হাজার ১০১ কোটি ৮০ লাখ টাকা রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। মাস-হিসেবে যদি বিবেচনা করি তাহলে রেমিটেন্স আহরণের হিসাবে এটি পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালের আগস্টে এমএফএসের মাধ্যমে পাঠানো ৫১৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১৩ শতাংশ। এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের আগষ্ট মাসে ইসলামী ব্যাংকে আগস্ট মাসে এসেছে অর্থ বছরের সর্বোচ্চ ৫৫৬ মিলিয়ন ডলার।

বাণিজ্য প্রতিদিন: রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে আমূল পরিবর্তনের কারন কি?

আরিফ হোসেন খান: গতবছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু ব্যাংক নগদ লেনদেনে বিঘ্ন ঘটে। ফলে প্রবাসীরা এমএফএসের মাধ্যমে রেমিটেন্স লেনদেনের দিকে ঝুঁকে পরে। এদিকে ব্যাংকের মাধ্যমে আসা রেমিটেন্সের ওপর আড়াই শতাংশ সরকারি প্রণোদনা ও এমএফএস সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নানান সুবিধার কারণে রেমিটেন্স বেড়েছে। বর্তমানে দেশে বিকাশ, নগদ ও রকেটসহ অন্তত ১৩ এমএফএস প্রতিষ্ঠান আছে।

বাণিজ্য প্রতিদিন: বাংলাদেশে কত এমএফএস অ্যাকাউন্টধারী হিসাব রয়েছে?

আরিফ হোসেন খান: সেবার বৈচিত্র্য, সহজ লেনদেন প্রক্রিয়া ও লেনদেনের বর্ধিত সীমা, সরকারি প্রণোদনা প্রাপ্তির সুযোগ ইত্যাদি কারণে বর্তমানে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এমএফএসের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৩ সালে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে সার্বিকভাবে ৫১.৭% কোনো না কোনো ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এমএফএস এর হিসাবধারী ছিল, শুধু ব্যাংক হিসাবধারীর হার ২৮.৩% । ২০২৪ সালের বিবিএস এর জরিপে এমএফএস হিসাবধারীর হার ৪৭.৮% । বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, এদিকে ২০২৪ সালে এমএফএস ব্যবহার করে বিদেশ থেকে রেমিটেন্স আসার পরিমাণর প্রায় ১০,৭৮৬ কোটি টাকা।

বাণিজ্য প্রতিদিন: এমএফএস এ প্রেরিত রেমিট্যান্স উত্তোলনে খরচ কি রকম হয়ে থাকে?

আরিফ উদ্দিন খান: বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের অর্থ উত্তলন সাধারন লেনদেন থেকে কম। যেমন সাধারণত এজেন্ট থেকে টাকা উত্তোলনে প্রতি হাজারে খরচ হয় ১৮ টাকা ৬০ পয়সা। তবে দুটি প্রিয় এজেন্ট থেকে টাকা উত্তোলনে প্রতি হাজারে খরচ হয় ১৪ টাকা ৯০ পয়সা। তবে এই খরচে মাসে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা তোলা যায়। কিন্তু সারা দেশে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের প্রায় হাজার এটিএম বুথ থেকে এই অর্থ উত্তোলন করা যায়। এতে প্রতি হাজারে খরচ পড়ে ৭ টাকা। নগদ, বিকাশ বা উপায়সহ সকল এমএফএস এর খরচ কাছাকাছি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এমএফএস ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৩ কোটি ৯২ লাখ।

বাণিজ্য প্রতিদিন: এমএফএস এর মাধ্যমে দেশে ও বিদেশ থেকে কত পরিমান লেনদেন হয়, মাসে কত লেনদেন হয়?

আরিফ হোসেন খান: মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএসএ ফোন নম্বরকে হিসাব/অ্যাকাউন্ট বিবেচনা করে ব্যাংকিং ও অন্যান্য আর্থিক সেবা প্রদান করাকে বোঝায়, যেখানে লেনদেনের হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশে এমএফএস চালু হয় নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত এবং আর্থিক লেনদেনকে ত্বরান্বিত করার জন্য। বাংলাদেশ ব্যাংক এই খাতের অবিভাবক ও তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এখাতের অন্যতম অংশীজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, এমএফএসএ নিবন্ধিত ব্যক্তিগত হিসাব/অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ২৩.৯২ কোটি। প্রায় ৩৭.৬% হিসাব সক্রিয় হিসেবে রয়েছে। নিবন্ধিত ব্যক্তিগত হিসাবধারীদের মধ্যে পুরুষ ১৩.৭৮ কোটি এবং নারী ১০.১০ কোটি। নিবন্ধিত মার্চেন্ট হিসাবের সংখ্যা প্রায় ১২.২৫ লাখ। বছরে অর্থ লেনদেনের পরিমাণ মাসে প্রায় ১,৬৪,৭২৬ কোটি টাকা এবং দৈনিক গড়ে প্রায় ৫,৮৮৩ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫ এর ফেব্রুয়ারী মাসে এমএফএসের মাধ্যমে ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার রেমিট্যান্স এসেছে।

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

ডিজিটাল অর্থনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক জালিয়াতি

প্রতি দুই সাইবার অপরাধের একটিই এখন আর্থিক জালিয়াতি ৫ বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে সাইবারভিত্তিক আর্থিক ...

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত ৪৪ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান

১০ হাজার একর শিল্পভূমি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত চিনিকল, পাটকল, টেক্সটাইল, ইস্পাত কারখানা, প্রকৌশল শিল্পসহ বিভিন্ন ...

লোকসানে পুরো ব্যাংক খাত

দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, তারল্য সংকট ও মুনাফা কমে যাওয়ার চাপে ...