জাহাঙ্গীর আলম আনসারী, সিনিয়র রিপোর্টার
প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬ ৮:৪৮ এএম , আপডেট: আগস্ট ৩, ২০২৬ ৩:৫০ পিএম
  • ডলার বাজার স্থিতিশীল
  • বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
  • এলসি ও আমদানি বেড়েছে

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আয়ে ভাটাসহ নানা কারণে বিগত দুই বছর ধরে দেশের অর্থনীতিতে চলছে সংকট। তবে এই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। এমনকি বর্তমানে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয়। প্রতিমাসে রেমিট্যান্স বাড়ায় শক্তিশালী হচ্ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। আর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। আর গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ২৪৭ কোটি ৭৪ লাখ ডলার।সেই হিসাবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৮ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৮ জুলাই পর্যন্ত মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ দাড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। গত দুই বছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয়। রপ্তানি আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লেও প্রবাসীরা নিয়মিত অর্থ পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরেছে। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ এবং অনুদানও রিজার্ভ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। তবে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির প্রধান উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রবাসী আয়কে।

এদিকে প্রবাসী আয় বাড়ায় ডলার বাজারে আগের তুলনায় অস্থিরতা কমেছে এবং বিনিময় হার অনেক বেশি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ায় ব্যাংকগুলোর ডলার সংকট কমেছে। ব্যবসায়ীরা আগের তুলনায় সহজে আমদানির জন্য এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে পারছেন। শিল্পকারখানার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে জটিলতা অনেকটাই কমেছে। উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ইতিবাচক গতি ফিরে আসছে। ডলার সংকট কমে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আস্থা বেড়েছে। ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক লেনদেন আরও স্বাভাবিক হয়েছে। সরকারের বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর বিভিন্ন উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। হুন্ডির পরিবর্তে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়ায় সরকারি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

গত দুই বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়েছে, ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরেছে এবং ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার সংকট অনেকটাই কমেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমদানি বাণিজ্যেও। ব্যবসায়ীরা আগের তুলনায় সহজে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছেন। ফলে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে স্বস্তি ফিরেছে। ডলার বাজারে অতিরিক্ত চাপ না থাকায় বিনিময় হারও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।

ডলার সংকটের কারণে কয়েক বছর আগে অনেক ব্যাংক এলসি খুলতে অনীহা দেখালেও এখন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে শিল্পকারখানার কাঁচামাল, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে আগের তুলনায় কম জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারকেরা। ব্যাংকগুলোর কাছে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় বৈদেশিক লেনদেনও স্বাভাবিক হচ্ছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ব্যবসায়ীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করছে। কয়েক মাস আগেও এলসি নিষ্পত্তি, আমদানি ব্যয় এবং ডলারের দামের অনিশ্চয়তা বড় উদ্বেগ ছিল। এখন সেই চাপ তুলনামূলক কমেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাজারে পণ্যের প্রাপ্যতার ওপরও পড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে প্রণোদনা, হুন্ডির বিরুদ্ধে নজরদারি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া এবং প্রবাসীদের জন্য সহজ আর্থিক সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশ এখন আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে দেশে আসছে, যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখছে। প্রবাসীদের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর উৎসাহ এবং হুন্ডি প্রতিরোধে নেওয়া পদক্ষেপের ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেড়েছে এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ এখন শুধু পরিবারের আয়ের উৎস নয়; এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎসগুলোর একটি। রেমিট্যান্স বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ শক্তিশালী হয়, আমদানি ব্যয় নির্বাহ সহজ হয় এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের জন্য এক ধরনের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করছে। এই অর্থের প্রবাহ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভই বাড়াচ্ছে না; বরং ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে নতুন করে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।

তাঁদের ভাষ্য, বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা আরও বাড়ানো গেলে এর সুফল দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্সের এই ধারা অব্যাহত থাকলে রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হবে এবং বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ আরও সমপ্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তাই এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে প্রবাসী কর্মীদের জন্য আরও নতুন কর্মসংস্থানের বাজার সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করার উদ্যোগ জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

রপ্তানি খাতে নতুন নীতিমালা ডিজিটাল ট্রেড ও ফ্রিল্যান্সারদের সহায়তায় একাধিক নতুন বিধান

ফ্রিল্যান্সারদের জন্য পৃথক অধ্যায় যুক্ত সেবা রপ্তানিতে ইএক্সপি ফর্মের বাধ্যবাধকতা নেই ডিজিটাল নথির স্বীকৃতি পেল ...

জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিক টেকসই অর্থায়নে উল্লম্ফন, কমেছে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ

টেকসই প্রকল্পে অর্থায়ন বেড়েছে ১৬,৩১১ কোটি টাকা সবুজ প্রকল্পে অর্থায়ন কমেছে ১,৭৮৪ কোটি টাকা টেকসই ...