
শত ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটে মানুষের। আর ঢাকাবাসী হলে তো কথাই নেই, কাজের চেয়ে যেন জ্যামেই কাটে জীবনের বেশির ভাগ সময়।
অফিসে পৌঁছার চিন্তায় হাজারও দুশ্চিন্তা মাথায় এসে ঝাঁক বাঁধে। এসব থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন সময় পাওয়া যায়। এ সময়টা কাজে লাগাতে পরিবার পরিজন নিয়ে কোথাও ঘুরে আসতে পারেন। কিন্তু এত অল্প সময়ে ঘুরার জন্য আপনাকে ভাবতে হবে কাছের কোনও এক স্থানকে। আর তখনই আপনি বেছে নিতে পারেন নেত্রকোণার এক কোণায় অবস্থিত দুর্গাপুরের বিরিশিরি। ওখানকার পরিবেশ আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলিয়ে দেবে সকল ব্যস্ততা, দুঃখ আর বেদনা।
সেন্টমার্টিনের গভীর নীল পানি, কিংবা জাফলং-এর স্বচ্ছ পানির গল্প অনেকই শুনেছেন, কিন্তু সবুজ আর নীলের মিশেলে অদ্ভূত-রঙের পানি দেখতে কেমন লাগবে একটু ভাবুন তো।
বিরিশিরির মূল আকর্ষণ হচ্ছে এ পানি। চীনামাটির পাহাড়, যার বুক চিরে জেগে উঠেছে এই নীলচে-সবুজ পানির হ্রদ। সাদা মাটির মাঝে রঙটাকে যেন আরও বেশি গাঢ় করে দিয়েছে।
তবে বিরিশিরি গিয়েই আপনি এ সুন্দর দৃশ্য আপনি দেখতে পারবেন না। আপনাকে যেতে হবে আরেকটু দূর বিজয়পুর চীনা মাটির পাহাড়ে।
এ ক্ষেত্রে আপনাকে ভাড়া করতে হবে একটি রিকশা (অবশ্য বেশি মানুষ থাকলে আরও বেশি)। রিকশাওয়ালাই আপনার গাইড হিসেবে কাজ করবে। তবে মোটর সাইকেলে করেও যেতে পারেন। এতে সময় কম লাগলেও, পয়সা বেশি লাগবে। তার মধ্যে বেশিক্ষণ ঘুরতে পারবেন না। তাছাড়া রিকশায় করে যেতে যেতে আপনি প্রকৃতির যে মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে পারবেন তা মোটরসাইকেলে গেলে পারবেন না।
সোমেশ্বরী নদী পার হতে হবে। নদীর খুব সামান্য অংশতেই পানি আছে। নদীটা অনেকটাই জাফলং এর নদীর মতো। স্বচ্ছ পানি, তলদেশ স্পষ্ট। পার্থক্য শুধু জাফলং এর পাথর। অবশ্য নদীর বেশিরভাগ অংশ সবাই হেটেই পার হয়। অল্প একটু জায়গা নৌকায় পার হতে হবে। ভয় নেই! আপনার রিকশাকেও নৌকায় করে পার করা হবে।
এবার একটু জেনে নিন সোমেশ্বরী নদীর ইতিহাস: উত্তরের গারো পাহাড় থেকে নেমে আসা সোমেশ্বরী নদীর আদি নাম ছিলো ‘সমসাঙ্গ’। ওই নদীর তীরে বসবাস করত ধীবররা। তাদের বলা হতো ‘পাটুনি’। বাইশা গারো নামের এক গারো তখন ওই অঞ্চল শাসন করতেন।
কিন্তু বাইশা গারোর ওপর ধীবররা সন্তুষ্ট ছিল না। তবে শক্তির অভাবে তারা তাকে মেনে নিতে বাধ্য।
১২৮০ খ্রিস্টাব্দে সোমেশ্বর পাঠক কামরূপ কামাখ্যাসহ বিভিন্ন তীর্থ দর্শন শেষে গারো পাহাড়ে আসেন। এখানকার সৌন্দর্য আর সুমসাং নদী তীরের নীরবতা সোমেশ্বর পাঠক মুগ্ধ হয়ে যান। সিদ্ধিলাভের জন্য উত্তম স্থান হিসেবে তিনি এটিকে বেছে নেনে। এলাকার জেলেদের সঙ্গে ক্রমেই তার যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
সোমেশ্বর ছিলেন অসামান্য বিদ্বান, বুদ্ধিমান ও বলিষ্ঠ। ধীবররা তাকে দেবতা এবং ত্রাতা মনে করতে থাকে। তাকে ঘিরেই গড়ে ওঠে দুর্গাপুর গ্রাম (যা বর্তমানে নেত্রকোণার একটি উপজেলা)।
পরে তিনি আগের বাসস্থান কান্যকুব্জ থেকে স্বজনদের নিয়ে এসে বসতি গড়েন সেখানে। এতে তার শক্তি আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। এক সময় সুযোগ বুঝে ওই এলাকার অত্যাচারী শাসনকর্তা বাইশা গারোকে পরাজিত করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সুসং রাজ্য’।
ওই এলাকার ধীবররা সোমেশ্বর পাঠককে সাক্ষাৎ দেবতা মনে করত। তারা ভাবত, জেলেদের উন্নতির জন্যই সোমেশ্বর ঠাকুর নিজ হাতে সুসং রাজ্য গড়েছেন। তারা এও মনে করত, সুসংয়ের মানুষের পানিকষ্ট দূর করতেই প্রভু সোমেশ্বর নিজ হাতের ‘ভৃঙ্গার’ থেকে পানি ঢেলে দেওয়ায় সৃষ্টি হয় সোমেশ্বরী নদী।
তবে অনেকেরই ধারণা, উত্তর পাহাড়ের ঝর্ণাধারা ‘সমসাং’ এর গতিপথ পরিবর্তন করে সোমেশ্বর পাঠক তা নিয়ে এসেছিলেন সুসংয়ের রাজধানী দুর্গাপুরের কাছে। এ কারণেই ওই নদীর নাম হয় সোমেশ্বরী নদী।
নদী পার হতে গেলে দেখবেন বিভিন্ন রঙের পানি সোমেশ্বরীর বুক ছিড়ে চলে গেছে বহুদূর। অবশ্য এর কারণ হলো স্বচ্ছ পানির নিচে বাহারি রঙের বালু।
নৌকায় সোমেশ্বরী নদী পাড়ি দিয়ে ওপারে গিয়ে শুরু হবে আরও দীর্ঘ রিকশা ভ্রমণ। পথের ধারে দেখতে পারবেন পাহাড়ি বিভিন্ন ধরনের ফুল।
এরপর এসে পৌঁছবেন বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড়ে। ছোট বড় টিলা-পাহাড় ও সমতল ভূমি জুড়ে প্রায় ১৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০০ মিটার প্রস্থ এই খনিজ অঞ্চল। খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৭ সালে এই অঞ্চলে সাদামাটির পরিমাণ ধরা হয় ২৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন, যা বাংলাদেশের ৩শ’ বৎসরের চাহিদা পুরণ করতে পারে। খনিগুলো থেকে মাটি খনন করায় এসব হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।
পাহাড়ের ওপর থেকে তাকালেই দেখবেন তলদেশে বেশ কয়েকটি হ্রদ। আর এসব হ্রদের পানিতে চোখ পরতেই দেখবেন আসার সকল কষ্টগুলো নিমিষেই মিলিয়ে গেছে। নিরিবিলি কোলাহলবিহীন ছিমছাম শান্ত পরিবেশ মনে প্রশান্তি এনে দেয়। এমন পরিবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেও আপনার খারপ লাগবে না। এছাড়া দু’চোখ যেদিকে যাবে দেখবেন শুধুই পাহাড়। তবে এগুলোর বেশির ভাগই ভারতে।
আপনি একটু ইচ্ছা করলেই ইতিহাস থেকে ঘুরে আসতে পারেন। কারণ টংক আন্দোলন ও এই আন্দোলনের নেত্রী রাশমনি হাজং এর স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধটি সেখান থেকে অল্প একটু দূরে।
কালচারাল একাডেমি
বিরিশিরি কালচারাল একাডেমিতে উপজাতীয় সংস্কৃতি চর্চা করা হয়। এখানে প্রতি বছর উপজাতীয়দের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। প্রতিটি অনুষ্ঠানে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর জনসমাগম হয়।
রাণীখং মিশন
দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদ থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে সীমান্তে সোমেশ্বরী নদীর কোল ঘেঁষেই রানীখং মিশনটি একটি উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত। ১৯১০ সালে এ রাণীখং মিশনটি স্থাপিত হয়। যেখান থেকে প্রকৃতিকে আরও নিবিড়ভাবে উপভোগ করা যায়।
কমলা রাণী দিঘী
বিরিশিরি ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই কমলা রাণী দিঘী। এই কমলা রাণী দিঘী সাগর দিঘী নামেও পরিচিত। দিঘীটি পুরোপুরি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও এর দক্ষিণ পশ্চিম পাড় এখনও কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে। ১৫ শতকের শেষ দিকে সুসং দুর্গাপুরের রাজা জানকি নাথ বিয়ে করেন কমলা দেবী নামে এক সুন্দরী নারীকে। রাণী কমলা দেবী যেমনি রূপেগুণে সুন্দরী ছিলেন তেমনি ছিলেন পরম ধার্মিক। রাজা জানকি নাথও ছিলেন পরম প্রজা হিতৈষী। রাণীর গর্ভে একপুত্র সন্তান জন্ম নেয়। পুত্রের নাম রাখা হয় রঘুনাথ। রাজা জানকি নাথ প্রজাদের মঙ্গলার্থে পানির অভাব নিবারণের জন্য একটি পুকুর খনন করেন। কিন্তু পুকুরে আর পানি উঠল না। রাজা পড়লেন মহা চিন্তায়। একরাতে রাজা স্বপ্নে দেখেন রাণী কমলা দেবী যদি পুকুরের মাঝখানে গিয়ে পূজো দেন তাহলে পুকুরে পানি উঠবে। রাণী কমলা দেবী প্রজাদের মঙ্গলার্থে পুকুরের মাঝখানে গিয়ে পূজোয় বসলেন। সহসা চারিদিক দিয়ে পানি উঠতে শুরু করল। কিন্তু রাণী আর পানি থেকে উঠে এলেননা। পানিতে একাকার হয়ে মিশে গেলেন তিনি।
থাকার জায়গা:
বিরিশিরি কালচারাল একাডেমির নিজস্ব রেস্ট হাউজ ও জেলা পরিষদ ডাক বাংলো, ওয়াইএমসিএ, কালচারাল অ্যাকাডেমি, ওয়াইডব্লিউসি, স্বর্ণা গেস্ট হাউজ, হোটেল সুসং, হোটেল গুলশান নামক গেস্ট হাউজ আছে। এছাড়া উপজেলা সদরে বিভিন্ন হোটেল রয়েছে। ভাড়া মোটামুটি ডবল বেডের ২০০০ ও সিঙ্গেল বেডের জন্য ১২০০ থেকে ১৬০০ টাকার মতো।
যোগাযোগ:
ঢাকা থেকে বাসযোগে ময়মনসিংহ, ময়মনসিংহ ভায়া শ্যামগঞ্জ বিরিশিরি অথবা ঢাকা থেকে বাসযোগে নেত্রকোণা, নেত্রকোণা থেকে বিরিশিরি। ঢাকায় যারা আছেন, তারা বিরিশিরি যাবেন ঢাকার মহাখালী বাস স্টেশন থেকে সরাসরি দুর্গাপুরের বাসে। পাঁচ-সাত ঘণ্টার মধ্যেই আপনি পৌঁছে যাবেন অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর বিরিশিরিতে। তা ছাড়া কমলাপুর থেকে প্রতিদিন রাতে নেত্রকোনার উদ্দেশে ট্রেন ছাড়ে। ট্রেনে নেত্রকোনা পৌঁছে সেখান থেকে বিরিশিরি যাওয়া যায়। তারপর বিরিশিরি থেকে রিকশাযোগে বিভিন্ন গন্তব্য। এছাড়া বিরিশিরিতে আসার পর সিএনজি ও ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা, রিকশা ও মোটরসাইকেলের ঘোরা যায়।
- ১বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণে জাতীয় নীতিমালা করতে হবে : শিক্ষামন্ত্রী
- ২ময়মনসিংহে পৃথক স্থান থেকে যুবকের মাথা ও মাটিচাপা দেহ উদ্ধার
- ৩এক বছরের মধ্যে জুলাই গণহত্যার তদন্ত শেষের আশা চিফ প্রসিকিউটরের
- ৪সাংবাদিকতা পেশা নির্ধারণে যথাযথ কর্তৃপক্ষ থাকা জরুরি : তথ্যমন্ত্রী
- ৫বিয়ের প্রলোভনে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ, চট্টগ্রামে এনসিপির শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার
- ৬আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সাথে হজ এজেন্সি প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভা
- ৭পুলিশের ঊর্ধ্বতন ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর
- ৮রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারবেন, সংবিধানে সেই সুযোগ আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- ৯বাতিঘর আদর্শ পাঠাগারের উদ্যোগে গাছের চারা বিতরণ
- ১০পেঁয়াজ আমদানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে : কৃষিমন্ত্রী
- ১লোকসানী শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর এক মাসে বেড়েছে ৬৮ শতাংশ
- ২‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতেই চলবে বৈদেশিক সম্পর্ক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- ৩পারিবারিক বিরোধের জেরে তায়েবাকে হত্যার অভিযোগ, ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
- ৪মাদক সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে পুলিশ জড়িত থাকলেও ছাড় নয়: ডিআইজি
- ৫কানাডা থেকে ৪০ হাজার টন এমওপি সার কিনবে সরকার
- ৬ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম চালু করা হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী
- ৭UCB Price Sensitive Information
- ৮চকরিয়ায় ২০ প্যাকেট ইয়াবাসহ মাদককারবারী আটক
- ৯স্থানীয় সরকার কার্যকর হলেই গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী হবে
- ১০গ্যাস সংকট সাময়িক, দু-তিন দিনের মধ্যেই সমাধান: যুগ্ম সচিব





পাঠকের মতামত