মো. ওবায়দুল্লাহ
প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬ ৪:০৫ পিএম
  • এক বছরে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া কমেছে ১,০৪,০০০ জন
  • এক বছরে ইউরোপে বেড়েছে প্রায় ১৯,০০০ জন

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির প্রধান গন্তব্য হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো একক আধিপত্য ধরে রাখলেও, সম্প্রতি ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেই নির্ভরতা বা আধিপত্য কিছুটা কমেছে। বিপরীতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বৈশ্বিক শ্রমবাজারে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনারও বার্তা বহন করছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে দক্ষ জনশক্তি, ভাষা শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

বিএমইটি-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯ লাখ ৮৫ হাজার কর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন। এর মধ্যে ৭ লাখ ৮৫ হাজারের মতো কর্মী গিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, যা মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ১৫ হাজার ৭০৭ জন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ৩০ হাজার বা প্রায় ৩ শতাংশ। অর্থাৎ মোট জনশক্তি রপ্তানি কিছুটা কমেছে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে অঞ্চলভিত্তিক গন্তব্যে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রায় ৮ লাখ ৮৯ হাজার বাংলাদেশি কর্মী গিয়েছেন। চলতি সময়ে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৭ লাখ ৮৫ হাজারে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান কমেছে ১ লাখ ৪ হাজার বা ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।

অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫-এর জুন পর্যন্ত সময়ে ইউরোপে বাংলাদেশি কর্মী গিয়েছেন প্রায় ২০ হাজার। এক বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ হাজারে। অর্থাৎ ইউরোপে কর্মসংস্থান প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। বছরটিতে মহিলা কর্মী গিয়েছেন প্রায় ৮৫০ জন।

দেশভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, সর্বাধিক ১১ হাজার ৪১৭ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন ইতালিতে। এরপর রয়েছে পর্তুগাল, যেখানে ৬ হাজার ৩৭০ জন, রাশিয়ায় ৪ হাজার ৭৩৫, সার্বিয়ায় ৪ হাজার ৩৬৯, সাইপ্রাসে ৩ হাজার ৯২৮, বেলারুশে ১ হাজার ৭৬৭, উত্তর মেসিডোনিয়ায় ১ হাজার ৩৮৮, পোল্যান্ডে ৮৬৭ এবং রোমানিয়ায় ১৫৮ জন কর্মী গিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের এই বিপরীতমুখী প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা অন্যতম। সমপ্রতি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। পাশাপাশি গাজা যুদ্ধ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি নতুন কর্মী পাঠানোর গতি কিছুটা কমে এসেছে।

অন্যদিকে ইউরোপের অনেক দেশ শ্রমিক সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। কর্মক্ষম মানুষের ঘাটতি এবং কৃষি, নির্মাণ, উৎপাদন, সেবা ও পরিচর্যা খাতে শ্রমিকের চাহিদা বাড়ায় বিদেশি জনবল নেওয়ার সুযোগও তৈরি হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন শ্রম রপ্তানিকারক দেশের জন্য ইউরোপ নতুন সম্ভাবনার শ্রম বাজার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপমুখী এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ ইউরোপের অধিকাংশ দেশে তুলনামূলক উচ্চ মজুরি, দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান এবং দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। ফলে একই সংখ্যক কর্মী থেকেও দীর্ঘমেয়াদে বেশি রেমিট্যান্স অর্জনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু জনশক্তি পাঠানোর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষ কর্মী তৈরির দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তি বাড়ানোর দিকেও জোর দেওয়া প্রয়োজন।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপের বাজারে প্রবেশের অন্যতম শর্ত হচ্ছে কারিগরি দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান এবং নির্দিষ্ট পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ। তাই সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র এবং বেসরকারি প্রশিক্ষণ উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা এটিও মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি ইউরোপে নতুন বাজার সম্প্রসারণ- দুই কৌশলই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বিএমইটির সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের চিত্র ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কিছুটা কমলেও ইউরোপে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে টেকসই করতে হলে দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের কৌশলগত উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। তাহলেই জনশক্তি রপ্তানি বাংলাদেশের জন্য আরও লাভজনক হয়ে উঠবে।

এএ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

রপ্তানি খাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অপরিসীম: বাণিজ্যমন্ত্রী

দেশের রপ্তানি খাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অপরিসীম বলে উল্লেখ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সোমবার ...

চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হবে: অর্থমন্ত্রী

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গড়ে ওঠা চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে (সিইআইজেড) শেষ পর্যন্ত এক বিলিয়ন মার্কিন ...

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঘোষণায় সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক পাচ্ছে বাংলাদেশ

নতুন শুল্কনীতিতে বাংলাদেশের জন্য সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এ সিদ্ধান্তের ফলে ...

বাজেটের প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করছে সফল বাস্তবানের ওপর: অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, গত দেড়-দুই মাসের পরিশ্রমে প্রণীত সাম্প্রতিক বাজেটটি দেশের সর্বস্তরের ...