প্রকাশিত: জানুয়ারী ৩০, ২০২৩ ১২:৫৩ এএম , আপডেট: জানুয়ারী ৩০, ২০২৩ ১:০৭ এএম

দেশের বিমা খাতের প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সহযোগী কোম্পানি এনএলআই সিকিউরিটিজ লিমিটেড। কোম্পানিটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের একটি ট্রেক হোল্ডার। প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানিক ব্রোকারেজ পরিষেবা সরবরাহ করে থাকে। গ্রাহক সন্তুষ্টির মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে এই পরিষেবা প্রদান করে আসছে এনএলআই সিকিউরিটিজ লিমিটেড। গ্রাহকের কাঙিক্ষত প্রত্যাশা পূরণ, উচ্চ মানের সেবা প্রদান, বিনিয়োগকারীদের সময়মত তথ্য প্রদানসহ বিনিয়োগকারীদের সবোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যে প্রতিষ্ঠানটি তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্তমানে এনএলআই সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান। পুঁজিবাজারে চলমান পরিস্থিতি এবং পুঁজিবাজরে বিমা খাতের নানা বিষয় নিয়ে বাণিজ্য প্রতিদিনকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এনএলআই- সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সিইও এবং এমডি) মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম শাহরিয়ার রাশেদ

বাণিজ্য প্রতিদিন: পুঁজিবাজার খাত নিয়ে কত বছর ধরে কাজ করছেন?

মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান: পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ১৯৯৫ সাল থেকে কর্মরত রয়েছি। এই হিসেবে পুঁজিবাজার প্রায় তিন দশকের কাছাকাছি সময় ধরে কাজ করছি।

বাণিজ্য প্রতিদিন: পুঁজিবাজারের চলমান কান্তিকালে বিনিয়োগকারীদের করণীয় কি?

মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান: পুঁজিবাজার হচ্ছে অলস টাকার জায়গা। যারা মনে করেন পুঁজিবাজার থেকে প্রতিদিনের আয় উত্তোলন করা যায় তা মোটেও ঠিক নয়। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যারা কর্মরত তাদের জন্য পুঁজিবাজার প্রতিদিনের আয়ের কর্মস্থল। কিন্তু পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের লক্ষ্য হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি। আমাদের দেশে বিনিয়োগকারীদের যে অর্থ অলস পড়ে রয়েছে তা বিনিয়োগের জায়গা হল ব্যাংকের এফডিআই এবং সরকারি সঞ্চয়পত্র। এছাড়া যৌথ ব্যবসা অনেকেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন না, কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অর্থ নষ্ট হওয়ার প্রবণতা থেকে যায়। এক্ষেত্রে একমাত্র উপায় হচ্ছে পুঁজিবাজারে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিনিয়োগ। বাংলাদেশের বাজার খারাপ তা বলবো না। দেশের বাজারের ডিভিডেন্ট রেট অনেক ভালো। অলস টাকা যদি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয় তাহলে তা ভালো। কিন্তু পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করে পরিবারের মাসিক খরচসহ অন্যান্য চাহিদা মিটানোর ভাবনা অমূলক।

বাণিজ্য প্রতিদিন: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত গুজবের প্রভাবে বাজারে সূচকের উত্থান-পতন ঘটে থাকে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা কিভাবে সচেতন হতে পারে?

মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান: গুজব একটি ভিন্ন বিষয়; তাতে কান দেয়া উচিত না। বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা দরকার এবং তারা প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রয়োজন।
অন্য যে কোন ব্যবসা পরিচালনা করার জন্যও প্রাক্তন অভিজ্ঞতার দরকার হয়। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগও একটি ব্যবসা। এখানে বিনিয়োগকারীর কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করছেন। তাই বিনিয়োগকারী কোথায় বিনিয়োগ করছেন, কি বিনিয়োগ করছেন, কেন বিনিয়োগ করছেন এবং বিনিয়োগের রিটার্ন সম্পর্কে জানতে হবে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যেখানে বিনামূল্যে বিনিয়োগ শিক্ষা প্রদান করা হয়। এছাড়াও বাজারে বিনিয়োগ শিক্ষার উপর অসংখ্য বই-পুস্তক রয়েছে। যেগুলোর সহযোগিতা নিয়ে বিনিয়োগকারী শিক্ষা লাভ করতে পারেন। ব্যবসায় লাভ লোকসান রয়েছে। জেনেশুনে বিনিয়োগ করলে লোকসান হবে না এমনটা বলবো না, তবে বিনিয়োগকারী নিজে বুজে বিনিয়োগ করলে রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

বাণিজ্য প্রতিদিন: বিমা খাতে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের খ্যাতি রয়েছে। তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এনএলআই সিকিউরিটিজের অবস্থান কেমন?

মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান: ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স সিকিউরিটিজের অবস্থানও খুব ভালো। ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুইরেন্স চার দশক ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছে। বর্তমানে ন্যাশনাল লাইফের লাইফ ফান্ডে পর্যাপ্ত অর্থ জমা রয়েছে। গ্রাহক নিয়মিত প্রিমিয়াম দিয়ে বীমার অর্থ ফেরত পাননি এমন কোন ঘটনা ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্সে নেই এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই অর্থ প্রদান করে থাকে। এনএলআই সিকিউরিটিজ ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি সব সময় গ্রাহককে গুরুত্ব দিয়ে সততার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

বাণিজ্য প্রতিদিন: এনএলআই সিকিউরিটিজের কার্যক্রম প্রসারে আপনাদের কি পরিকল্পনা রয়েছে?

মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান: আমাদের কার্যক্রম খুব বেশি বিস্তৃত না। আমরা ধীরে ধীরে কার্যক্রম প্রসারিত করার চেষ্টা করছি। ঢাকায় কারওয়ান বাজার এবং মতিঝিলে আমাদের দুইটি অফিস রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর নিকুঞ্জে একটি বর্ধিত অফিস কয়েছে। সম্প্রতি নোয়াখালীর মাইজদীতে একটি বুথ খোলা হয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন হতে আরও চারটি বুথ খোলার অনুমতি পেয়েছি। এই বুথগুলো সোনারগাঁও, ভৈরব, ঘাটাইল এবং বরিশালে স্থাপন করা হবে। এছাড়াও সারাদেশে ছোট ছোট বুথ খোলার মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ করার ইচ্ছা রয়েছে।

বাণিজ্য প্রতিদিন: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে আপনারা কি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন?

মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান: ইতোমধ্যেই অনেক প্রতিষ্ঠান প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর নিকট পৌঁছে গিয়েছে। আমরাও একই ধারা অবলম্বন করছি। জেলা বা উপজেলা শহরে বিগত ৩০ কিংবা ৪০ বছর পূর্বের অবস্থার চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলে প্রচুর রেমিটেন্স আসে। এই রেমিটেন্সের অর্থ যদি পুঁজিবাজারে আনতে হলে তাদের নিকট পৌঁছাতে হবে। তাদের অর্থ দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারে আনতে পারলে পুঁজিবাজার অবশ্যই লাভবান হবে। কমিশন এই বিষয়টির অগ্রগতিতে চেষ্টা করছে বলে মনে করি। আমরা আশা করি অচিরেই সারাদেশে পুঁজিবাজারের প্রসার ঘটবে।

বাণিজ্য প্রতিদিন: সাধারণ মানুষ বিনিয়োগ বলতে ব্যাংকে বিনিয়োগ করা বুজে থাকে। তাদের অলস অর্থ পুঁজিবাজারে আনতে আপনার পরামর্শ কি?

মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান: পাশ্চাত্য দেশসমূহের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ পুঁজিবাজারের সাথে সম্পৃক্ত। আমাদের দেশের পুঁজিবাজারে এই ব্যপ্তি এখনো আসেনি। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সিসিবিএল চালু হলে আমরা একটি পুরো মাত্রার পুঁজিবাজার পাব বলে আশা করছি। যেখানে মানুষের ট্রেডের জন্য বিভিন্ন উপাদান থাকবে। বর্তমানে আমরা ইকুইটি মার্কেটকের যথাযথ ব্যবহার করছি না। যার ফলে বাজারে একটি নেতিবাচক প্রভাব চলে আসে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গত কয়েক বছরে নতুন নতুন প্রোডাক্ট বাজারে এনেছে। তার মধ্যে রয়েছে এসএমই, গর্ভমেন্ট বন্ড এবং অল্টারনেটিভ বন্ড । গর্ভমেন্ট বন্ড এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি, তবে গর্ভমেন্ট বন্ডের রিটার্ন খুবই ভালো। এই প্রোডাক্টগুলো প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানো গেলে মানুষ অন্যত্র বিনিয়োগ করবে না। বন্ড এবং ইকুইটি এক নয়। বর্তমানে যারা বাজারে রয়েছেন তাদের মধ্যেও এ বিষয়টি স্পষ্ট না। বন্ডে কিভাবে লভ্যাংশ আসবে এবং তার লেনদেনের সম্পর্কে মানুষদের অবিহিত করতে পারলে সরকার বন্ড বিক্রি করে প্রচুর টাকা আয় করতে পারবে এবং বিনিয়োগকারীরাও উপকৃত হবেন একই সাথে বিনিয়োগেরকারীর অর্থ নিরাপদে থাকবে। এক্ষেত্র গর্ভমেন্ট বন্ডকে সহজিকরণ করে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে।

বাণিজ্য প্রতিদিন: সরকারি চাকুরিজীবীদের প্রদেয় অর্থ পুঁজিবাজারে আনার বিষয়ে আপনার মতামত কি?

মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান: বিভিন্ন কোম্পানির বন্ড ছেড়ে এই অর্থগুলো পুঁজিবাজারে আনা যায়। তারা কিছুটা ঝুঁকি মোকাবেলা করতে না চাইলে বন্ড মার্কেটে বিনিয়োগ করতে পারেন। তা অনেকটাই নিরাপদ।

বাণিজ্য প্রতিদিন: ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্স সিকিউরিটিজ গ্রাহকের নিকট বিশ্বস্ত কেন?

মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান: আমরা একটি বড় প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান। আমাদের নিয়মিত অডিট কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। আমরা গ্রাহকের স্বার্থ সর্বপ্রথম বিবেচনা করে থাকি। আমাদের স্লোগান হচ্ছে “ক্লাইন্ডস আর কিং বা গ্রাহক হচ্ছে রাজা”। আমরা গ্রাহকদেরকে সম্মান এবং সর্বোচ্চ সুবিধা প্রদান করে থাকি।

বাণিজ্য প্রতিদিন: বহিঃবিশ্বে যুদ্ধ কিংবা বাজারে কোন পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে পুঁজিবাজারে সূচকের উঠা নামা হয়। বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমাদের করণীয় কি?

মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান: সারাবিশ্বে পুঁজিবাজার হচ্ছে সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা। বাজারে যেকোন গুজব ছড়ালেই বাজার পড়ে যায় কিংবা কোন একটি খবর প্রচার হলে বাজারে উত্থান পতন ঘটে থাকে। এটাই বাজারের নিয়ম। পুঁজিবাজার নিয়ে একটি ছবি রয়েছে যার একটি ডায়লগ এমন- “ইসখে তো রিখসে”। এখানে যেহেতু মানুষ খুব দ্রুত টাকা বৃদ্ধি করে। টাকার জন্য মানুষের একটা ভালোবাসা থাকে সুতরাং তার একটা ঝুঁকি থেকে যায়। মানুষ যে জায়গা থেকে দ্রুত রিটার্ন চায় সেখানে তার ঝুঁকির মাত্রাও সর্বোচ্চ। পুঁজিবাজার অবশ্যই একটি ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা। তবে আমাদের এখানে যথেষ্ট কাজ হচ্ছে। বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য “মার্কেট মেকার” বলে একটি বিষয় রয়েছে। মার্কেট মেকারের আইন আজ থেকে প্রায় ১০ বছর আগে পাশ হয়েছে। মার্কেট মেকার করার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ইতিমধ্যেই কয়েকটি লাইসেন্স প্রদান করেছে। মার্কেট মেকারের জন্য মূল যে বিষয়টি দরকার তা হল সিসিবিএল। সিসিবিএল চালু হলে মার্কেটের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মার্কেট মেকার থাকলে কোন শেয়ারের অকস্মাৎ উত্থান কিংবা পতন পরিলক্ষিত হবে না।

বাণিজ্য প্রতিদিন: আপনাকে ধন্যবাদ।

মুহাম্মদ শাহেদ ইমরান: আপনাকে এবং আপনার মাধ্যমে পাঠকে ধন্যবাদ।

অনুলিখন: সাইমউল্লাহ সবুজ

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বিডি ফাইন্যান্সের এমডি কায়সার হামিদ প্রবাসীদের সঞ্চয়কে নিরাপদ ও লাভজনক করতে চালু করেছি ‘বীর’ প্ল্যাটফর্ম

প্রবাসী আয়কে শুধু দেশে পাঠানো অর্থ হিসেবে নয়, বরং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের শক্তিশালী উৎসে পরিণত করতে ...

পাথরঘাটায় খালের পাড়ে জলবায়ু-সহনশীল ৭৫০০ বৃক্ষরোপণ

বরগুনার পাথরঘাটায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ...

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি: সুযোগের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, কী হতে পারে উত্তরণের পথ?

বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তি এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন দুই ...