
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬,৯৫,০০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫০৩,০০০ কোটি টাকার বিপরীতে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত আয় হয়েছে ২,৮৭,৮৬২ কোটি টাকা যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৭.২৩ শতাংশ। বাজেটের পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির অনুপাতে রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারলে সরকারকে ক্রমাগত ঋণের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ একটি আয়-ব্যয় পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এই বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা। বর্তমান সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য কর ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ বাজেট বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর ও অন্যান্য করের চাপ বাড়লে মধ্যবিত্ত, নিন্মমধ্যবিত্ত ও নিন্ম আয়ের জনগোষ্ঠী আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ত্বরান্বিত হয়েছে। এছাড়া বাজেট ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করলে ব্যাংক খাতে চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও আর্থিক অনিয়ম বর্তমানে অর্থনীতির অন্যতম বড় একটি সমস্যা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। যদি কাঠামোগত সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে বাজেটের উন্নয়নমূলক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রতা কমানোও জরুরি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা বৃদ্ধি ইতিবাচক দিক হলেও দ্রব্যমূল্যের তুলনায় তা যথেষ্ট কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং রপ্তানি খাতকে কার্যকর সহায়তা দেওয়া গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি আসন্ন বাজেটে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। যেখানে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফিতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তার খাত সম্প্রসারণ, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি ও দেশে বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো খাত উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক আর্ন্তজাতিক মান সম্পন্ন শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা উন্নয়ন, কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিঘাত মোকাবেলা, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ অন্যতম প্রাধান্য পেয়েছে। একইসাথে অতীতের ধারাবাহিকতায় ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রদান করা হচ্ছে। সেগুলো হলো- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, প্রতিরক্ষা, সড়ক পরিবহন, স্বরাষ্ট্র, কৃষি, বিদ্যুৎ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। এসকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগে মোট বাজেটের প্রায় ৩৯ শতাংশ ব্যয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
আসন্ন বাজেট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ‘‘উচ্চভিলাষী’’ এবং কাঠামোগতভাবে অনেকাংশে ‘‘গতানুগতিক’’। কেননা বাজেটের আকার, উন্নয়ন ব্যয় এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সবই বড় পরিসরে নির্ধারণ করা হয়েছে; যেটি বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ থাকলেও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে খুব তরিৎ গতিতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে যা বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনার দাবি রাখে। ফ্যামেলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মত কর্মসূচী প্রনয়নের পূর্বে খরচ-লাভ বিশ্লেষণ করলে আরো কার্যকর ভাবে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও অন্যান্য টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানের সহযোগীতা নিয়ে দেশের দরিদ্র ও নি¤œআয়ের জনগোষ্ঠীকে মাসিক আয় ও ব্যয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে ভাগ করে এই কর্মসূচির সুবিধাসমুহ প্রদান করা যেত। উদাহারণস্বরুপ- ক্যাটাগরী ১ যাদের মাসিক আয় ৫০০০টাকার নীচে, ক্যাটাগরী ২ যাদের আয় ১০০০০ টাকার নীচে এভাবে। ‘‘একজন নাগরিক, একটি কার্ড’’ এই নীতি অনুসরণ করে ক্যাটাগরী অনুযায়ী একটি ইউনিক নাম্বারের মাধ্যমে
সামাজিক নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রৃদান সম্ভব হতে পারে। নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার সহায়তা বিনামূল্যে প্রদানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। বর্তমান বাস্তবতায় প্রান্তিক কৃষকদের দূর্দশা লাঘবে কৃষক কার্ডের পরিবর্তে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার যা ক্রয় করতে খরচ হচ্ছে ১৩৫০-১৪০০ টাকা সেখানে ২০০-২৫০ টাকা সরাসরি ভর্তুকি দিতে পারে। প্রতি লিটার ডিজেল ক্রয় করতে যে অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে দাম না বাড়িয়ে তা সরকারি সহায়তা হিসেবে প্রদান করা যেতে পারে। একইসাথে বিশ্ব বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা এবং সংকট মোকাবেলায় লাভ না করে ক্রয় মূল্যে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে যেমন কৃষক ও সাধারণ জনগন সরাসরি উপকৃত হবে তেমনি মূল্যস্ফিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি আমেরিকা-ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ বা বড় ধরনের সামরিক সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ যেহেতু আমদানি-নির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি এবং রেমিট্যান্স নির্ভর বৈদেশিক মুদ্রা কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে আছে, তাই এ ধরনের সংঘাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে। এই বাস্তবতায় সরকারের খরচের ক্ষেত্রে যথাসম্ভব কৃচ্ছতাসাধন করা একান্ত জরুরি। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে, নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ডলারের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে, আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, তারল্য সংকট, ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থাহীনতা, শিল্প ও বিনিয়োগে ধীরগতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া, জালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এখন বাজেটের বড় অংশই চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ে। উচ্চ ঋণ ও সুদের হারের কারণে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধের খরচ বেড়েছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খাদ্যে ভর্তুকির চাপও রয়েছে। এর সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-কমিশন বাস্তবায়ন হলে স্থায়ী ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে সামগ্রিক বাজেটের আকার বাড়লেও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, আসন্ন বাজেটের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, কার্যকর বাস্তবায়ন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের উপর। এবার বাজেটের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগনের আস্থা ও বিশ্বাস পুন:স্থাপন করা। শুধু কথার আশ্বাসে নয় জনগণকে বাস্তবে দেখাতে হবে যে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশে ব্যবসার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ করতে পেরেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, আমানতকারীরা দেখবে আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে আর বিদেশী উন্নয়ন সহযোগীরা আশ্বস্ত হবেন যে আর্থিক খাতে সংস্কার কার্যক্রম অব্যহত রাখা হচ্ছে যাতে শৃংখলা ভেঙে না পড়ে।
লেখক: এম. হেলাল আহম্মেদ খান
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও গবেষণা ফেলো, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ।
ইমেইল: hajonyeco@gmail.com
- ১কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্সের বোর্ড সভা ২৭ জুলাই
- ২ভরিতে ১০৩৩ টাকা বাড়ল স্বর্ণের দাম
- ৩২ কোম্পানির বুধবার লেনদেন বন্ধ
- ৪রাজধানীতে ডিএমপির অভিযানে ৩৪৯ জন গ্রেফতার
- ৫লাইসেন্স বাতিলের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে স্থগিতাদেশেও পরাজয়
- ৬সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত মুজিবুরের পরিবারকে সরকারি সহায়তা
- ৭বাকৃবিতে দুগ্ধ ও গরুর মাংস উৎপাদন ব্যবস্থা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কর্মশালা শুরু
- ৮মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের দফায় দফায় হামলা
- ৯রাজধানীতে গ্যাস লিকেজ থেকে আগুনে ৩ জন দগ্ধ
- ১০চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ৩ জনের প্রাণহানি
- ১রণক্ষেত্র দিল্লি: ভারতের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় আন্দোলনের’ ডাক সিজেপির
- ২গ্রাহকদের জন্য নিজস্ব ওএমএস চালু করছে মর্ডান সিকিউরিটিজ
- ৩মতিগঞ্জে টর্নেডোয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে আর্থিক অনুদান প্রদান
- ৪সাতক্ষীরায় বিলে মৎস্য ঘের থেকে গাড়িচালকের মরদেহ উদ্ধার
- ৫চাঁদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ছাড়া খাবার তৈরি করায় জরিমানা
- ৬জোট শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী
- ৭যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে তারেক রহমানের অভিনন্দন
- ৮সারাদেশে ফ্যামিলি কার্ড সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
- ৯৯৯৯-এ ফোনে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ১০ শিক্ষার্থী উদ্ধার
- ১০ঝুঁকিতে চাঁদপুর মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প





পাঠকের মতামত