ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬ ১১:২০ এএম , আপডেট: জুন ১৫, ২০২৬ ১১:৩৫ এএম

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান বেসরকারি খাতের। দেশের মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭৬ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। তৈরি পোশাক শিল্প, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি টেলিযোগাযোগ, ওষুধশিল্প, নির্মাণ, পরিবহন ও সেবাখাত সবখানেই বেসরকারি উদ্যোক্তা ও কর্মীদের অবদানই অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ের মাধ্যমে এই খাত দেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

দেশের মোট কর্মসংস্থানের বিশাল অংশই বেসরকারি খাত দ্বারা সৃষ্ট। লক্ষ লক্ষ বেসরকারি চাকুরিজীবী তাদের শ্রম, মেধা ও কর প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন।

কিন্তু প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করমুক্ত আয়ের সীমা ২৫০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হলেও বাস্তবে মধ্যম আয়ের বেতনভোগী কর্মচারীদের করের বোঝা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাচ্ছে। যেই বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, সেই একই বাজেটে করের বোঝা  বেড়েছে বেসরকারি চাকুরিজীবীদের। অর্থাৎ পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে একদিকে সরকারি কর্মচারীরা অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পাবেন, অন্যদিকে বেসরকারি চাকুরিজীবীরা অধিক করের বোঝা বহন করবেন।

প্রশ্ন হচ্ছে একই অর্থনীতিতে দুই ধরনের কর্মজীবী মানুষের জন্য এমন বৈপরীত্যপূর্ণ নীতি কতটা ন্যায্য?

বিনিয়োগজনিত কর-রেয়াত বিবেচনার পর একজন বেতনভোগী করদাতার করের চিত্র নিম্নরূপ:

মাসিক বেতন

(টাকা)

বার্ষিক কর (করবর্ষ-২০২৫-২৬)

(টাকা)

বার্ষিক কর

(করবর্ষ-২০২৬-২৭)       

(টাকা)

বার্ষিক কর বৃদ্ধি (টাকা)বার্ষিক কর বৃদ্ধির  শতকরা (%)

 

৭৫,০০০৫,৫০০৮,০০০২,৫০০৪৫.৪৫%
১,০০,০০০২১,৫০০৩২,৭৫০১১,২৫০৫২.৩৩%
২,০০,০০০২,১৯,৫০০২,৫৮,২৫০৩৮,৭৫০১৭.৬৫%
৩,০০,০০০৫,০৫,০০০৫,৪৫,০০০৪০,০০০৭.৯২%

এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। সর্বোচ্চ আয়ের করদাতাদের তুলনায় মধ্যম আয়ের বেতনভোগীরাই তুলনামূলকভাবে বেশি হারে কর বৃদ্ধির শিকার হচ্ছেন। মাসিক ১ লাখ টাকা আয়কারী একজন কর্মীর করের বোঝা ৫২ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

কর বৃদ্ধির এই পরিস্থিতি কেবল করমুক্ত আয়ের সীমা পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন রয়েছে।

প্রথমত, পূর্ববর্তী কর কাঠামোতে করমুক্ত আয়সীমার পরের ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ের উপর মাত্র ৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হতো। নতুন বাজেটে সেই ৫ শতাংশের স্লাব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে। ফলে করদাতারা সর্বনিম্ন করহারের সুবিধা হারিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, ১০ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ করহারের আওতাধীন আয়ের পরিসর সংকুচিত করা হয়েছে। এর ফলে করযোগ্য আয়ের একটি বড় অংশ দ্রুত উচ্চতর করহারের আওতায় চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ করদাতাদের আয়ের বড় অংশ এখন আগের তুলনায় বেশি হারে করের আওতায় পড়ছে।

তৃতীয়ত, বিনিয়োগজনিত কর-রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। জীবনবীমা, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগের মাধ্যমে যে কর-সুবিধা পাওয়া যেত, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

সব মিলিয়ে এই তিনটি পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে করদাতাদের কর দায় বেড়েছে, পাশাপাশি সঞ্চয় ও বিনিয়োগে উৎসাহও কমেছে।

বর্তমান বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এমনিতেই চাপে রয়েছে। অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ৫ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা প্রকৃত আয় বৃদ্ধির পরিবর্তে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় করের অতিরিক্ত বোঝা আরোপ করা হলে সঞ্চয় কমে যাবে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং ভোগব্যয়ও সংকুচিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও ইতিবাচক হবে না।

আমরা বিশ্বাস করি, রাজস্ব আহরণ রাষ্ট্রের জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্ত রাজস্ব নীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায্যতা, সাম্য এবং করদাতার সক্ষমতা। যারা দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের মূল শক্তি, তাদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

তাই সরকারের প্রতি বিনীত আহব্বান

১| ৫ শতাংশ কর স্ল্যাবের পুনর্বহাল করা হোক;

২| ১০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ কর স্ল্যাবের পরিসর পুনর্বিবেচনা করা হোক;

৩| বিনিয়োগজনিত কর-রেয়াতের হার পুনরায় ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হোক;

৪| মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪,৫০,০০০ করা হোক;

৫| বেসরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য বিশেষ স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন বা কর-ছাড়ের ব্যবস্থা চালু করা হোক।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় বেসরকারি খাতের অবদান অনস্বীকার্য। তাই বাজেটের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে মধ্যম আয়ের চাকুরিজীবীদের উপর আরোপিত অতিরিক্ত করের বোঝা পুনর্বিবেচনা করা সময়ের দাবি। রাজস্ব আহরণ যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি, করদাতার প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। অন্যথায় “যারা অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে, তারাই সবচেয়ে বেশি শাস্তি পাচ্ছে এমন একটি বার্তা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

লেখক: মোঃ আল-আমিন ভূঞাঁ, র্অথনীতি বিশ্লেষক

Email: alamin.hs@gmail.com

এনজে

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...

বাণিজ্য ঘাটতির বাড়ন্ত চাপ: কাঠামোগত সংস্কারই টেকসই অর্থনীতির একমাত্র পথ

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দেড় দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। মাথাপিছু আয় ...