ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬ ৯:৩৬ এএম , আপডেট: মে ২০, ২০২৬ ১০:২৫ এএম

এক অনিন্দ্য সুন্দর পৃথিবীর বাসিন্দা আমরা । রূপ-রসে ভরা এ জগতে পায়ের নীচে কোমল মাটির মখমল সদৃশ বিছানা, মাথার উপর হাজার তারার সামিয়ানা, নদীর কুলকুল স্রোতধারা, পাখির কলকাকলী, মৃদুমন্দ সমীরণের মায়াময় স্পর্শ, কোথাও কুলহীন মহাসাগরের নীল জলরাশি আবার কোথাও বা আদিগন্ত বালুর মহাসাগর! কী অপূর্ব এক দুনিয়া উপহার দিয়েছেন এর স্রষ্টা! কবির ভাষায়ঃ “বাতাস আমারে ঘিরে খেলা করে মোর চারিপাশ/ অনন্তের কত কথা কহে নিতি নীলিমা আকাশ / চাঁদের মধুর হাসি, বিশ্বমুখে পুলক চুম্বন/ মিটি মিটি চেয়ে থাকা তারকার করুণ নয়ন/ বসন্ত নিদাঘ শোভা, বিকশিত কুসুমের হাসি/ দিকে দিকে শুধু গান, শুধু প্রেম ভালবাসা-বাসি।’’

অফুরন্ত সৌন্দর্যের এই মায়া ভরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। জগত জোড়া এত সব উপকরণ সবই মানুষের সেবায় নিয়োজিত। মানুষের ভোগ ব্যবহারের জন্যই হাজারো উপকরণে থরে থরে সাজানো এ ধরা। মানুষের মাঝেও রয়েছে নানা বৈচিত্র- বর্ণে, ভাষায়, স্বাদ ও রুচিতে। কেউ সাদা পসন্দ করে তো কেউ লাল বা গোলাপী। কেউ মিষ্টি পসন্দ করে তো কেউ ঝাল বা টক। কিন্তু একটি জায়গায় এসে এই বিচিত্র ভাষা, বর্ণ ও স্বাদের মানুষ এক হয়ে যায়। সেটি হচ্ছে তার মৌলিক প্রয়োজনগুলো। এখানে এসে সব ধারা, সব বর্ণ একাকার হয়ে গেছে । মানুষ মাত্রই কিছুক্ষণ পরে ক্ষুধার্ত হয় এবং জীবন বাঁচানোর জন্য তখনপ্রয়োজন হয় খাদ্য। এর পরে তার লজ্জা নিবারন, দেহের শোভা বর্ধণের জন্য বস্ত্র, মাথার উপরে ছাদ, অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসা তথা নিরাময় এবং তার আত্মিক উন্নয়ন তথা অজানাকে জানার জন্য শিক্ষা। এই পাঁচটি প্রয়োজনের অনুভুতি থেকে কোনো মানুষই মুক্ত নয় এবং এই প্রয়োজনগুলো পূরণের জন্য সে স্বয়ংক্রিয় ভাবেই তৎপর হয়ে উঠে। মানুষ তথা এ বিশ্বের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক তাঁর সীমাহীন প্রজ্ঞা দিয়ে এই প্রয়োজনগুলো পূরণের সব উপকরণ দিয়েরেখেছেন পৃথিবীর বুকের মাঝেই এবং মানুষকে দিয়েছেন তা আহরণ করার বুদ্ধি ও কৌশল। বেঁচে থাকার জন্য যে জিনিস যত বেশি প্রয়োজন, তার সরবরাহ তত বেশি করেছেন এবং কিছু দিয়েছেন মানুষের কোনো রকম চেষ্টা সাধনা ছাড়াই। যেমন অক্সিজেন- যা না হলে আমরা দু‘মিনিটও বাঁচতে পারতাম না।এটি বিনামূল্যে এবং কোনো রকম তৎপরতা ছাড়াই আমরা পেয়ে যাচ্ছি এবং শুধু পেয়েই যাচ্ছি না ; মানুষ সর্বদাই জীবন ধারনের জন্য এই অতিপ্রয়োজনীয়ও অপরিহার্য উপকরণটির সাগরে সাঁতার কাটছে তা অনেক সময় সে বুঝতেই পারে না। শুধু হাসপাতালের বেডে শুয়ে যখন অক্সিজেনের সিলিন্ডার লাগিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস করতে হয়, তখন বুঝা যায় যে, কী পরিমাণ অনুগ্রহ করছেন মানুষের স্রষ্টা ! এমনি করে পানির সরবরাহও বলা যায় অফুরন্ত এবং কোনোধরনের চেষ্টা প্রচেষ্টা ছাড়াই মানুষ পাচ্ছে। গোটা পৃথিবীর চারভাগের তিনভাগই পানি দিয়ে ভরে রেখেছেন তিনি।

কিন্তু অপরিসীম প্রজ্ঞা ও হিকমতের অধিকারী সেই মহান স্রষ্টা উপরোল্লিখিত পাঁচটি মৌলিক প্রয়োজন পূরণের বিষয়টি মানুষের জন্য আয়াস সাধ্য করেদিয়েছেন অর্থাৎ কষ্ট করে তা উপার্জন করতে হবে ধরণীর বুক থেকে শ্রম, মেহনত, মূলধন ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। এখানে স্বয়ংক্রিয় সরবরাহের (অটো সাপ্লাই) কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। এর পেছনে যে বিশাল প্রজ্ঞা ও কল্যাণ নিহিত আছে তা এখানে বিস্তারিত আলাপের সুযোগ নেই। শুধু এতটুকুনই বলা যায় যে, মানুষের প্রচেষ্টার আওতাধীন করে দিয়ে মানুষকেই তিনি বড় করেছেন ; মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করেছেন এবং মানব সভ্যতার ধারাবাহিক উন্নতি ও সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছেন। প্রয়োজনীয় প্রতিটি বস্তুই তিনি সৃষ্টি করেছেন ; একটিও মানুষের সৃষ্টি করার সাধ্য নেই, শুধুমাত্র প্রকৃতির কোল থেকে সংগ্রহ করার শ্রম ও চেষ্টাটুকুই মানুষকে করতে হয়। মানুষের যোগ্যতার মধ্যেও পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন যার ফলে মানুষ পৃথিবীতে পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে আছে এবংবিশাল এই জগত সংসারটি সুন্দর ও সুচারু রূপে চলছে। পরস্পরের উপর নির্ভরশীলতার জন্য সম্পদের পাশাপাশি সেবার ( সার্ভিস ) একটি বিশাল চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। এই উপকরণগুলো যদি অটো সাপ্লাই বা স্বয়ংক্রিয় সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতো তাহলে মানব সভ্যতা তার আদিম স্তর অতিক্রম করতে পারতো না।

এখানে আরও উল্লেখযোগ্য যে, মৌলিক প্রয়োজনটুকুই শেষ নয় এটি হলো জীবন ধারণের জন্য অত্যাবশ্যক। এর বাইরেও মানুষের অসংখ্য প্রয়োজন বা অভাববোধ রয়েছে। একটি প্রয়োজন পূরণ হলেই মানুষের আরেকটি অভাববোধ সামনে এসে দাঁড়ায়। একটু স্বাচ্ছন্দ, একটু আরাম, ভবিষ্যতের সঞ্চয়, দুর্দিনের সম্বল ইত্যাদির কথা মাথায় রেখে মানুষ তার প্রয়োজনের সামগ্রী তথা সম্পদ আহরণ করতে সচেষ্ট থাকে। শ্রম সাধনা বিনিয়োগ করে প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী যোগাড় করতে হয় বলেই মানুষের চাহিদার তুলনায় এর সরবরাহ অপেক্ষাকৃত অপ্রতুল এবং ব্যয়বহুল। মানুষের কর্মের সিংহভাগ জুড়েইথাকে জীবন জীবিকা সংগ্রহের এই তৎপরতা। এই কর্মকান্ডকেই অর্থনৈতিক কার্যাবলী হিসেবে গন্য করা হয়।

উল্লেখ্য যে, তাবত দুনিয়ার মানুষ এই সম্পদ উপার্জন করার প্রচেষ্টায় লেগে থাকে বলে এখানে একটি প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। আবার মানুষের সক্ষমতার মধ্েয তারতম্য আছে বলে সম্পদ অর্জন বা আহরণেও পার্থক্য সৃষ্টি হয়। তাই সম্পদ ও সেবার উৎপাদন, বন্টন, ভোগ ও ব্যবহারের একটি নীতিমালা গড়ে উঠেছে এবং সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে এই নীতিমালাতেও সংশোধন আসছে। সামাজিক বিজ্ঞানের যে শাখা দ্রব্য-সামগ্রী ও সেবার উৎপাদন, বরাদ্দ, বন্টন ও ভোগ ব্যবহারের এবং ভোক্তার আচরণবিধি আলোচনা করে তাকেই অর্থনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি নিয়ে আলোচনা করে বলে অর্থনীতিকে বেশ কিছু ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন পুঁজিবাদী অর্থনীতি, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, মিশ্র অর্থনীতি ইত্যাদি। এর কোনোটি ব্যক্তিকে সম্পদের নিরংকুশ মালিকানা দেয় এবং ব্যক্তি তার মেধা, যোগ্যতা, শ্রম ও মূলধন বিনিয়োগ করে একচ্ছত্র মালিক হয় এবং তার উপার্জিত সম্পদ ইচ্ছামত ভোগ ব্যবহার করতে পারে। এখানে রাষ্ট্র ও সমাজ কোনো হস্তক্ষেপ করে না। এটিই পুঁজিবাদী অর্থনীতি।

সমাজতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থায় ব্যক্তির কোনো মালিকানাই স্বীকার করে না। সেখানে মানুষকে অনেকটা যান্ত্রিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সম্পদেরমালিক হবে রাষ্ট্র বা সমাজ। রাষ্ট্র ও সমাজের সদস্য হিসেবে ব্যক্তি মানুষ সম্পদ উপার্জনে তার যোগ্যতা অনুযায়ী শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ করবে এবংউৎপাদিত সম্পদ যৌথ বা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চলে যাবে। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিকে তার প্রয়োজন পূরণ কল্পে রাষ্ট্র থেকে প্রয়োজনীয় সম্পদ বরাদ্দ দিবে। মিশ্র অর্থনীতির ধারণাটি হলো, এখানে ব্যক্তির মালিকানা স্বীকার করে কিন্তু বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনবোধে রাষ্ট্র তার উপর কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।

এভাবে ইসলামেরও একটি অর্থনৈতিক বিধান আছে। বলা যায় যে, ইসলামের বিধিবিধান অনুসারে উৎপাদন, বরাদ্দ, বন্টন ও ভোগ-ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে যে শাস্ত্র আলোচনা করে সেটাই ইসলামী অর্থনীতি। ইসলাম একটি বিশ্বজনীন ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা যা এ বিশ্বের স্রষ্টা তাঁর মনোনীত নবী-রাসূলদের মাধ্যমে মানব জাতি তথা সমগ্র সৃষ্টি জগতের কল্যাণের জন্য দান করেছেন। মানুষের জীবনের পরিধি যতটা বিস্তৃত, ইসলামের পরিধিও ততটাই ব্যাপক। তার ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে বৈশ্বিক সমাজের সাথে তার সম্পর্ক পর্যন্ত সর্বত্রই ইসলামের দিক নির্দেশনা রয়েছে। আর্থিক কর্মকান্ড যেহেতুমানব জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সিংহভাগ কাজই এই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ঘিরেই আবর্তিত হয় ; তাই এখানেও ইসলামের রয়েছে একটি সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা ও মূল্যবোধ।

ইসলামী অর্থনীতির সংজ্ঞা দিয়েছেন অনেক প্রথিতযশা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ। এদের মধ্যে রয়েছেন ড.এম উমর চাপরা, প্রফেসর খুরশীদ আহমদ, ড. নেজাত উল্লাহ সিদ্দিকী, প্রফেসর ড. এম এ মান্নান, এস এম হাসানুজ্জামান প্রমুখ। প্রবন্ধের কলেবর বড় হয়ে যাওয়ায় আমি এ সমস্ত সংজ্ঞা এখানে উদ্ধৃত করছি না। আগ্রহী পাঠক এ সমস্ত স্কলারদের লেখা বইগুলোর উপর চোখ বুলাতে পারেন। তবে এতটুকুন বলা যায় যে, ভাষা ও শব্দের কিছু পার্থক্য বাদ দিলে সবার কথার মূল সুর কিন্তু একই। অর্থাৎ ইসলামী অর্থনীতি হচ্ছে জ্ঞানের সেই শাখা, যা ইসলামের শিক্ষা ও নির্দেশনার সাথে সঙ্গতি রেখে দুষ্প্রাপ্য সম্পদের বন্টন ও বরাদ্দের মাধ্যমে এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা অযথা খর্ব, সামষ্টিক অর্থনীতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি না করে মানবীয় কল্যাণ অর্জনে সহায়তা করে।

সংজ্ঞাসমূহ বিশ্লেষন করলে নিন্মে বর্ণিত বিষয়গুলো পাওয়া যায়ঃ

১। ইসলামের শিক্ষা ও নির্দেশনা এককথায় ইসলামী শরীআহ অনুসরণ। ২। উৎপাদন ও বন্টনের ক্ষেত্রে ইনসাফ বা ন্যায়পরায়নতা নিশ্চিত করা। ৩। ব্যক্তির স্বাধীনতায় অহেতুক হস্তক্ষেপ না করা। ৪।ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা। ৫। পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা। ৬। মানব কল্যাণের বিষয়টির প্রাধান্য দেয়া।
ইসলামী অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে একটি পরিস্কার ধারণা পাওয়ার জন্য আমরা এই ব্যবস্থার দার্শনিক ভিত্তি বা বিশ্ব দর্শন সম্পর্কে একেবারেইসংক্ষিপ্ত কিছু কথা আলোচনা করা জরুরি মনে করছি ।

“ইসলামের নিগুঢ় উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের জীবন, আকীদা-বিশ্বাস, বুদ্ধি, সন্তান-সন্ততি এবং সম্পদের সংরক্ষণ করা। যা কিছু এই পাঁচটি বিষয়ের সংরক্ষণনিশ্চিত করে, তাই জনকল্যাণ বলে বিবেচিত এবং সেটাই হওয়া উচিত -কথাগুলো বলেছেন ঈমাম আল গাজ্জালী। তেমনি ইসলামী শরী’আহ’র ভিত্তিপ্রসঙ্গে মনীষী ইবনুল কাইয়েম বলেছেন, “শরী’আহ’র ভিত্তি হচ্ছে মানুষের জ্ঞান ও পরকালের কল্যাণ সাধন। আর কল্যাণ নিহিত রয়েছে সার্বিকন্যায়বিচার, দয়া, সুখ-সমৃদ্ধি ও জ্ঞানের মধ্যে। যেখানে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে নির্যাতন, দয়ার পরিবর্তে কঠোরতা, কল্যাণের পরিবর্তে কার্পণ্য এবং জ্ঞানেরপরিবর্তে মুর্খতা স্থান পায়, সেখানে শরী’আহ এর কিছু করণীয় নেই।”

তিনটি মৌলনীতির উপর ইসলামী অর্থব্যবস্থার দার্শনিক ভিত্তি স্থাপিত। তাওহীদ, খেলাফত ও আদালত বা ন্যায়বিচার। এই বিষয়টি প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদড. উমর চাপরা তার ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নামক সাড়া জাগানো গ্রন্থে চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আমরা এখানে বিষয়টি সংক্ষেপেআলোচনা করার চেষ্টা করবো ইনশা আল্লাহ!
তাওহীদ : ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা তথা গোটা জীবন দর্শনের প্রথম ও প্রধান ভিত্তিই হলো তাওহীদ বা একত্ববাদ। তাওহীদ মানে শুধু স্রষ্টা একজন এটুকুই নয়।তাওহীদ মানে আল্লাহর একক ও অখন্ড সার্বভৌমত্ব। আকাশ ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে এর পুরোটার স্রষ্টা একজনই বাকি সবই সৃষ্টি।এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষনায় এই গ্রহে তথা পৃথিবীতে প্রজাতির ধারণা পেয়েছেন প্রায় আট মিলিয়ন বা আশি লক্ষ। এর বাইরে আরও যে গ্রহনক্ষত্র আছে সেখানে কত কি আছে তার ইয়ত্তা করবে কে ? যতটুকু ধারণা এখন পর্যন্ত মানুষ পেয়েছে তা শ্রেণিবিন্যাসিত করতেই আরও এক হাজার বছরলেগে যাবে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তারা আরও বলেছেন যে, অনেক প্রজাতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার আগেই তা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আমাদেরআলোচনা বিজ্ঞান নিয়ে নয় । শুধুমাত্র একটা ধারণা পাওয়ার জন্য বলা যে, মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি এবং আমাদের ধারণার চেয়েও এমহাবিশ্ব কত বিশাল ! সৌরজগতের একটি নক্ষত্র বা একটি ছায়াপথের কথা আলোচনা করলেই তো আমাদের পিলে চমকে যায়। সূর্য পৃথিবীর চেয়ে তেরলক্ষ গুন বড় বলা হয়েছে এবং এক একটা তারকা বা নক্ষত্র সূর্যেও চেয়েও লক্ষ লক্ষ গুন বড়। এমন সহস্র সহস্র নক্ষত্র একত্রিত হয়ে তৈরী হয় ছায়াপথ।এমন কত হাজারো ছায়াপথ ঘুরে বেড়াচ্ছে মহাশূন্যে তার কোনো পরিসংখ্যান আমাদের জানা আছে কি ? আবার এসব ছায়াপথ যখন ব্লাক হোল বা কালোগর্তের আওতায় আসে তখন গোটা গ্যালাক্সী বা ছায়াপথটাই এই ব্লাক হোলের পেটে চলে যায়। এমন কত ব্লাক হোল মহাশূণ্যে বিরাজ করছে আমরা তারকতটুকুই বা জানি ? মহাবিশ্বের বিশালতা তাহলে কত বড় ! আমাদের চিন্তাও সে পর্যন্ত পৌঁছা কঠিন।

তাওহীদের মূল কথা হচ্ছে এই বিশাল মহাবিশ্বের স্রষ্টা, পরিচালক, নিয়ন্ত্রক, রক্ষণাবেক্ষনকারী কেবলই একজন। বাকি সব তাঁর সৃষ্টি। এই সৃষ্টিকুলেরইএকটি শাখা মানুষ। তাওহীদের এই নিগুঢ় সত্য মানুষে মানুষে যেমন মৈত্রী, ভালবাসা ও ঐক্যের সুর শুনিয়ে যায় ; তেমনি গোটা সৃষ্টিকুলের সাথেও মানুষের এক চমৎকার সেতুবন্ধনের কথা বলে যায়। অর্থাৎ সব সৃষ্টি, মাত্র একজনই স্রষ্টা। তিনি কারোর মত নন, কারোর জাতি বা প্রজাতি নন । তিনি তাঁরই মত, তাঁর কোনো উপমা তুলনা নেই। তার উপমা তিনিই। সুতরাং ইসলামের অর্থনীতির এটি একটি মূলনীতি যে, এখানে কারোর কোনো বিশেষ অধিকার বাজন্মসূত্রে অধিকারের সুযোগ নেই এবং বাকি সৃষ্টিকুলের সাথে যথেচ্ছাচারেরও কোনো সুযোগ নেই।

খেলাফতঃ দ্বিতীয় মূলনীতি হচ্ছে খেলাফত বা প্রতিনিধিত্ব। মানুষ পৃথিবীতে স্রষ্টার খলিফা বা প্রতিনিধি ( আল ইমরান : ৩০, আনয়াম : ১৬৫, ফাতির : ৩৯, সোয়াদ : ২৮ এবং আল হাদীদ : ৭০ ) । প্রতিনিধিত্বের এই দায়িত্ব কার্যকরভাবে এবং যোগ্যতার সাথে পালন করার জন্যমানুষকে সব ধরনের আত্মিক, মানসিক ও বস্তুগত সম্পদে বৈশিষ্টমন্ডিত করা হয়েছে। খলিফা হিসেবে তাকে দেয়া হয়েছে এক ধরনের সীমিত স্বাধীনতা, যারফলে সে স্বাধীনভাবে চিন্তা-ভাবনা করে ভুল বা সঠিক, ন্যায় বা অন্যায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং মানব জীবনের অবস্থা, তার সমাজ বা ইতিহাসের গতিপথপাল্টে দিতে পারে। এ বিশ^ চরাচরে আল্লাহ তায়ালা যে সম্পদরাজি সৃষ্টি করে দিয়েছেন তা সর্বযুগের সকল মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য যথেষ্ট। শুধুপ্রয়োজন এ সম্পদের দক্ষ ও ন্যায়ভিত্তিক বন্টন এবং খলিফার দায়িত্ব হলো বন্টনের এই ন্যায় ভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিৎ করা। গতানুগতিক একটি ধারণা বামতামত আছে যেটি পূঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেটি হলো মানুষের অভাব অসীম কিন্তু সম্পদ সীমাবদ্ধ বা অপ্রতুল।ইসলাম এটি মনে করে না ; বরং সম্পদের অন্যায্য বন্টন ব্যবস্থার কারণেই পৃথিবীর বৃহত্তর মানব গোষ্ঠি তাদের মৌলিক প্রয়োজনের মত সম্পদ পায় না।

আমরা আগেই বলেছি, যে জিনিসের যত বেশি প্রয়োজন তার সরবরাহের পরিমাণও তত বেশি। এটি আহরণ করে ন্যায় ভিত্তিক বন্টনের মাধ্যমেই সকল মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব এবং খলিফার মূল দায়িত্ব এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মানব কল্যাণ এবং পৃথিবীতে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করা । কেননা অভাব অসীম এটি একটি অসঙ্গত ও ভুল ধারণা। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের সেই মুহুর্তের অভাব হচ্ছে খাদ্যের। সুতরাং তাকে পরিমাণ মত খাবার দিলেই তার অভাব পূরণ করা সম্ভব। বস্ত্রহীন একজন মানুষের দেহ আবৃত করার মত প্রয়োজনীয় বস্ত্র দিলেই তার বস্ত্রের অভাব দূর করা যায়।সুতরাং অভাব অসীম নয় ; অসীম হচ্ছে মানুষের লোভ যার কোনো সীমা পরিসীমা নেই এবং তা কখনও পূরণ করা সম্ভব নয়। এ কারণেই বলা হয়, পেটের ক্ষুধা দূর করা যায় কিন্তু চোখের ক্ষুধা দূর করা যায় না। সুতরাং চাহিদা ও যোগানের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রেখে দক্ষ ও ন্যায়ভিত্তিক বন্টন ব্যবস্থার যে ঐশী নীতিমালা দেয়া হয়েছে, তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেই শুধু মানুষ নয়, সৃষ্টি জগতের সকল কিছুর কল্যাণ করা যাবে এবং ইসলামী শরী’আহ বা বিধিমালার এটাই উদ্দেশ্য যেটিকে ইসলামের পরিভাষায় ‘মাকাসিদ আল শরী’আহ’ বলা হয়। আমরা আমাদের আলোচনায় বিষয়টিকে ‘মাকাসিদ’ নামেইঅভিহিত করবো। অতএব বলা যায়, এ ধরনের একটি বন্টন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে দায়িত্ববোধ ও মাকাসিদ এবং আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞারআলোকে। যেহেতু সে খলিফা সুতরাং তার স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযোগ নেই ; কেননা তাকে মনে রাখতে হবে যে, সে একমাত্র খলিফা নয় ; কোটি কোটি মানব সন্তান যারা তার মত খলিফা এবং তারই ভাই, যারা মর্যাদা ও অধিকারে তার সমান। এমন কি অনাগত মানব সন্তান যে এখনও পৃথিবীতে আসেনি, সেও তার মতই খলিফা এবং তার ভাই। সুতরাং সম্পদ উৎপাদন, বন্টন ও ভোগ-ব্যবহারের বিষয়ে সেই ভবিষ্যত মানব গোষ্ঠির কথাও মাথায় রাখতে হবে এবং তা কেবলমাত্র মানুষের স্রষ্টার নির্দেশিত পথেই সম্ভব।

তাওহীদ ও খেলাফতের ধারণা সমাজে প্রচলিত অন্যান্য কিছু ধারণাকে বাতিল করে দেয়। যেমন কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠির সাথে আল্লাহর বিশেষ সম্পর্কআছে এবং তারা স্রষ্টার বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত। তাওহীদ ও খেলাফতের দাবী হচ্ছে সকল মানুষ এক আল্লাহর সৃষ্টি এবং বর্ণ-ভাষা বা আকৃতি নির্বিশেষে সমমর্যাদা সম্পন্ন। আল্লাহর কাছে মর্যাদার মাপকাঠি হচ্ছে তাঁকে ভয় করে চলা এবং সে আলোকে কর্ম সম্পাদন করা। মানুষ জন্মগতভাবেই পাপী, সে আদি পিতামাতার পাপ মাথায় নিয়েই পৃথিবীতে জন্ম গ্রহন করেছে এবং স্রষ্টার পুত্র এসে শুলিবিদ্ধ হয়ে সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে গেছেন এই অলীক ধারণারওপ্রতিবাদ করে তাওহীদ ও খেলাফত। মানুষের নিজের অর্জিত নয় এমন পাপ তার মাথায় চাপিয়ে দিবেন মানুষের স্রষ্টা এতটা অবিবেচক হতে পারেন না। আর জন্মগত ভাবে পাপী হলে সে পাপের জন্য মানুষ কেন শাস্তি পাবে ? প্রায়শ্চিত্ত করতে যদি কারোর আগমনের প্রয়োজন থাকতো তবে সে তো সৃষ্টির শুরুতেই আসতেন তার এত দেরীতে আসার কথা নয়। খেলাফত এসব ভ্রান্ত ধারণার প্রতিবাদ করে মানুষকে তার কর্মের প্রতি মনোযোগী করেছে এবং সৃষ্টিজগতে বিশেষ মানব গোষ্ঠি বা বিশেষ সম্প্রদায়ের বিশেষ অধিকারের ধারণাকে বাতিল করে দিয়ে সকল খলিফার অধিকারকে উচ্চকিত করেছে।

খেলাফতের ধারণা এই পৃথিবীতে মানুষকে একটি সম্মান ও মর্যাদার আসন দিয়েছে ( বনী ইসরাইল : ৭০ ) এবং তার জীবনের একটি লক্ষ্যপথ নির্ধারণ করে দিয়েছে। মানব সত্ত্বাকে উদ্দেশ্যহীন ভাবে সৃষ্টি করা হয়নি ( আল ইমরান : ১৯২ )। তাদের জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বাধীন হওয়া সত্বেও আল্লাহর দেয়া ঐশী বিধান জীবনের সর্বক্ষেত্রে মেনে নেয়া। ইসলাম এটাকেই ইবাদত বলেছে এবং ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়েছে অন্যান্য মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন যেটাকে শরী’আহর পরিভাষায় হাক্কুল ইবাদ বলা হয়েছে। তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করা এবং মাকাসিদকে বাস্তবেরূপ দান করা। এখানে অধিকারের চেয়ে দায়িত্বের উপর জোর দেয়া হয়েছে বেশি। কারণ প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলে অন্যের অধিকারসংরক্ষিত হয়ে যায়।

খেলাফতের এই ধারণা থেকে বেশ কিছু অনুসিদ্ধান্ত পাওয়া যায়ঃ

১.বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব: খেলাফতের ধারণা মানবজাতির মৌলিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের কথা বলে। প্রত্যেক মানুষই খলিফা। বর্ণ, ভাষা বা দেশ এর কারণে কারোর উপর শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা এখানে অস্বীকার করা হয়েছে। এখানে কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী, স্রষ্টার সাথে বিশেষ সম্পর্কের অমূলক ধারণাকে প্রশ্রয় দেয়া হয় না। সাদা-কালো, উঁচু-নিচু সকল মানব এক আল্লাহর সৃষ্টি এবং সবাই তাঁর খলিফা। এখানে মানুষের মর্যাদা নিরূপন করা হয় তার কর্মকান্ড, চরিত্র এবং মানবতার প্রতি সেবার ভিত্তিতে ; কারোর বংশ-গোষ্ঠি বা সম্পদের ভিত্তিতে নয়।

রাসূল সা: বলেছেন, “সমস্ত মানব সত্বাই আল্লাহর দাস এবং আল্লাহর নিকট তারাই সবচেয়ে বেশি প্রিয় যারা দাসত্বের ব্যাপারে সর্বোত্তম ” (মিশকাত আল মাসাবিহ )। “তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মহত্তম হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সচ্চরিত্রবান ” ( সহীহ বুখারী )। “আল্লাহ তোমাদের সম্পদ বা চেহারা দেখেন না ; তিনি দেখেন তোমার হৃদয় এবং কর্ম ” ( সহীহ মুসলিম )। ভ্রাতৃত্বের এই ধারণা জোর যার মুলুক তার বা ‘সারভাইভাল অব দি ফিটেষ্ট’ তথা যোগ্যতমরাই টিকে থাকবে এই জংলী নীতিকে নাকচ করে দেয়। বরং সকলের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং সমগ্র মানবজীবনকে সুন্দর করে তোলারজন্য পারস্পরিক ত্যাগ ও সহযোগিতার কথা বলে।
২.সম্পদ একটি আমানতঃ পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদের মূল মালিক হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা। মানুষ তাঁর খলিফাহিসেবে এটি আমানত হিসেবে ব্যবহার করবে। সুতরাং সম্পদের উপর মানুষের নিরংকুশ মালিকানার ধারণা ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে। আমানতদার হিসেবে ব্যক্তিমালিকানা যেমন ইসলাম স্বীকার করে তেমনি অন্যান্য অর্থনৈতিক মতবাদের মালিকানা সম্পর্কিত ধারণার সাথে একটি বৈপ্লবিক পার্থক্য সৃষ্টি করে।

প্রথমত : সম্পদ মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য নয়, সকলের কল্যাণের জন্য। গোষ্ঠি বিশেষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে যাবে এমনটা আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়।সকলের কল্যাণের জন্য ন্যায়পরতার সাথেই তা কাজে লাগাতে হবে।

দ্বিতীয়ত : সম্পদ উপার্জনের জন্য কুরআন ও সুন্নাহ অনুমোদিত বৈধ পন্থা অবলম্বন করতে হবে। যে কোনো ভাবে সম্পদ উপার্জন করা যাবে না। চাইলেই একজন জুয়ার আড্ডা বা মদের কারখানা খুলে সম্পদ উপার্জন করবে এমনটি ইসলাম অনুমোদন দেয় না। এমন করলে খেলাফতের দায়িত্বের লংঘন বলেই বিবেচিত হবে।
তৃতীয়ত: সম্পদ আয় করে যথেচ্ছভাবে ব্যয় করা যাবে না। ব্যয় করার ক্ষেত্রেও অনুমোদিত খাতেই ব্যয় করতে হবে। কেননা সম্পদের মূল মালিক হচ্ছেনআল্লাহ ; খলিফা শুধু আমানতদার। সুতরাং সে সম্পদ যেভাবে খুশী সেভাবে ব্যয় করতে পারবে না। এ আমানতদারির আরও একটি দাবী যে, সম্পদ শুধু নিজের এবং নিজের পরিবারের কল্যণের জন্যই নয়, এটি অন্যের কল্যাণেও ব্যয় করতে হবে। একজন আমানতদারের জন্য এটা শোভনীয় নয় যে, সে স্বার্থপর , লোভী ও বিবেকবর্জিত হবে আর শুধুই নিজের ভোগের বাসনাই চরিতার্থ করবে।

চতুর্থত : কেউই আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ ধ্বংস করতে পারবে না। আল কুরআন এটাকে ফাসাদ বা বিপর্যয় বলে অভিহিত করেছে। আল্লাহ ফাসাদ বা বিপর্যয়সৃষ্টিকারীকে ঘৃনা করেন ( বাকারা : ২০৫ ) । এমনকি যুদ্ধের সময়ও শত্রুপক্ষের ফসলের ক্ষেত, ফলের বাগান, বৃক্ষ ইত্যাদি ধ্বংস করা নিষেধ। এটাই যখন অবস্থা তখন চিন্তা করুন যে, মূল্য পড়ে যাবে এই আশঙ্কায় উৎপাদিত ফসল পুড়িয়ে ফেলা কিংবা সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়ার মত পূঁজিবাদী তৎপরতা কতটা ঘৃণ্য ও মানবতা বিরোধী। ইসলামে এ ধরনের কাজ বা চিন্তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

উপরের চারটি বৈশিষ্ট যদি একটু মনোযোগের সাথে আমরা লক্ষ্য করি তাহলে পরিস্কার দেখতে পাই যে, ইসলামী অর্থব্যবস্থার মৌল ভিত্তির মধ্যেই এমনএকটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা রয়েছে যেটি না মানুষকে ভোগবাদের দাস বানাতে পারে ; না খোয়ারের পশু বানাতে পারে। ব্যক্তি মালিকানার স্বীকৃতি দিয়েও তাকে কিছু নৈতিক বিধি-নিষেধ আরোপ করে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করার দিকনির্দেশনা দিয়েছে মানব কল্যাণের জন্য।এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থার অভাবেই আজকে এক শ্রেণির মুষ্টিমেয় মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়েছে এবং আয় বৈষম্যের দিক থেকে পৃথিবীকে একটি নরকে পরিণত করেছে।

৩. সাদাসিদে জীবন পদ্ধতিঃ খলিফার জীবন যাপন পদ্ধতি হবে সহজ সরল এবং বিণীত। আড়ম্বর ও জাঁকালো জীবনযাপনের বিষয়টি খেলাফতের ধারণার সাথে সঙ্গতিশীল নয়। দাম্ভিক ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপনে অপচয়-অপব্যয় বাড়ে এবং মূল্যবান সম্পদের উপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে যে সম্পদ সকল মানুষের কল্যাণের জন্য আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, সে উদ্দেশ্য পূরণের সক্ষমতা কমে যায়। এ বিষয়টিতো বর্তমান বিশ্বে এতই প্রকটভাবে আমাদের চোখের সামনে আছে যা নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর আবশ্যকতা নেই। এ ধরনের লাইফষ্টাইল মানুষকে অন্যায় ও অবৈধ পথে আয় করতে প্ররোচিত করে এবং সম্পদ বন্টনের যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া আছে সেটার বাইরে গিয়ে আয়ের বৈষম্য সৃষ্টি হয়। এটি দ্রুত মানুষের নৈতিক অধ:পতন ডেকে আনে এবং একটি মুসলিম সমাজের অপরিহার্য বৈশিষ্ট ন্যায়পরতা, সৌহার্দ ও সম্প্রীতির মত মৌলিক গুনাবলীতেও ধ্বস নামে। মানুষ প্রচন্ডভাবে আত্মকেন্দ্রিক এবং স্বার্থপর হয়ে যায়।

৪.মানব স্বাধীনতা ঃ মানুষ আল্লাহর খলিফা এবং সবাই সমান।স্রষ্টা একজন বাকি সব সৃষ্টি ; সুতরাং মানুষ দাসত্ব করবে কেবলমাত্র আল্লাহরই। সমস্ত খলিফা পরস্পর ভাই ভাই এবং সমমর্যাদার। তাই সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক কোনো ধরনের দাসত্বই ইসলাম স্বীকার করে না বরং এটাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল কুরআনে নবী মুহাম্মদ সা: এর আগমনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই বলা হয়েছে ‘মানবজাতিকে বোঝা ও শৃঙ্খল মুক্ত করা যা তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়ে থাকে ( আরাফ : ১৫৭ )। কাজেই কারোরই অধিকার নেই এমনকি রাষ্ট্রেরও এইস্বাধীনতা বাতিল করার। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক তাই চমৎকার করেই বলেছেন, ‘মায়ের পেট থেকে স্বাধীন একজন মানুষ জন্মগ্রহনের পরে কবে থেকে তোমরা তাকে দাস বানিয়েছো ?’

তবে এই স্বাধীনতা নিরংকুশ নয় যে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। তাকে শরী’আহ এর নিয়মে বাঁধা হয়েছে। এই বাঁধনের মাধ্যমে ইসলামী শরী’আহ সকলেরকল্যাণ নিশ্চিৎ করেছে। কাজেই তারা ততটাই স্বাধীন, যতটা শরী’আহ তাদেরকে স্বাধীনতা দেয় সামাজিক কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে। মানুষকে ভূমিদাসে পরিণত করা যেমন ; তেমনি স্রষ্টা কর্তৃক নির্ধারিত স্বাধীনতার সীমারেখার বাইরে স্বাধীনতা দেয়াও খেলাফতের ধারণায় যে মহত্ব ও জবাবদিহির কথা বলা হয়েছে সেটার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আদল বা ন্যায়বিচারঃ আমরা ইতোপূর্বে ভ্রাতৃত্ব ও মানুষে মানুষে সমমর্যাদার কথা বলেছি যা তাওহীদ এবং খেলাফতের অপরিহার্য অঙ্গ কিন্তু এই ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার যেটাকে ইসলামী পরিভাষায় আদালত বলা হয়েছে, সেটি না থাকলে ভ্রাতৃত্বের ধারণাটি একটি ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়। ইসলামী স্কলারগণ তাই ন্যায়বিচার বা আদালতকে মাকাসিদ আল শরী’আহ এর অপরিহার্য উপাদান বলেছেন। তারা এ ব্যাপারে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছেন যে, ন্যায়বিচার নাই এমন সমাজকে তারা একটি আদর্শ ‘মুসলিম সমাজ’ হিসেবে কল্পনাও করেন নি। মানব সমাজের সকল দিক ও বিভাগকে জুলুম থেকে মুক্ত করা ইসলামের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এটিকে সকল প্রকার অন্যায়, অবিচার, শোষন, নির্যাতন ও অপকর্মের সাথে তুলনা করা হয়েছে । ন্যায়বিচারহীনতার মাধ্যমেই একজন ব্যক্তি অন্যের অধিকার হরণ করে অথবা তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকে। সকল নবী রাসূল প্রেরণের প্রধান লক্ষ্যই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সকল প্রকার অবিচার উচ্ছেদ করা বলেই আল কুরআন স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছে ( হাদীদ :২৫ )।

“কম করে হলেও কুরআনে প্রায় শতাধিক স্থানে ন্যায় বিচারের দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করা হয়েছে ; কোথাও প্রত্যক্ষ ভাবে আদল, কিশত, মিজানের মত শব্দ ও বর্ণনাভঙ্গির সাহায্যে। এ ছাড়া জুলুম, ইসম, দালাল বা অন্যান্য শব্দের মতো শব্দসমষ্টি ব্যবহারের মাধ্যমে অবিচারের বিরুদ্ধে কুরআনে দুই শতাধিক স্থানে তিরস্কার করা হয়েছে। মূলত ইসলামী বিশ্বাসের গুরুত্ব অনুসারে কোরআনে ন্যায়বিচারকে আল্লাহ ভীতির পরেই স্থান দেয়াহয়েছে (কোরআন-৫:৮ )। আল্লাহ ভীতিই স্বভাবত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এর কারণে মানুষ ন্যায়বিচারসহ সকল ভালো কাজে প্রবৃত্ত হয়। রাসূলুল্লাহ সা: ন্যায়বিচারের উপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। তিনি ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারাচ্ছন্নতার সাথে তুলনা করে বলেছেন, ‘অবিচার থেকে সতর্ক হও, কারণ শেষ বিচারের দিন তা গহীন অন্ধকারে নিয়ে যাবে’ ( সহীহ আল মুসলিম )। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ইবনে তাইমিয়াএতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে, ‘অবিশ্বাসী হলেও আল্লাহ ন্যায়বিচারকারী রাষ্ট্রকে রক্ষা করবেন এবং বিশ্বাসীদের দ্বারা পরিচালিত হলেও অন্যায় আচরণকারী রাষ্ট্রকে রক্ষা করবেন না এবং রাষ্ট্র অবিশ্বাস ও ন্যায়বিচার নিয়ে টিকে থাকতে পারে কিন্তু ইসলাম ও অবিচার নিয়ে টিকে থাকতে পারে না’। ইসলাম ও অবিচার পরস্পর বিরোধী এবং যে কোনো একটির দুর্বল বা নির্মূল হওয়া ছাড়া একসঙ্গে চলতে পারে না। ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়বিচারের প্রতি ইসলামের দৃঢ় অঙ্গীকারের দাবি হচ্ছে, মানবসত্তার নিকট গচ্ছিত আল্লাহর পবিত্র আমানত সকল সম্পদকে মাকাসিদ আল শরী’আহর লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহার করতে হবে।” ( ড.উমর চাপড়াঃ ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ পৃ:২০০)।

লেখক: নূরুল ইসলাম খলিফা

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...

বাণিজ্য ঘাটতির বাড়ন্ত চাপ: কাঠামোগত সংস্কারই টেকসই অর্থনীতির একমাত্র পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। মাথাপিছু আয় ...