
‘শিল্পায়নের নোনা জমি, শিল্পনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লব’ শীর্ষক নিবন্ধে আমরা দেখেছি যে বাংলাদেশের শিল্পের ‘লোনা জমি’ বা নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে উৎপাদনশীলতাকে পদ্ধতিগতভাবে বাধাগ্রস্ত করছে (জাতীয় অর্থনীতি, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। নিবন্ধটি নর্থ, এসেমগলু-রবিনসন ও ইভান্সের তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে যে বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো—যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর কাছে বন্দি, ঋণপ্রবাহ ও শুল্কনীতি অলিগার্কদের পক্ষে বাঁকানো, এবং লজিস্টিক ব্যয় বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ—তা উদ্ভাবনী উদ্যোক্তাদের জন্য এক শাস্তিমূলক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এই ‘লোনা জমি’র ফলে শিল্পনীতির উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এক গভীর বিচ্ছিন্নতা বিরাজ করছে; পণ্য জটিলতা ও বৈচিত্র্যে স্থবিরতা থেকে উত্তরণ ঘটছে না, বরং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেন্ট সিকিং বা কমিশনভিত্তিক অর্থনীতিরই অংশ হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় কাগুজে শিল্পনীতি বা বিচ্ছিন্ন সংস্কার যথেষ্ট নয়, বরং আবশ্যক একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লব’—যেখানে রাষ্ট্র অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃত উৎপাদনশীল উদ্যোক্তার সঙ্গে পারফরম্যান্স-ভিত্তিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলবে। এই প্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লবের মাধ্যমেই কেবল লুণ্ঠনতন্ত্রের স্থলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবনী অর্থনীতির উর্বর জমি তৈরি করা সম্ভব, যার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও সম্ভাব্য কৌশল নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা থাকবে এই নিবন্ধে।
ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন থিওরি
শিল্পায়নের লোনা মাটি বদলানোর পর পরবর্তী প্রশ্নটিই হলো, সেই জমিতে নতুন শিল্পায়নের চারাটি আমরা ঠিক কোন পদ্ধতিতে রোপণ করব? অনেকে মনে করেন যে সরকার যদি আরএফএল বা ওয়ালটনের মতো নির্দিষ্ট কোনো বড় কোম্পানিকে চীনের বিওয়াইডির মতো ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ঘোষণা করে বিশেষ সমর্থন দেয় তবে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব। তবে বর্তমান অলিগার্কিক কাঠামোতে এই ধারণাটি কেন সফল হবে না তার গভীরতর তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।
পিটার ইভান্সের (১৯৯৫) রাষ্ট্রীয় টাইপোলজি অনুযায়ী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে একটি রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ভর করে তার আমলাতন্ত্র এবং ব্যবসায়ী শ্রেণির সম্পর্কের প্রকৃতির ওপর। ইভান্স রাষ্ট্রকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন: প্রিডেটরি বা লুণ্ঠনকারী রাষ্ট্র (যারা কেবল সাধারণ মানুষের সম্পদ নিজেদের পকেটে ভরে), ডেভেলপমেন্টাল বা উন্নয়নকামী রাষ্ট্র (যারা পরিকল্পিতভাবে শিল্পায়নে নেতৃত্ব দেয়) এবং ইন্টারমিডিয়েট বা মধ্যবর্তী রাষ্ট্র (যাদের অবস্থান এই দুইয়ের মাঝামাঝি)। দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ানের মতো উন্নয়নকামী রাষ্ট্রগুলো তাদের শিল্পোন্নয়নের সময় এম্বেডেড অটোনমি বা প্রোথিত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছিল। এর অর্থ হলো রাষ্ট্র উদ্যোক্তাদের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকলেও তাদের দ্বারা প্রভাবিত বা বন্দি ছিল না। রাষ্ট্র সেখানে উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য (যেমন রপ্তানি বাড়ানো বা নতুন প্রযুক্তি তৈরি) নির্ধারণ করে দিত এবং পারফরম্যান্স দেখাতে ব্যর্থ হলে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিত। বিপরীতে বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামো একটি প্রিডেটরি বা ক্লায়েন্টেলিস্ট হাইব্রিড চরিত্রে রূপ নিয়েছে যেখানে রাষ্ট্র নিজেই অলিগার্কিক স্বার্থের কাছে জিম্মি। এই কাঠামোতে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন নীতি গ্রহণ করলে তা অনিবার্যভাবে ক্রনি ক্যাপিটালিজম বা রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট একচেটিয়া ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এখানে অ্যালিস আমসডেনের (১৯৮৯) পারফরম্যান্স ভিত্তিক প্রণোদনা তত্ত্বটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমসডেন দেখিয়েছেন যে দক্ষিণ কোরিয়া নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সমর্থন দিলেও তার বিনিময়ে কঠোর শর্ত বা ‘কুইড প্রো কু’ আরোপ করেছিল। রাষ্ট্র সেখানে কোম্পানিগুলোকে বলেছিল যে রপ্তানি বাজারে সাফল্য দেখালে তবেই তারা সস্তা ঋণ, কর-ছাড় বা সুরক্ষা পাবে। আমাদের বর্তমান অলিগার্কিক কাঠামোতে এই শর্তারোপ সম্ভব নয় কারণ যারা নীতি নির্ধারণ করছেন তারাই অনেক ক্ষেত্রে এই বড় কোম্পানিগুলোর মালিক বা অংশীদার। ফলে রাষ্ট্র ও ব্যবসার মাঝে যে দূরত্ব বা অটোনমি থাকা প্রয়োজন তা এখানে অনুপস্থিত। এর পরিবর্তে এখানে গড়ে উঠেছে ক্যাপটিভ ডিপেন্ডেন্স বা বন্দি নির্ভরশীলতা যেখানে রাষ্ট্র কেবল অলিগার্কদের সুবিধা নিশ্চিত করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
ইয়ানোস কর্নাইয়ের (১৯৮৬) ‘সফট বাজেট কনস্ট্রেইন্ট’ তত্ত্বটি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যখন কোনো কোম্পানি জানে যে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে রাষ্ট্র তাকে যেকোনো মূল্যে বাঁচিয়ে রাখবে বা বেইল আউট দেবে তখন তার মধ্যে উদ্ভাবনের ক্ষুধা মরে যায়। বিওয়াইডি কেবল সরকারি ভর্তুকিতে বড় হয়নি বরং চীন সরকার শত শত বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিকে সুযোগ দিয়ে তাদের মধ্যে একটি চরম অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করেছিল। বিওয়াইডি সেই ‘সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’ যুদ্ধে জিতে আজ বিশ্বসেরা হয়েছে। প্রতিযোগিতা ছাড়া কাউকে কৃত্রিমভাবে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করলে তা কেবল একটি সুরক্ষিত অলস দানব তৈরি করবে যা বিদেশের বাজারে লড়াই করার বদলে দেশের সম্পদ পাচারেই বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে।
পরিশেষে ইকোসিস্টেমের সামগ্রিক ব্যর্থতা একটি বড় কারণ। শিল্প কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। একটি কোম্পানি তখনই বৈশ্বিক হয়ে ওঠে যখন তার চারপাশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অবকাঠামোতে ন্যূনতম স্বচ্ছতা থাকে। পুরো সিস্টেম যদি লুণ্ঠনকারী থাকে তবে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিও শেষ পর্যন্ত সেই সপ্তভুজ লৌহ কাঠামোর অংশ হয়ে পড়বে। ফলে শিল্প সম্ভাবনাগুলো বিওয়াইডি হওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক রেন্ট সিকিং বা লবিংয়ের চোরাবালিতে হারিয়ে যায়। যতক্ষণ না আমরা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অলিগার্কিক প্রভাবমুক্ত করে এম্বেডেড অটোনমি প্রতিষ্ঠা করতে পারছি ততক্ষণ ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন তৈরির যেকোনো চেষ্টা কেবল লুণ্ঠনের নতুন পথ উন্মোচন করবে। মূলত কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কেবল একটি শিল্পগ্রুপকে বেছে নিয়ে বড় কোনো শিল্প বিপ্লব সম্ভব নয়। কারণ, বাংলাদেশের জন্য এখন ‘শিল্প বিপ্লব’-এর আগে একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লব’ বেশি জরুরি।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা বনাম দক্ষ জনবল
শিল্প বিপ্লবের পথে একটি মৌলিক প্রশ্ন সব সময় সামনে আসে যা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা বড় বাধা নাকি দক্ষ জনবলের অভাব। আমার বিশ্লেষণে এই দুটি সমস্যা আসলে একটি কাঠামোগত দুষ্টচক্রের মতো কাজ করে যেখানে একটির ব্যর্থতা অন্যটিকে আরও ঘনীভূত করে। ম্যানকার ওলসনের (১৯৮২) ‘কালেক্টিভ অ্যাকশন’ তত্ত্ব অনুযায়ী কোনো দেশের অর্থনৈতিক নীতি কেন জনস্বার্থের বদলে গোষ্ঠীস্বার্থকে গুরুত্ব দেয় তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ওলসন দেখিয়েছেন যে একটি সমাজে ছোট কিন্তু সুসংগঠিত গোষ্ঠী বা অলিগার্করা তাদের স্বার্থ রক্ষায় যতটা সক্রিয় হতে পারে বিশাল অসংগঠিত জনসমষ্টি ততটা পারে না। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ যখন নিজেরাই আমদানিনির্ভর ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের অংশ তখন তারা দেশীয় উৎপাদনমুখী শিল্পকে শক্তিশালী করার ঝুঁকি নিতে চান না। কারণ উৎপাদনশীল শিল্পায়ন এমন এক মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার জন্ম দেয় যা অলিগার্কদের রেন্ট সিকিং ক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
এখানে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই নয় বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও দক্ষতার এক গভীর সংকট বিদ্যমান। পিটার ইভান্স বর্ণিত আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির আলোকে দেখলে বোঝা যায় যে যারা রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করছেন তাদের চিন্তা জগত দীর্ঘ সময় ধরে লুণ্ঠনমূলক চর্চায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের ক্যারিয়ার ইনসেনটিভ বা পদোন্নতির মাপকাঠি অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এর ফলে রাষ্ট্রে এমন এক শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে যারা চাইলেও কোনো উন্নয়নমূলক বাঁক নিতে পারে না কারণ তারা নিজেরাই এই নিষ্কাশনমূলক কাঠামোর মধ্যে সামাজিকীকৃত। এটি কেবল সদিচ্ছার অভাব নয় বরং পদ্ধতিগত দক্ষতার এক বিশাল ঘাটতি।
অন্যদিকে দক্ষ জনবল হলো শিল্পায়নের প্রকৃত জ্বালানি। পল রোমারের (১৯৯৪) ‘এন্ডোজেনাস গ্রোথ থিওরি’ অনুযায়ী প্রজ্ঞাই হলো দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। জনবল যদি উচ্চ প্রযুক্তিতে দক্ষ না হয় তবে রাষ্ট্র বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলেও তা শেষ পর্যন্ত অপচয়ে পর্যবসিত হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আজও কেবল সাধারণ দাপ্তরিক কর্মী তৈরির কারখানায় পরিণত হয়ে আছে। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ন্যানো-প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন কিংবা লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি তৈরির মতো আধুনিক শিল্পের চাহিদার সাথে সম্পূর্ণ সংগতিহীন। ফলে উচ্চশিক্ষিত প্রকৃত মেধাবীদের অধিকাংশই মেধা পাচারের শিকার হয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। আমার প্রস্তাবিত ‘সময়-জ্ঞান-তথ্যগত’ অলিগার্কিক পক্ষাঘাত প্যারাডাইম অনুযায়ী, এটি রাষ্ট্রের জন্য এক অপূরণীয় ‘সময়গত লুণ্ঠন’। রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে যে মেধাবীদের গড়ে তুলছে, তাদের উদ্ভাবনী মেধা ও মূল্যবান সময় যখন অন্য দেশ নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে, তখন তা জাতীয় সক্ষমতায় এক বিশাল ও স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।
সেন্ডহিল মুলাইনাথান ও এলডার শাফিরের (২০১৩) স্কারসিটি বা অভাবের মনস্তত্ত্ব তত্ত্বটি এই সংকটকে আরও পরিষ্কার করে। মুলাইনাথান দেখিয়েছেন যে মানুষ যখন অভাবের মধ্যে থাকে তখন তার মধ্যে এক ধরণের কগনিটিভ ট্যাক্স বা চিন্তা করার ক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়। বাংলাদেশের জাতীয় নীতি পরিকল্পনাগুলোও এই স্কারসিটি ট্র্যাপ বা অভাবের ফাঁদে আটকা পড়ে আছে। রাজস্ব সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে সরকার সব সময় আগামী ছয় মাস বা এক বছরের টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে। এই স্বল্পমেয়াদী চিন্তার কারণে ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভিশন নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। যখন রাষ্ট্র নিজেই টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত থাকে তখন তার পক্ষে উদ্ভাবনী অর্থনীতির দিকে নজর দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এই দুষ্টচক্রটি এভাবেই পূর্ণতা পায় যে রাজনৈতিক অলিগার্করা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চায় যাতে মেধাবীদের কদর না বাড়ে। আবার মেধাবীরা যখন দেশে উপযুক্ত পরিবেশ পায় না তখন তারা দেশত্যাগ করে। এই শূন্যতা পূরণের জন্য রাষ্ট্র আমলাতন্ত্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যাদের নিজেদেরই আধুনিক শিল্পায়নের কারিগরি দক্ষতা নেই। ফলাফলস্বরূপ শিল্প বিপ্লব কেবল সেমিনার বা পলিসি পেপারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। যতক্ষণ না আমরা এই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কারিগরি দক্ষতার দ্বৈত সংকট কাটিয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত লৌহ কাঠামোর এই অলিগার্কিক পক্ষাঘাত কাটানো সম্ভব হবে না।
উদ্ভাবনী অর্থনীতির রোডম্যাপ
বাংলাদেশের শিল্প খাতকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে হলে কেবল এলোমেলো সংস্কার যথেষ্ট নয় বরং রড্রিক, হাউসমান এবং ভেলাস্কোর (২০০৫) বর্ণিত ‘বাউন্ডিং কনস্ট্রেইন্ট’ বা প্রধান বাধাগুলো সরানোর জন্য একটি সুশৃঙ্খল ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন করতে হবে যা প্রাতিষ্ঠানিক লৌহ কাঠামো ভেঙে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম তৈরি করবে।
প্রথমত, যেকোনো টেকসই শিল্পায়নের পূর্বশর্ত হলো নর্থ, ওয়ালিস ও ওয়াইনগাস্ট (২০০৯) বর্ণিত একটি স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই ধাপে তিনটি প্রধান বিন্দুতে আঘাত করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে আমূল সংস্কার এনে রাজনৈতিক সংযোগের বদলে ক্রেডিট স্কোর ও বিজনেস মডেলের ভিত্তিতে ঋণ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে যাতে অলিগার্কদের পরিবর্তে প্রকৃত উদ্ভাবকরা মূলধন পায়। শুল্ক ও বন্দর ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও কাগজহীন করার মাধ্যমে ট্রানজ্যাকশন কস্ট বা লেনদেন ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। চুক্তি প্রয়োগ বা এনফোর্সমেন্ট অফ কন্ট্রাক্টস নিশ্চিত করতে হবে যাতে একজন বিদেশি বা দেশি বিনিয়োগকারী আইনি মারপ্যাঁচে তার মূল্যবান সময় বিসর্জন না দেয়। এটি হবে লৌহ কাঠামোর জং ধরা শৃঙ্খল ভাঙার প্রাথমিক পদক্ষেপ।
দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি কিছুটা মজবুত হওয়ার পর রাষ্ট্রকে অ্যালিস আমসডেনের পারফরম্যান্স ভিত্তিক প্রণোদনা তত্ত্ব প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট কিছু সম্ভাবনাময় খাতে বাজি ধরতে হবে। বাংলাদেশের জন্য ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি হতে পারে সেই বিশেষ খাত। তবে এই সুরক্ষা কেবল অন্ধ ভর্তুকি হবে না বরং এটি হবে কন্ডিশনাল প্রটেকশনিজম বা শর্তসাপেক্ষ সুরক্ষা। রাষ্ট্র সেখানে উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা দেবে এই শর্তে যে তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রপ্তানি সক্ষমতা অর্জন করবে এবং পণ্য বৈচিত্র্য আনবে। দক্ষিণ কোরিয়া এই মডেলে সফল হয়েছিল কারণ তারা অযোগ্য কোম্পানিদের সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেরাদের বের করে এনেছিল। এটি আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প নির্ভরতা কাটিয়ে একটি মাল্টিসেক্টরাল ও উচ্চ প্রযুক্তির অর্থনীতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
তৃতীয়ত, রূপান্তরের চূড়ান্ত ধাপে আমাদের নজর দিতে হবে মেধা ও জ্ঞানের প্রকৃত বিকাশে যা পল রোমারের এন্ডোজেনাস গ্রোথ থিওরির মূল কথা। আগামী ১০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদী রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে যেখানে গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় বর্তমানের ০.৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ২ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এই ধাপে আমাদের লক্ষ্য হবে গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সের মানবসম্পদ ও গবেষণা সাব ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নেওয়া। এর জন্য একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির মাঝে একটি শক্তিশালী সেতু তৈরি করতে হবে যাতে প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সরাসরি কারখানার পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
এই তিন ধাপের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করলে আমার প্রস্তাবিত সময়-জ্ঞান-তথ্য প্যারাডাইমটি একটি ইতিবাচক বৃত্তে প্রবেশ করবে। প্রথম ধাপ মানুষের সময় বাঁচাবে, দ্বিতীয় ধাপ নতুন প্রযুক্তিগত জ্ঞানের দ্বার উন্মোচন করবে এবং তৃতীয় ধাপ তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও গবেষণার মাধ্যমে একটি উদ্ভাবনী সমাজ গড়ে তুলবে। এটি কেবল শিল্পায়ন নয় বরং এটি হবে একটি জাতির কগনিটিভ রিভল্যুশন বা চিন্তা জগতের বিপ্লব যা লোনা জমির নিষ্কাশনমূলক অর্থনীতিকে একটি সবুজ ও সৃষ্টিশীল অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাবে। সমৃদ্ধি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিকোয়েন্সিংয়ের ফল। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।
মতামত লেখকের নিজস্ব
লেখক: ড. মো. আবু হাসান,সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
Email: hhafij@yahoo.com
- ১বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের বোর্ড সভা ২৯ জুলাই
- ২শহীদ জিয়ার হত্যা মামলার আসামি মোজাফফরকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ
- ৩কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্সের বোর্ড সভা ২৮ জুলাই
- ৪ব্লক মার্কেটে লেনদেন ৪০ কোটি টাকার
- ৫দর পতনের শীর্ষে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ
- ৬ষড়যন্ত্রে হতাশ না হয়ে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান রিজভীর
- ৭দর বৃদ্ধির শীর্ষে ন্যাশনাল পলিমার
- ৮নবীনগরে সরকারি পুকুরপাড়ের লিজ নিয়ে বিতর্ক
- ৯কয়রায় চরম ঝুঁকি নিয়ে চলছে ৪ হাজার মানুষের চলাচল
- ১০পাঁচ মাসে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠন
- ১রণক্ষেত্র দিল্লি: ভারতের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় আন্দোলনের’ ডাক সিজেপির
- ২গ্রাহকদের জন্য নিজস্ব ওএমএস চালু করছে মর্ডান সিকিউরিটিজ
- ৩মতিগঞ্জে টর্নেডোয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে আর্থিক অনুদান প্রদান
- ৪চাঁদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ছাড়া খাবার তৈরি করায় জরিমানা
- ৫যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে তারেক রহমানের অভিনন্দন
- ৬জোট শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী
- ৭৯৯৯-এ ফোনে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ১০ শিক্ষার্থী উদ্ধার
- ৮জিয়াউল আহসানের বাড়িতে দুদকের অভিযান শেষ, মালামাল জব্দ
- ৯জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ২.২ শতাংশ, বড় পতন শিল্প ও সেবাখাতে
- ১০হজে বাংলাদেশের জন্য ব্যাকআপ আবাসন ১ শতাংশ বহালের অনুরোধ ধর্মমন্ত্রীর





পাঠকের মতামত