বাংলাদেশে বীমা খাত: সম্ভাবনার দেশ, বাস্তবতার ফাঁক

বিমা শিল্পের মালিকরা চাইলেই সবাই বিমার আওতায় আসবে

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬ ৪:৫০ পিএম , আপডেট: এপ্রিল ৯, ২০২৬ ৬:০৫ পিএম

বাংলাদেশে বীমা খাত সম্ভাবনার স্রোত নিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতা তার পথ বন্ধ করে রেখেছে। দেশের ৮২টি বীমা কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও জিডিপিতে বীমার অবদান মাত্র ০.৪%, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। গ্রামীণ মানুষ থেকে শহরের সাধারণ জনগণ পর্যন্ত বীমার আওতায় নেই, জনসচেতনতা কম, এবং দক্ষ জনবলও সীমিত। বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বীমা খাত আজও তার বাস্তব শক্তি উন্মোচন করতে পারছে না – লাভের সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তা যে বাধ্যতামূলকভাবে সংযুক্ত, সেই চাবিকাঠি এখনো হাতছাড়া।

দেশের বিমা খাতের সার্বিক অবস্থা নিয়ে বাণিজ্য প্রতিদিন সাক্ষাৎকার নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং এন্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ-এর। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব।

বাণিজ্য প্রতিদিন: যদি প্রাইভেট সেক্টর সাধারণ মানুষের জন্য বীমা বিস্তার না করতে পারে, তাহলে সরকার কী নীতি বা উদ্যোগ গ্রহণ করলে বীমা কার্যকর হবে?

শহিদুল ইসলাম জাহিদ: সবসময় বাংলাদেশে আমরা যদিও মনে করি যে সরকার হয়তো উদ্যোগী ভূমিকায় আসবে—মানে প্রথম কাজটা, প্রথম স্ট্রাইকটা হয়তো সরকারই করে। কিন্তু অন্যান্য দেশে কিন্তু এরকম না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেখবেন যে বড় বড় ইনস্যুরেন্স কোম্পানি বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, আমার কাছে মনে হয় নীতি সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ—এই যে বললাম, যারা গ্রামগঞ্জের একদম সাধারণ মানুষ, জীবিকার সন্ধানে সাগরে মাছ ধরতে যায়, নদীতে মাছ ধরতে যায়, শস্যবীমার আওতায় যারা এখনো আসেননি, যারা ক্লিনার আছেন, যারা নির্মাণ শ্রমিক আছেন—এই ধরনের ব্যক্তিদেরকে, মানে রুট লেভেলের যে লোকজন আছেন।

আমরা খুবই আশাবাদী যে বর্তমান সরকার সাধারণ জনগণকে নিয়ে বেশি মাত্রায় চিন্তিত। এই মুহূর্তে আমরা যেটা দেখলাম, যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’—যেটা সরকার গঠনের এক মাসের ব্যবধানে তারা প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। এই যে সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে পলিসি গ্রহণ করা, তাদের সুবিধার জন্য পলিসি গ্রহণ করা, তাদের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য পলিসি গ্রহণ করা—এই ক্ষেত্রে যে সমস্ত কোম্পানি এগিয়ে আসবে, সেটা এক্সিস্টিং কোম্পানি হতে পারে বা নতুন কোনো কোম্পানিও হতে পারে—যারা এগিয়ে আসবে, তাদেরকে সরকার অনেক সুবিধা দিতে পারে।

যেমন—তাদের ট্যাক্স বেনিফিট দিতে পারে, তাদের রিইনস্যুরেন্সের ক্ষেত্রে বেনিফিট দিতে পারে, তাদের দেখা যাচ্ছে যে সাবসিডিও দিতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যদি পলিসিতে লস করে—লস দিয়ে তো একটা কোম্পানি টিকে থাকতে পারবে না—সেক্ষেত্রে সরকার তাদেরকে আর্থিকভাবেও সহযোগিতা করতে পারে।

বাণিজ্য প্রতিদিন: বাংলাদেশে বীমা খাতে ক্লেইম সেটেলমেন্টে জটিলতা ও অনিয়ম রয়েছে, বিশেষ করে দক্ষ জনবলের অভাব ও গ্রামীণ পর্যায়ে অর্থ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে অনেকেই ম্যাচিউরিটির টাকা পান না। এই সমস্যা সমাধানে সরকার কীভাবে আইটি বা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে?

শহিদুল ইসলাম জাহিদ: আসলে বাংলাদেশে শুধু আইটি দিয়ে কাজ হবে না। এখানে করাপশনের একটা আন্দাজ তো আছেই, আমরা আঁচ পাই। আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনের ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই। আমরা যখন দেশের বাইরে পড়তে গিয়েছিলাম—একটা ইনস্যুরেন্স করে যেতে হয়, অনেক দীর্ঘমেয়াদি (১৮ বছর মেয়াদি ইনস্যুরেন্স)। যারা পড়তে গিয়ে বিদেশ থেকে দেশে ফেরত আসে না, কোম্পানি বা যে ইনস্টিটিউশনে চাকরি করেন, তারা এটার বেনিফিটটা পাবে। আমি বা আমরা যারা চলে এসেছি, তাহলে আমাদের এই বেনিফিটটা পাওয়ার কথা।

আমি আপনাকে একটা বলি—২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে আমার ৫০ হাজার টাকার একটা বেনিফিট ডিউ হয়েছে। এখন সেই বেনিফিটটা—আমাকে একজন অফিসার ফোন দিলেন যে, “স্যার, আপনি তো ৫০ হাজার টাকা পাবেন।” বললাম, “ঠিক আছে, কী করতে হবে?” বলল, “আমি আপনার অফিসে আসবো।” বললাম, “আসেন।” তো অফিসে এসে উনি সিগনেচার নিয়ে গেলেন। আচ্ছা। অক্টোবরে প্রথম সিগনেচার। পরে সম্ভবত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন যে অক্টোবরে ডিউ হবে। অক্টোবরের কোনো একটা তারিখে তিনি সিগনেচার নিয়ে গেলেন।

নভেম্বরে তিনি আমাকে ফিলআপ করিয়ে বললেন যে, “দেখেন স্যার, ঠিক আছে কিনা?” তো আমি চেক করে বললাম যে সব ঠিক আছে। এরপরে ডিসেম্বরে কোনো একটা সময়, ফার্স্ট উইক অথবা সেকেন্ড উইকে, তিনি আমাকে একটা চেকের ছবি পাঠিয়েছেন—“স্যার, আপনার চেকটা হয়ে গেছে, আপনাকে আমি দিয়ে আসবো।” আমি বললাম, “খুব ভালো কথা, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”

এরপরে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম—ডিসেম্বর চলে গেছে, জানুয়ারি চলে গেছে। ফেব্রুয়ারির ফার্স্ট উইকে আমার একজন সহকর্মীর আবার ওই ধরনের একটা চেক—আমি যেহেতু বিভাগের প্রধান, আমাকে সাইন করতে হচ্ছে—তখন আমার মনে হলো যে আমি তো ওই চেকটা পাইনি। তো আমি তাকে আবার ফোন দিলাম। উনি আমাকে যেটা বললেন, (খুব সাবলীলভাবে বললেন) “আপনার চেকটা আসলে মিসিং হয়ে গেছে।” ‘মিসিং’-এর বাংলা করলে যেটা হয়, হয়তো হারিয়ে গেছে।

তখন আমার একটু টনক নড়লো যে এটা কীভাবে হারায়! আমাকে প্রায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে তিনি বলছেন যে আপনার চেক হয়ে গেছে। আর সেই চেকটার ছবিও আমাকে দিয়েছেন। আর সেই চেকটা আবার মিসিং বা হারিয়ে গেছে—এটা কীভাবে সম্ভব!
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কনসার্ন অফিসার আছেন, তাকে বললাম। তিনি বললেন যে, “আমাদের কাছে এখানে রিসিভ হয়নি। এটা এখন পর্যন্ত আসেনি। এটার চেক হয়েছে—এরকম একটা ছবি আমাদের কাছে এসেছে।” দেখেন, তাহলে একটা চেকের ছবি হয়ে গেছে—আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের ছাত্র ছিলাম, এখন শিক্ষকতা করি, লেখালেখি করি এবং মিডিয়ার সাথে যুক্ত।

এখন আমার পর্যায়ে যদি একটা চেক—খুব বেশি যে তা না, ৫০ হাজার টাকার একটি চেক—প্রায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে, যে চেকটা ডিসেম্বরে ফার্স্ট উইকে লেখা হয়ে গেছে, সেই চেকটা আমার কাছে পৌঁছাতে যদি ছয়-সাত মাস সময় লাগে—এখনো পাইনি। মনে করেছিলাম ঈদের আগে পাবো, সেটাও হয়তো সম্ভব হচ্ছে না।

যাই হোক, তাহলে আপনি সাধারণ মানুষের অবস্থাটা চিন্তা করেন। আমার সাথে এ রাষ্ট্রায়ত্ত একটা প্রতিষ্ঠান যারা এ ধরনের বিহেভ করতে পারে—এখন হয়তো আমার নিজের মধ্যে কিন্তু কষ্ট আছে, এবং আমি মনে করি যে ইনস্যুরেন্স সেক্টরে যারা পলিসি গ্রহণ করে, আমার মতো অনেকেই খুব কষ্ট পান।

যখন তারা কষ্ট করে প্রিমিয়ামটা দেন, পলিসিটা পারচেজ করেন, বিনিয়োগ করেন, এবং যখন এটা ম্যাচিউরড হয়, তখন তারা আর কোনো সদুত্তর পান না। হয় ওই সিগনেচার হয়নি, অথবা “আজকে আসেন”, অথবা “কালকে আসেন”—অথবা এই যে একটা হয়রানিমূলক বন্দোবস্ত, এই যে এক ধরনের বিহেভিয়ার, কালচার—এই কালচারটার কারণে কিন্তু আমাদের মানুষ এখানে আসে না (নাম্বার ওয়ান)।

ছোটখাটো ক্লেইম যেগুলো, সেগুলো হয়তো তারা ইগনোর করে। যেমন ধরেন, বাস অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। বাসে লেখা আছে যে (টিকিটের গায়ে) যাত্রীরা বিমাকৃত। কিন্তু ওই অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার পরে কোনো যাত্রী কবে কী বেনিফিট পেয়েছে? আমার কাছে মনে হয় না।

সুতরাং ছোটখাটো ক্লেইম—এগুলো হয়তো আমরা ইগনোর করি। কারণ এখানে একটা লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আছে। আমাকে ১০০ টাকা পেতে যদি ১২০ টাকা খরচ করতে হয়, জুতা ক্ষয় করতে হয়, এত বারবার যেতে হয়—এরকম তো হবে না। বাইরের দেশে বা উন্নত দেশগুলোতে তো এরকম না।

আমি—আপনার যদি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকে, সেখানে আরও বিস্তারিত বলবো। কিন্তু বাংলাদেশে যদি আমি বলি যে এই যে একটা হয়রানিমূলক মনোবৃত্তি—এটা থেকে আমাদের ইনস্যুরেন্স সেক্টরকে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সরে আসতে হবে।

আমরা আশাবাদী। সবাইকে ঢালাওভাবে যে দোষারোপ করা হচ্ছে, সেটা না। আমাদের দেশে এরকম কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আছে—আমি শুনেছি যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তারা ক্লেইম সেটেল করছে। তাদেরকে আমরা সাধুবাদ জানাই, তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।
আমরা এটা প্রত্যাশা করি যে, কোনো একটা প্রতিষ্ঠান যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আপনার ক্লেইম সেটেল করতে পারে, তাহলে আপনি কেন পারবেন না? আমরা মনে করি যে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে আছে—সেটা সরকারি হোক বা বেসরকারি হোক—তাদের উচিত হবে এখানে তাদের লুপহোলগুলো কাটিয়ে ওঠা, জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য কাজ করা।
জনগণ যদি আস্থায় আসে, তাহলেই কিন্তু শুধুমাত্র তারা ভবিষ্যতে ভালো ব্যবসা করতে পারবে।

বাণিজ্য প্রতিদিন: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় বীমা খাতে যে বড় গ্যাপ রয়েছে, তা কীভাবে সামঞ্জস্য করা যায়?

শহিদুল ইসলাম জাহিদ: আমরা যেটা এখন এই মুহূর্তে স্বপ্ন দেখছি যে, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি—এটা আজ বাদে খুব বেশি না, এক দশকের ব্যবধানেই। এখন তো প্রায় ৪৬০ বা ৫০০ বিলিয়নের মধ্যে চলে গিয়েছে (কাছাকাছি)। তো এটা ডাবল করতে হবে। তাহলে এখানে কিন্তু একটা সামগ্রিক পরিকল্পনা দরকার হবে।

অর্থনীতির যে সেক্টরগুলো বললাম—যেখানে আপনার পুঁজিবাজার আছে, ব্যাংকিং সেক্টর আছে, বন্ড মার্কেট আছে। আমি আপনাকে একটা পরিসংখ্যান দিই—কোনো উন্নত দেশে সাধারণত বন্ড মার্কেটের যে ক্যাপাসিটি, এটা জিডিপির চেয়ে ১০০%-এর উপরে, ১২০%-এর ঘরে চলে যায়। পুঁজিবাজার এটা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের ঘরে থাকে। ব্যাংকিং মার্কেট এটা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের ঘরে থাকে। ইনস্যুরেন্স সেক্টর এটা ৮ থেকে ১০ শতাংশের ঘরে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে সব ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে আছি।

আপনি জানেন, আমাদের পুঁজিবাজার থেকে পুঁজি নিয়ে কেউ শিল্পকারখানা তৈরি করতে পারে? আমার কাছে মনে হয় না। এখানে ব্যাংকিং সেক্টর এটা একদম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে, আস্থাহীনতায় ভুগছে। বন্ড মার্কেট আমরা ডেভেলপই করতে পারিনি। বেসরকারি খাতে বন্ড—এই ইসলামিক বন্ড বা সুকুক, বিভিন্ন নাম দিয়ে বিগত সরকার যা করে গেছে, জনগণ আর এখানে মুখী হবে না, বা হলেও সময় লাগবে।

তার চেয়ে বড় কথা, ইনস্যুরেন্স নিয়ে যেহেতু আমরা পার্টিকুলারলি আলোচনা করছি—জিডিপিতে ইনস্যুরেন্সের যে অবদান, এটা আমাদেরকে মিনিমাম তিন থেকে চার শতাংশের ঘরে নিয়ে যেতে হবে। এটা খুব ড্রাস্টিক পরিকল্পনা করা দরকার। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল যারা আছেন—মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে, আমরা সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে মাননীয় মন্ত্রী থেকে শুরু করে, রেগুলেটরি পর্যায়ে যারা আছেন—তাদের একটা সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার যে, একটা দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করতে হবে।
কোম্পানিগুলো যারা পিছিয়ে আছে, তাদেরকে নৈতিক সহযোগিতা দিতে হবে। এখানে যে দুর্নীতিগুলো আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। এবং সর্বোপরি একটা সিস্টেমেটিক অ্যাপ্রোচের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

এই যে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, হয়রানিমূলক যে ব্যবস্থা—এ সমস্তগুলো থেকে বের হয়ে আসার জন্য আমার কাছে মনে হয় টেকনোলজি একটা সলিউশন হতে পারে। এখানে ফিনান্সিয়াল টেকনোলজি, টেকনোলজিক্যাল অ্যাডাপশন—বিভিন্ন মডেল আছে। বাইরের দেশগুলো যদি করতে পারে, আমরা কেন পারবো না?

আমি আপনাকে একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। আমরা যখন বিদেশে পড়তে গিয়েছি, তখন আমাদের ক্লাস শুরু হওয়ার সময়ই বলা হলো যে ইনস্যুরেন্স করতে হবে। তো ৫০০০ টাকা ইনস্যুরেন্সের প্রিমিয়াম ছিল (ওই দেশের মুদ্রা ৫ হাজার)। এখন আমার যখন ডিগ্রি হয়ে গেছে, তখন বিভিন্ন জায়গা থেকে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে আসতে হয়। ইউনিভার্সিটি কো-অপ বলে একটা—মানে একটা দোকানের মতো, যেখানে অনেক ফ্যাসিলিটিজ পাওয়া যায়।

ওখানে গিয়ে যদি আমরা কোনো কিছু পারচেজ করি, আমার দ্বারা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোনো কিছু, তাহলে ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ওই ৫ হাজার টাকার এগেইনস্টে এই কভারেজটা দিয়ে দেবে। এখন আমরা তো ভুলেই গিয়েছি। ডিগ্রি করতে গিয়েছি—ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ার, ফোর্থ ইয়ার শেষ করে যখন আমরা ক্লিয়ারেন্সের জন্য গিয়েছি, তো মনে করেছি উনি একটা সিগনেচার দিয়ে দেবেন।

সাথে সাথে আমাকে সেই ৫ হাজার টাকা দিয়ে দিলেন। আমি তো অবাক হয়ে গেলাম—এটা কিসের ৫ হাজার টাকা! বললেন—ওই যে তোমরা যখন ফার্স্ট ইয়ারে এসে ভর্তি হয়েছিলে, পিএইচডির প্রথম বর্ষে, তখন তোমাদের বৃত্তি থেকে এই ৫ হাজার টাকা কেটে রাখা হয়েছিল (৫ হাজার ইয়েন কেটে রাখা হয়েছিল)। সেটা তোমার দ্বারা এখানে কোনো ক্ষতি হয়নি। সুতরাং এটা তুমি পুরোটা ফেরত পাচ্ছ।

এই যে তাদের প্রতি যে মনটাই ভরে গেল! আমাকে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে হয়নি। আমার মনে করতেও হয়নি—আমরা যারা ভুলেই গিয়েছি, কোম্পানি আমাকে স্বউদ্যোগে, স্বপ্রণোদিত হয়ে তারা আমাকে এই টাকাটা দিয়ে দিল। দেখেন, টাকার পরিমাণ বেশি না। কিন্তু তাদের যে আন্তরিকতা, তাদের যে সময়ানুবর্তিতা, মানুষের প্রতি যে দরদ, ভালোবাসা—এটাই কিন্তু আজকে একটা উদাহরণ।

আজকে আপনার প্রোগ্রামে এসে এই সাধারণ দর্শকবৃন্দের উদ্দেশ্যে আমরা এটা উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করছি। আমাদের দেশে কবে হবে সেটা? যে আপনার ম্যাচিউরিটি বা আপনার পলিসি ডিউ হওয়ার আগে আপনার কাছে একটা এসএমএস চলে যাবে—যে আপনার অ্যাকাউন্ট নাম্বার ঠিক আছে কিনা, বা আপনার নামধাম ঠিক আছে কিনা, আপনার নমিনির নাম ঠিক আছে কিনা।

আজ বাদে কাল, যখন ১৬ তারিখে যদি আপনার এটা ম্যাচিউরড হয়, সেটা ১৫ তারিখে বা ১৫ তারিখ দিবাগত রাতেই তার অ্যাকাউন্টে টাকাটা চলে যাবে। মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সিস্টেমের মাধ্যমে তার ব্যালেন্সে এই টাকাটা যোগ হবে।
তারা কতই না উৎসাহিত হতো! এবং উৎসাহিত হলে তারা কিন্তু আসলে সামষ্টিকভাবে এগিয়ে আসবে। দেখুন, ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর চিন্তা করা উচিত—যদি এই মানুষ তাদেরকে সহযোগিতা না করে, তাহলে কিন্তু কোম্পানি টিকে থাকবে না। আপনি দেউলিয়া হয়ে যাবেন।

অনেক বড় বড় ব্যাংক—দেখেন, নামকরা ব্যাংক ছিল—আজকে ডিপোজিট পাচ্ছে না, তারল্য সংকটে ভুগছে, মার্জ হয়ে যাচ্ছে, দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে, অবসায়নে চলে যাচ্ছে। আমরা ইনস্যুরেন্স সেক্টরের বন্ধু হিসেবে বলছি—আমরা ওই ধরনের সিচুয়েশন চাই না।

আমরা চাই বাংলাদেশে ইনস্যুরেন্সের খুবই ভাইব্রান্ট ব্যবসা হোক, লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তরিত হোক। সেজন্য গণমুখী বীমা পলিসি আপনারা গ্রহণ করুন।

বাণিজ্য প্রতিদিন: আইডিআরএতে নেতৃত্ব শূন্যতা, ফি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং বর্তমান অস্থিরতার কারণে বীমা খাতের যে সংকট তৈরি হয়েছে, আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

শহিদুল ইসলাম জাহিদ: একটা তো হচ্ছে থিওরি, আরেকটা হচ্ছে প্র্যাকটিস। থিওরিটিক্যালি বলতে গেলে এরা তাদের নবায়ন ফি পরিশোধ করেনি। অনেকে হয়তো বলেছে—আপনার পত্রিকাতে দেখলাম—তারা হয়তো নবায়ন ফি দিয়েছে, কিন্তু অ্যাক্টিভেশনটা হয়নি। এর কারণটা হচ্ছে যে, এই মুহূর্তে দুটি বড় প্রতিষ্ঠানের কথা বলি—রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ বীমা—দুই ক্ষেত্রেই ম্যানেজমেন্টে কর্তা ব্যক্তির যে সর্বোচ্চ পদ, চেয়ারম্যান—এখানে খালি হয়েছে; উনারা পদত্যাগ করেছেন।
ওনাদের অবদানকে আমরা স্বীকার করি, ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু সাথে সাথে এটা ঠিক যে, এই পলিসিটা যেভাবে নেওয়া হয়েছে—যে প্রতিবছর নবায়ন ফি—এটা তো এককালীনও নেওয়া যেতে পারতো। এই যে দেখেন, কোনো কারণে আজকে হয়তো এই চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেছেন, আজ বাদে কাল যদি আরেকটা চেয়ারম্যান… মানে একটা ব্যক্তির জন্য এই যে বিজনেসের কন্টিনিউইটি বা চলমানতা—এইটা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, এটা তো খুবই দুঃখজনক।

একটা ব্যক্তির জন্য কেন একটা শিল্প, একটা ইকোনমি, একটা প্রক্রিয়া—এটা দীর্ঘায়িত হবে! এখানে হতেই পারে যে ভারপ্রাপ্ত যিনি আছেন, যদি না থাকেন, তাহলে তার নিচের যিনি আছেন, তিনি সিগনেচার করবেন। তার চেয়েও বড় কথা, এগুলো অটোমেশনে যাওয়া উচিত।

এটা যদি—আমি জানি না—এই যে নবায়ন ফি প্রতিবছর দিতে হবে, এবং এটা তাদের সাথে আলোচনা করে ঠিক করা হয়েছে কিনা; তবে এই প্রক্রিয়াটা স্বল্পমেয়াদি করাটা ঠিক হয় না। একটা বিজনেস তো হচ্ছে কন্টিনিউইটি প্রিন্সিপাল—বলি, এরা দীর্ঘমেয়াদি লিমিটেড কোম্পানি যদি হয়, এ মেয়াদকাল আমরা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারি না। তাহলে যেটা—কোম্পানির মেয়াদকাল সুনির্দিষ্ট না—তাহলে তার বিজনেস কন্টিনিউইটিটা আমরা শুধুমাত্র এক বছরের জন্য দিচ্ছি—এরকম না।
এটা যদি নিতেই হয়, এটা প্রতি ১০ বছর পরপর বা আরও বেশি মেয়াদের জন্য নেওয়া উচিত। যাতে করে এই ব্যক্তির জন্য কোনো বিজনেসের বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম, দক্ষতা বা বিজনেস অ্যাক্টিভিটিজ—যে ব্যবসায়িক কার্যক্রম—এটা প্রশ্নের সম্মুখীন না হয়।

এটা সত্যিই খারাপ শোনা যাচ্ছে যে এরা অবৈধভাবে ব্যবসা করছে। আসলে তো অবৈধ না—মানে থিওরিটিক্যালি অবৈধ মনে হচ্ছে, আইনের ফাঁক-ফোকর যদি বলেন। কিন্তু প্র্যাকটিক্যালি তারা বৈধ সত্তা। এরা ইতিমধ্যে লাইসেন্স পেয়েছে এবং তারা অনেক ইস্যুর নামের সাথে ব্যবসা করছে। তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। তবে স্থবিরতা হয়তো অচিরেই কাটিয়ে উঠবে।
আমাদের রিকোয়েস্ট থাকবে যে, যেকোনো পলিসি গ্রহণের আগে এর প্রোস অ্যান্ড কনস—এটা কতটুকু আসলে ফিজিবল—এটা আগে থেকে একটু চিন্তা করা দরকার।

আমি সর্বোপরি বলতে চাই যে, বাংলাদেশে ইনস্যুরেন্স সেক্টর ডেভেলপমেন্টের জন্য গবেষণার যে প্রয়োজনীয়তা—এটা কিন্তু আমরা সময়ে সময়ে উপেক্ষা করে এসেছি। দেখুন, এই যে ইস্যুটা আসলো—এটাও যদি একটা ছোটখাটো গবেষণা করে, বা যারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আছেন তাদের মতামত নেওয়া, একটা আলোচনার পর্যায়ে নিয়ে আসা—সেটাও যদি হতো যে এক বছর পরপর টাকা দেওয়া—এটা কতটুকু আসলে যুক্তিসংগত।

এরকম যদি আমরা গবেষণার ভিত্তিতে, আলোচনার ভিত্তিতে, পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে—এক কথায় হচ্ছে বাজারটাকে যদি আমরা সফল হতে দিই—দ্যাট মিন চাহিদা এবং যোগান এই দুইটা। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এটা আমরা বারবার বলি—যেখানে চাহিদা এবং যোগান এখানে ইন্টারসেকশন করে ইকুইলিব্রিয়াম হয়, সেখানেই আপনার ইকুইলিব্রিয়াম প্রাইস এবং ইকুইলিব্রিয়াম কোয়ান্টিটি সেট হওয়া উচিত।

আমরা এমন কোনো রেগুলেশন নিয়ে আসলাম সাপ্লাই সাইড থেকে, যেটা ডিমান্ড সাইড গ্রহণ করতে পারলো না; আবার যদি এমন চাহিদা সৃষ্টি হলো, সেটা হয়তো সাপ্লাই সাইড তথা রেগুলেটরি অথরিটি বন্দোবস্ত দিতে পারলো না—তাহলে তো হবে না।
ঐক্যমতের ভিত্তিতে, উইন-উইন সিচুয়েশনে বিজনেস করতে হবে। আমরা কোম্পানিগুলোকে দোষারোপ করলে হবে না। তাদের প্রতিও একটা সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে আমাদের রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের কাজ করা উচিত—বলে আমি প্রত্যাশা করি।

বাণিজ্য প্রতিদিন: স্যার, আপনার গুরুত্বপূর্ণ সময় থেকে আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য বাণিজ্য প্রতিদিনের পক্ষ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

শহিদুল ইসলাম জাহিদ: আপনাকেও অশেষ ধন্যবাদ।

শেয়ার

পাঠকের মতামত

শরিয়াহ ভিত্তিক বিনিয়োগে নতুন দিগন্ত সন্ধানী এএমএল এসএলএফএল শরিয়াহ ফান্ড

শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগে মিউচ্যুয়াল ফান্ড বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে শক্ত অবস্থান ...

আরিফ হোসেন খান রেমিট্যান্স পাঠানোর সহজ মাধ্যম এমএফএস

রেমিট্যান্স আহরণের নতুন দিগন্ত মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। মূহূর্তের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এমএফএসের একাউন্ট থেকে এটিএম এর ...

মোহাম্মদ আলী রেমিট্যান্স আহরণের অন্যতম স্টেকহোল্ডার পূবালী ব্যাংক

প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ সহজে এবং নিরাপদে পরিবারের হাতে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে পূবালী ব্যাংক। ...

ড. আখতার হোসেন প্রবাসীদের জন্য সহজে বিনিয়োগের সুযোগ সরকারকে করে দিতে হবে

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. মোহাম্মদ আখতার হোসেন। গত জুলাই মাসে ...

এস এম আবু জাফর আল আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, প্রবাসীদের বিশ্বস্ততার সঙ্গী

৫ বছর ধরে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষ সপ্তম অবস্থানে রয়েছে আল আরাফাহ্ ইসলামী ...