জাহাঙ্গীর আলম আনসারী, সিনিয়র রিপোর্টার
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬ ৩:১২ পিএম , আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬ ৩:১২ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। আর নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তারেক রহমান। আর এবার দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অন্যান্যবারের তুলনায় একটু জটিল। নতুন সরকারের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম হল ব্যাপক অনিয়ম-লুটপাটের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া দেশের ব্যাংক খাত।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবচেয়ে দুর্নীতি-লুটপাট হয়েছে ব্যাংক খাত থেকে। ঋণের নামে ব্যাংক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়া হয়েছে। যার অধিকাংশই পাচার করা হয়েছে দেশের বাইরে। যার ফলে দেশের ব্যাংক খাত মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকটে ভুগছে। আর ঋণের নামে লুট করে নেওয়া টাকা ফেরত না আসায় উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। এছাড়া গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে না পারায় ইতিমধ্যে পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করে একটি ব্যাংকে পরিণত করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভেঙে পড়া দেশের ব্যাংকিং সেক্টরকে দাঁড় করানো। এ সেক্টরকে দাঁড় করাতে হলে এটাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। ব্যাংক খাতের সংস্কার কাজগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে আসা আইনি সংস্কারগুলোকে সংসদে পাস করতে হবে।

দেশের ব্যাংকিং খাত এবং নতুন সরকারের করণীয় নিয়ে কথা বললে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে আইনগুলো পাস করেছে, সেই আইনগুলো অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে এসেছে। সেই আইনগুলো সংসদে পাস করতে হবে। তারপর কিছু আইন প্রক্রিয়াধীন আছে। বিশেষ করে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ উদ্ধারের আইন।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কারের জন্য আইনের কিছু খসড়া তৈরি হয়েছে। এটা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় সেটা ফেরত পাঠিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রভাবমুক্ত রাখার জন্যই মূলত বড় ধরনের কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে গভর্নরের নিয়োগ ও অপসারণ, বোর্ডে সরকারের প্রতিনিধি তথা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়াসহ এ জাতীয় সংস্কার সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে যে, এটা নির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্তের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। যদিও এটা অক্টোবরে পাঠানো হয়েছিল।

তিনি বলেন, এখন সরকারকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ সংস্কারটা তো আইএমএফের প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। এবং আইএমএফের পরবর্তী কিস্তি ছাড় করাতে হলে এটার একটা সুরাহা করতে হবে। বিশেষ করে কাঠামোগত সংস্কার, যেগুলো কিস্তি ছাড়ের সঙ্গে যুক্ত, সেগুলো করতে হবে।

ড. জাহিদ বলেন, এখানে আমার প্রথম পয়েন্ট হচ্ছে, আইনি সংস্কার নিয়ে যে কাজগুলো হয়েছে অর্থাৎ যেগুলো অর্ডিন্যান্স হয়েছে। কিছু অর্ডিন্যান্স তো হয়েছে। যেমন পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। এটা কিন্তু অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমেই হয়েছে। তাই এই অর্ডিন্যান্সগুলো সংসদে অনুমোদন দিতে হবে।

আর মার্জার প্রক্রিয়া অনেক এগিয়ে গেছে। ওই ব্যাংকগুলো এখন আর নেই। সম্মিলিত ব্যাংক নামে নতুন একটা প্রতিষ্ঠান হয়েছে। এটা থেকে পিছু হটার কারণ তো দেখছি না। নতুন ব্যাংক কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটা নিয়ে নতুন সরকার চিন্তা করতে পারে। কিন্তু যেগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেগুলোকে আবার আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

বিশ্ব ব্যাংকের এই সাবেক অর্থনীতিবিদ বলেন, ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। এখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রভাবটা হচ্ছে সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে। আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই তো লুটপাট বেশি হয়েছে। খেলাপি ঋণের হারও সরকারি ব্যাংকগুলোতেই বেশি। আর জালিয়াতিও বেশি হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে। এছাড়া ইসলামি ব্যাংকগুলোতেও কিছু হয়েছে।

রেগুলেটর তথা বাংলাদেশ ব্যাংক যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, এজন্যই বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। এখানে ব্যাংক কোম্পানি আইনের কিছু সংশোধনী প্রস্তাব আনা হয়েছে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পরিচালক বাড়ানো এবং যোগ্য ব্যক্তিরা কীভাবে আসতে পারে, সেই সংশোধনী আনা হয়েছে। এটার বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর যেসব সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়েছে, সরকার কি সেগুলো গ্রহণ করবে, নাকি বাদ দেবে—আর বাদ দিলে এগুলোর বিকল্প সরকারের কাছে কী আছে, সেটাও জানাতে হবে।

পাচারকৃত টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়াটা অনেক দীর্ঘ। সেই আশায় বসে থাকলে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে। এখন যা আছে, সেটার ভিত্তিতে ব্যাংক খাতকে মেরামতের কাজগুলো করতে হবে। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলে আস্তে আস্তে আগের জায়গায় নিয়ে আসা যাবে। আর সব কিছুর মূলে রয়েছে সুশাসন। ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য যেসব আইনি সংস্কার করা হয়েছে এবং যেগুলো প্রক্রিয়াধীন আছে, সেগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে।

তারপর সবগুলো ব্যাংকই দুর্দশাগ্রস্ত। ব্যাংকের সংখ্যাও কমানো দরকার। কৃষি ব্যাংক একটা হলেই চলে। আর সরকারি ব্যাংকগুলোকেও একীভূত করে একটি ব্যাংক করার প্রস্তাব আছে। এখন সরকার কী করে, সেটা দেখতে হবে। সরকারকে এ নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এছাড়া নিয়োগের বিষয়েও আইনি সংস্কার দরকার। সরকারি ব্যাংকগুলোর এমডি এবং বোর্ডে যারা নিয়োগ পান, তারা যেন ভালো ও যোগ্য হন। কোনো সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে। এজন্য আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। এটা না হলে ব্যাংক খাতে সুশাসন আসবে না।

তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করা উচিত। বিএনপির আমলে তো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। আমি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিলুপ্তির পক্ষে। এটার ভূমিকা কী? রেগুলেটর হিসেবে তো বাংলাদেশ ব্যাংক আছে। এখানে আরেকজন রেগুলেটর আনার তো কোনো দরকার নেই।

খেলাপি তো খেলাপিই। ইচ্ছাকৃত আর অনিচ্ছাকৃত বলে বিভাজন করার কোনো দরকার নেই। আর এটাকে উঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও আছে। সবার ক্ষেত্রেই আইন সমানভাবে প্রয়োগ হওয়া উচিত। তা না হলে ইচ্ছাকৃতরাও অনিচ্ছাকৃতদের সুযোগ নেবে।

এসব বিষয়ে কথা বললে মানারাত ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, ব্যাংক খাত নিয়ে নতুন সরকারের প্রথম করণীয় হওয়া উচিত বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনতা দেওয়া। মানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ অর্থনীতির অন্যান্য বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টরে তাদের কোনো প্রভাব থাকা যাবে না। অন্যান্য দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।

তিনি বলেন, তারপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও পিএসসির চেয়ারম্যানের নিয়োগের মতো আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। সরকার পরিবর্তন হলেও তারা চাকরি হারাবেন না। নতুন সরকার এসে গভর্নরকে সরাতে পারবে না। যখন মেয়াদ শেষ হবে, তখন এমনিতেই তিনি চলে যাবেন।

তিনি বলেন, বর্তমান আমাদের দেশে ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি। পাঁচটা ব্যাংক মার্জ করার পরও ৫৬টি ব্যাংক আছে। আমাদের মতো দেশে এত ব্যাংকের দরকার নেই। ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে ৩০-৩৫টায় নিয়ে আসতে হবে। সরকার ব্যাংকগুলোকে মার্জ করে একটি করতে পারে এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে মার্জ করেও একটি করতে পারে। কৃষি ব্যাংক আবার রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক—এতগুলোর দরকার নেই। একটি করলেই হবে।

ড. মিজান বলেন, তারপর ব্যাংকগুলোর উপর পরিবারের নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনতে হবে। কোনো পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুইজনকে পরিচালক হিসেবে রাখতে হবে এবং তাদের মেয়াদও সর্বোচ্চ দুই টার্মের বেশি হওয়া উচিত নয়। তারা বেশি সময় থাকলে ব্যাংকগুলোকে পারিবারিক ব্যাংক বানিয়ে ফেলে।

ইসলামি ব্যাংকগুলোর কোনো অ্যাক্ট এখনো নেই। অথচ ব্যাংক খাতের ২৯ শতাংশ শেয়ার করে ইসলামি ব্যাংকগুলো। কিন্তু তাদের জন্য কোনো অ্যাক্ট নেই। এখানে দ্রুত একটি অ্যাক্ট দরকার। আমি তিন বছর নাইজেরিয়ায় একটি ইসলামি ব্যাংকে কাজ করেছি। তারা ব্যাংক শুরুর আগে অ্যাক্ট তৈরি করেছে। আর আমাদের দেশে ইসলামি ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত কোনো অ্যাক্ট নেই।

এছাড়া, ব্যাংকগুলোর মালিকানা যেন আর কখনো পলাতক দখলদার, দুর্বৃত্তদের হাতে ফিরে না আসে। যেমন এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক—এগুলোর আগের মালিকরা পলাতক। তাদের হাতে যেন এসব ব্যাংকের মালিকানা আর ফেরত না যায়। আর ইসলামী ব্যাংকের ৮২ শতাংশ শেয়ার এস আলমের হাতে। এখন যদি তিনি সামনে না এসে পেছন থেকে কাজ করেন, শেয়ারগুলো কাউকে দিয়ে দেন—এ রকম হলে ব্যাংক খাতের জন্য ভালো হবে না। তাদের মালিকানা বাজেয়াপ্ত করতে হবে। দখলকৃত মালিকদের হাতে যেন আর ফিরে না যায়। অরিজিনাল মালিকরা যেন তাদের ব্যাংকগুলো ফিরে পায়। আর ইন্ডিপেন্ডেন্ট পরিচালকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এটারও একটি আইনি কাঠামো লাগবে। এমন পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে, যাতে তারা আমানতকারীদের পক্ষে কথা বলেন।

বিএইচ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঘোষণায় সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক পাচ্ছে বাংলাদেশ

নতুন শুল্কনীতিতে বাংলাদেশের জন্য সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এ সিদ্ধান্তের ফলে ...

বাজেটের প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করছে সফল বাস্তবানের ওপর: অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, গত দেড়-দুই মাসের পরিশ্রমে প্রণীত সাম্প্রতিক বাজেটটি দেশের সর্বস্তরের ...

অনলাইনে রিটার্ন দাখিল ৪৭ লাখ

২০২৫-২০২৬ করবর্ষে রেকর্ড প্রায় ৪৭ লাখ করদাতা ই-রিটার্ন সিস্টেমের মাধ্যমে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। ...

শ্রীপুরে জলাবদ্ধতা নিরসনে নিজ অর্থায়নে স্থানীয়দের ড্রেন নির্মাণ

গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রায় দুই যুগের দুর্ভোগ জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বপ্রণোদিত হয়ে ড্রেন নির্মাণ করছে স্থানীয় বাসিন্দারা। ...