ইউনুস সুজন
প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬ ২:৩৪ পিএম , আপডেট: এপ্রিল ৪, ২০২৬ ২:৩৬ পিএম

একটি সমাজের মেরুদণ্ড হলো তার বুদ্ধিজীবী সমাজ। ঐতিহাসিকভাবেই তারা সমাজের ‘বিবেক’ হিসেবে স্বীকৃত যাদের প্রধান কাজ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। কিন্তু সমকালীন রাজনীতির পঙ্কিলতায় আমরা এক অদ্ভুত ও নেতিবাচক বিবর্তন লক্ষ্য করছি। বুদ্ধিজীবীরা আজ আর সমাজের অতন্দ্র প্রহরী নন; বরং অনেকেই পরিণত হয়েছেন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ‘তাত্ত্বিক লাঠিয়াল’-এ। এই “দলীয় বুদ্ধিজীবী” গোষ্ঠী মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক সততাকে বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার অপকর্মকে বৈধতা দেওয়ার কারখানায় পরিণত হয়েছে।

গণতান্ত্রিক সমাজে যে কেউ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী হতে পারেন, এটি দোষের কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখন, যখন সেই ‘আদর্শ’ রূপ নেয় অন্ধ ‘আনুগত্যে’। দলীয় বুদ্ধিজীবীরা যখন দেখেন তাদের দল কোনো অগণতান্ত্রিক বা অনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তখন তারা নৈতিক কারণে চুপ থাকেন না; বরং সেই অন্যায়ের সপক্ষে যুক্তি তৈরি করেন। তারা অপশাসনকে ‘উন্নয়ন’ হিসেবে এবং দমন-পীড়নকে ‘শৃঙ্খলার’ তকমা দিয়ে সাধারণ মানুষের সামনে পরিবেশন করেন। এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা পরাজিত হয় দলীয় প্রসাদ লাভের আকাঙ্ক্ষার কাছে।

ফরাসি চিন্তাবিদ জুলিয়েন বেন্দা (Julien Benda) ১৯২৭ সালে তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘The Treason of the Intellectuals’-এ এই প্রবণতাকেই ‘বুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, যখন একজন চিন্তাশীল মানুষ সত্যের চেয়ে রাজনীতি বা গোষ্ঠীস্বার্থকে বড় করে দেখেন, তখন তিনি নিজের অস্তিত্বের সাথেই বেইমানি করেন।

ইতালীয় মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি (Antonio Gramsci) তাঁর ‘কালচারাল হেজিমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য তত্ত্বে দেখিয়েছেন, শাসকগোষ্ঠী কেবল পুলিশ বা সেনাবাহিনী দিয়ে শাসন করে না। তারা সমাজকে মানসিকভাবেও শাসন করতে চায়। আর এই কাজে তাদের প্রধান অস্ত্র হলো বুদ্ধিজীবীরা। দলীয় বুদ্ধিজীবীরা সুকৌশলে জনগণের মগজ ধোলাই করেন যাতে তারা শোষকের অন্যায়কেও স্বাভাবিক বা ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে মেনে নেয়।

আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ও চিন্তক নোয়াম চমস্কি (Noam Chomsky) বিষয়টিকে আরও ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কন্সেন্ট’ তত্ত্বে। তাঁর মতে, বুদ্ধিজীবীরা যখন ক্ষমতার সেবকে পরিণত হন, তখন তারা সত্যকে আড়াল করে মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে জনগণের ‘সম্মতি’ আদায় করেন। তারা এমন এক বয়ান তৈরি করেন যেখানে অপরাধীকে দেশপ্রেমিক আর প্রতিবাদীকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়।

জ্ঞান ও ক্ষমতার রসায়ন: মিশেল ফুকো ও ডিসকোর্স

দলীয় বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে সাধারণ মানুষের চিন্তার জগত নিয়ন্ত্রণ করেন, তার আরও গভীর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault)-র তত্ত্বে। ফুকো দেখিয়েছেন, জ্ঞান ও ক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক। ক্ষমতা শুধু দমন করে না, ক্ষমতা ‘সত্য’ উৎপাদন করে। দলীয় বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতার ছত্রছায়ায় এমন এক ‘রেজিম অফ ট্রুথ’ (রেজিম অফ ট্রুথ) বা সত্যের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে শাসকের প্রতিটি অন্যায়কে বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক বলে মনে হয়। তারা ভাষার এমন এক জাল (ডিসকোর্জ) তৈরি করেন যেখানে সাধারণ মানুষ নিজের অজান্তেই শোষকের ভাষাতেই কথা বলতে শুরু করে।

হানা আরেন্ট ও মন্দের সাধারণীকরণ

জার্মান-মার্কিন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হানা আরেন্ট (Hannah Arendt) তাঁর বিখ্যাত ‘Banality of Evil’ ধারণায় দেখিয়েছেন যে, সমাজে চরম অন্যায় বা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার জন্য খুব বড় কোনো শয়তানের প্রয়োজন হয় না; বরং একদল ‘চিন্তাহীন’ মানুষের অনুগত থাকাই যথেষ্ট। যখন বুদ্ধিজীবীরা তাদের বিচারবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে কেবল আদেশ পালনকারী বা ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠেন, তখন তারা সমাজকে এক ভয়ানক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেন। তাদের এই নির্লিপ্ততা বা চাটুকারিতা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকে ‘স্বাভাবিক’ (নরমালাইজ) করে তোলে।

সুবিধাভোগী শ্রেণির মধুচক্র

কেন একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি নিজের কলম বা কণ্ঠকে দলের কাছে বন্ধক রাখেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে জাগতিক প্রাপ্তি ও ক্ষমতার মধুচক্রের প্রলোভনে। উপাচার্য পদ, রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, উচ্চপদস্থ পদায়ন কিংবা টকশোতে নিয়মিত আমন্ত্রণ পাওয়ার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলে। এই ‘সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী’ শ্রেণীটি জানে, সত্য বললে গদি হারাবে, আর মিথ্যাকে চটকদার তাত্ত্বিক মলাটে সাজালে পদোন্নতি মিলবে। ফলে তারা থিওডোর অ্যাডর্নো বর্ণিত সেই ‘সাংস্কৃতিক শিল্প’-এর কারিগর হয়ে ওঠেন, যারা সত্যকে জটিল তাত্ত্বিক মারপ্যাঁচে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে প্রতিবাদী হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

ফিলিস্তিনি-মার্কিন তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাঈদের আহ্বান

ফিলিস্তিনি-মার্কিন তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাঈদ (Edward Said) তাঁর ‘Representations of the Intellectual’ গ্রন্থে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো ‘স্পিকিং ট্রুথ টু পাওয়ার ‘ বা ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সত্য বলা। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় অনেক বুদ্ধিজীবী আজ ক্ষমতার কানে ‘মিষ্টি কথা’ বলা বা ক্ষমতার অপকর্মের আইনি ও নৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোকেই তাদের প্রধান সাফল্য মনে করেন। তারা ভুলেই গেছেন যে, একজন বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হওয়া, শাসকের গীত গাওয়া নয়।

একটি পঙ্গু সমাজের পদধ্বনি

যখন বুদ্ধিজীবীরা দলের মুখপাত্র হয়ে ওঠেন, তখন সমাজে সমালোচনামূলক চিন্তার (ক্রিটিকাল থিংকিং) জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। রাজনীতিতে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি ধ্বংস হয় এবং অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রথা তৈরি হয়। এটি কেবল রাজনীতির ক্ষতি নয়, বরং পুরো জাতির মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ঘটায়। যে সমাজে বুদ্ধিজীবীরা বিক্রি হয়ে যান, সেই সমাজ দিশাহীন নৌকার মতো অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েল ঠিকই বলেছিলেন, “রাজনৈতিক ভাষা এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে মিথ্যাকে সত্য মনে হয় এবং খুনের মতো কাজকেও সম্মানজনক মনে হয়।” দলীয় বুদ্ধিজীবীরা ঠিক এই ভাষাগত কারচুপিতেই পারদর্শী। চেক দার্শনিক ভাকলাভ হাভেল (Václav Havel) একেই বলেছেন ‘মিথ্যার মধ্যে বাস করা’। তাঁর মতে, বুদ্ধিজীবীর আসল মুক্তি হলো ‘লিভিং ইন ট্রুথ’ বা সত্যের মধ্যে বসবাস করা।

পরিশেষে, বুদ্ধিজীবীদের মেরুদণ্ডহীনতা কোনো ব্যক্তিগত বিচ্যুতি নয়, বরং এটি একটি জাতীয় বিপর্যয়ের সংকেত। বুদ্ধিবৃত্তিক সততা হারিয়ে গেলে শুধু রাজনীতি নয়, পুরো সমাজই তার চড়া মূল্য দিতে বাধ্য হয়। প্রকৃত বুদ্ধিজীবী তিনিই, যিনি দলের ভুলের সময় আয়না হয়ে সামনে দাঁড়াতে পারেন। ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলাই হলো আসল বুদ্ধিবৃত্তিক সাহসিকতা। কারণ ইতিহাস সাক্ষী ক্ষমতার চাটুকারেরা সাময়িক সুবিধা পেলেও, মহাকালের পাতায় কেবল তারাই টিকে থাকেন যারা আপসহীনভাবে সত্যের মশাল বয়ে নিয়ে চলেন।

লেখক: ইউনুস সুজন
শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার

পাঠকের মতামত

বাকৃবিতে ডাইরেক্ট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের যাত্রা শুরু, নেতৃত্বে লিপি-মনির

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) কর্মকর্তাদের নতুন সংগঠন বিএইউ ডাইরেক্ট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রথম আহ্বায়ক কমিটি গঠন ...

বাকৃবির অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন ব্যবস্থায় আসছে অটোমেশন

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পেনশন ও বিভিন্ন ভাতা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া ...

ঢাকা কলেজস্থ সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রকল্যাণের ফল উৎসব ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

ঢাকা কলেজস্থ সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদ ‘যমুনা’র উদ্যোগে জার্সি উন্মোচন, ফল উৎসব ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ...

একাডেমিক মাইগ্রেশন ইস্যু ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে ২৯ ঘণ্টায় ভোট পড়েছে ২৬ শতাংশ

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে একাডেমিক মাইগ্রেশন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত গ্রহণের ভোটে ২৯ ঘণ্টায় ১৪ হাজার ৩০০ ...

নীতিমালা উপেক্ষা করে ইবিতে সভাপতি নিয়োগ, তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) মার্কেটিং বিভাগে নতুন সভাপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা উপেক্ষা করে ...

খুলনা জেলা ছাত্র কল্যাণ সমিতি’র উদ্যোগে ইবিতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

সবুজ ও নির্মল ক্যাম্পাস গড়ে তোলার প্রত্যয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ  কর্মসূচি করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় খুলনা ...

বেরোবিতে শিক্ষার্থীদের থেকে প্রায় সাত লাখ টাকা অতিরিক্ত ফি আদায়

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ‘সেন্টার ফর ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন ...