হাফিজুর রহমান
প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬ ৩:০২ পিএম

ক্লান্ত হাতে দড়ি টেনে প্লাস্টিকের ড্রামের ভেলাটি যখন খালের মাঝখানে পৌঁছাল, তখন জোয়ারের তীব্র টানে সেটি ওলটপালট হওয়ার উপক্রম। ভেলায় থাকা কয়েকজন স্কুলছাত্রী তখন ভয়ে চিৎকার করে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছে। এটি খুলনার কয়রা উপজেলার ৪ নম্বর মহারাজপুর ইউনিয়নের সুন্দরবন সংলগ্ন মঠবাড়ি পবনা এলাকার প্রতিদিনের বাস্তব চিত্র।

​২০০৯ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে গিয়েছিল এই অঞ্চলের যোগাযোগের প্রধান লাইফলাইন—একটি ডাবল ইটের সলিং রাস্তা। প্রকৃতির সেই তাণ্ডবের পর ১৭ বছর কেটে গেলেও আজ পর্যন্ত পুনর্নির্মাণ করা হয়নি সড়কটি। ফলে এক সময়ের সচল ডাবল ইটের রাস্তাটি এখন রূপ নিয়েছে ৫২৪ ফুটের এক বিশাল স্থায়ী খালে। আর এই খালের মুখে বন্দি হয়ে পড়েছে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ বিশাল এক জনপদ। নেই কোনো মাঝি, দুই পাড়ে বেঁধে রাখা দড়ি টেনে টেনে চরম ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন পার হচ্ছে কোমলমতি শিশু ও সাধারণ মানুষ।

বিচ্ছিন্ন ৪ হাজার মানুষ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার আলো দড়ির টানে বন্দি

সরজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই ৫২৪ ফুটের খালের দুই পাশেই রয়েছে ৩৫ নম্বর দক্ষিণ মঠবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই এলাকায় বিকল্প কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ‘দড়ি টানা’ ভেলায় পার হতে হয়। অনেক সময় হুড়োহুড়ি করে উঠতে গিয়ে ভেলা উল্টে বই-খাতা ভিজে যাওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।

​রাস্তাটি না থাকায় ওই ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাউলিয়া ঘাটা, সুতিরকোনা ও পবনা এলাকার প্রায় ৪ হাজার মানুষ ইউনিয়ন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। শিক্ষার পাশাপাশি এই অঞ্চলের একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’টি খালের ওপারে থাকায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রায় বন্ধের উপক্রম। বিশেষ করে প্রসূতি মা ও জরুরি রোগীদের এই নড়বড়ে ভেলায় পার করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩ নম্বর ওয়ার্ডের এই বিদ্যালয় দুটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোট কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও ভোটের সময় ছাড়া কেউ এই জনপদের খোঁজ রাখে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

​এলাকার এই চরম দুর্ভোগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম (৪০) বলেন, রাইতের বেলা কেউ অসুস্থ হলি এই দড়ি টানা ভেলা পার হওয়া যে কী কষ্ট, তা শুধু আমরাই জানি। কতবার যে স্কুলগামী ছাওয়াল-মেয়েরা বই খাতা নিয়ে জলে পইড়ে গেছে তার হিসাব নেই।

​এমপি বাবুর সময়ে বাঁধ নির্মাণের ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ফাইল আলোর মুখ দেখেনি

​দীর্ঘ ১৭ বছরের এই অবর্ণনীয় দুর্ভোগ এবং প্রশাসনের ফাইলবন্দি নিয়ে মহারাজপুর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু সাঈদ মোল্লা তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আমি সব জায়গায় এই বাঁধ ও রাস্তাটির কথা জোরালোভাবে উপস্থাপন করি। অথচ ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৎকালীন এমপি আক্তারুজ্জামান বাবুর সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার প্রেক্ষিতে এই জনপদের ভাঙন রোধে টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার একটি এস্টিমেট তৈরি করে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, নির্বাচন চলে যাওয়ার পর সেই ফাইল আর আলোর মুখ দেখেনি, ওখানেই চাপা পড়ে আছে। জনস্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে এখানে বাঁধ ও ডাবল ইটের রাস্তাটি পুন:নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

​ফেসবুকে সাবেক সেনা কর্মকর্তার খোলা চিঠি

​এদিকে ১৪/১ নম্বর পোল্ডারের আওতাধীন এলাকার দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মহারাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওরিয়েন্ট অফিসার এম আনোয়ার হোসেন। তিনি তার ব্যক্তিগত ফেসবুকে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি ‘খোলা চিঠি’ লিখেছেন। চিঠিতে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আইলার ১৭ বছর পরও ৪ হাজার মানুষ চিকিৎসাবঞ্চিত এবং শিশুরা ভেলায় চড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে স্কুলে যাচ্ছে। জনস্বার্থে দ্রুত এই বাঁধ ও রাস্তাটি পুন:নির্মাণ করা হোক।

​সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরীদের কষ্ট

​এই অঞ্চলের সিংহভাগ মানুষই জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়াল—যারা সুন্দরবনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। দিনশেষে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যখন তারা লোকালয়ে ফেরেন, তখন এই খালের মুখে এসে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ঝড়-বৃষ্টি বা রাতের অন্ধকারে এই দড়ি টানা পারাপার যেন একেকটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ইউনিয়ন পরিষদ বা কাশিয়াবাদ ফরেস্ট অফিসে জরুরি কাজে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটি বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের পার্শ্ববর্তী কয়রা ইউনিয়নের রাস্তা ঘুরে দ্বিগুণ সময় ও অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।

​এদিকে পৌনে ৩ কোটি টাকার এস্টিমেট ফাইলটি দীর্ঘ সময় ধরে আলোর মুখ না দেখার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী জহির মাজহার প্রতিদিনের বাংলাদেশ কে বলেন, পূর্বের এই বরাদ্দ বা এস্টিমেট সম্পর্কে আমার জানা নেই। আমি নতুন, গত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এখানে যোগদান করেছি। ফাইলপত্রগুলো কী অবস্থায় আছে তা আগে দেখতে হবে। তবে জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করে দ্রুত ফাইলটি খুঁজে বের করার আশ্বাস দেন তিনি।

​খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-কে বলেন, ১৪/১ নম্বর পোল্ডারের এই জনপদের দুর্ভোগের বিষয়টি আমি অবগত আছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের আটকে থাকা পৌনে ৩ কোটি টাকার ফাইলটি সচল করে সেখানে দ্রুত টেকসই বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

​স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী জনগণের দাবি, ২০২৬ সালের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ড্রামের ভেলা টেনে ৪ হাজার মানুষকে যাতায়াত করতে হবে—তা ভাবাই যায় না। অবিলম্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেন জনস্বার্থে এই স্থানটি সরজমিন পরিদর্শন করে জরুরি ভিত্তিতে আগের মত ডাবল ইটের রাস্তা ও ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সেই বাজেট পাস করে টেকসই বাঁধ পুন:নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

এনজে

শেয়ার

পাঠকের মতামত

পাথরঘাটায় খালের পাড়ে জলবায়ু-সহনশীল ৭৫০০ বৃক্ষরোপণ

বরগুনার পাথরঘাটায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ...

বেড়া উপজেলার ৫০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে কারণ দর্শানো নোটিশ

মৌলিক স্বাক্ষরতা ও সংখ্যা জ্ঞান কর্মসূচির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় পাবনার বেড়া উপজেলার ৫০টি ...